সচিন আপনি লজ্জা দিলেন: রাজ্যসভার বেতন দান করায় কোনও মাহাত্ম্য নেই
সংসদ ভবনের আসনের প্রতি নিষ্ঠা দামধ্যান করে পূরণ করা সম্ভব নয়
- Total Shares
রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক যখন তুঙ্গে, তখনই মাস্টারস্ট্রোকটা খেললেন মাস্টারব্লাস্টার সচিন রমেশ তেন্ডুলকর। সাংসদ হিসেবে পাওয়া বেতন ও অন্যান্য ভাতার পুরোটাই প্রধানমন্ত্রী ত্রাণ তহবিলে দান করে দিলেন তিনি। সাংসদ থাকাকালীন ৯০ লক্ষ টাকা আয় করেছিলেন সচিন।
দেশের অন্যতম সেরা ক্রিকেটারের এই দানধ্যান দেখে অনেকেই মনে করছেন যে রাজ্যসভায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় প্রায়শ্চিত্ত করছেন তিনি। তা সত্যি হলেও, ছ'বছর ধরে কোনও কাজ না করে রাজ্যসভার একটি আসন দখল করে থাকার ক্ষতিপূরণ এ ভাবে মেটানো সম্ভব নয়।
তেন্ডুলকরের পাশাপাশি বর্ষীয়ান অভিনেত্রী রেখাও রাজ্যসভায় উপস্থিতির হারের জন্য বিতর্কের মুখে পড়েছেন। মার্চের শেষে দু'জনেই মেয়াদ শেষ হয়েছে।
সচিনের এই দানের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, "প্রধানমন্ত্রী তাঁর এই দান মাথা পেতে নিয়েছেন এবং তাঁকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন। তাঁর এই অবদান দুর্দশায় ভুগতে থাকা মানুষের সাহায্যে লাগবে।"
নিঃসন্দেহে, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের অর্থ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আর্তদের ত্রাণে ব্যবহার করা হবে। কিন্তু শুধুমাত্র এই অর্থ দান করেই জনপ্রতিনিধি হিসেবে একজন সাংসদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
রাজ্যসভার আসন কোনও পুরস্কার বা সরকারের প্রদান করা কোনও সরকারি সম্মান নয়। যাঁদের যোগ্য বলে মনে হয়, যাঁদের উপর অগাধ আস্থা রয়েছে তাদের কাঁধে গুরুদায়িত্ব চাপিয়ে রাজ্যসভায় পাঠানো হয়। কাউকেই জোর করে এই দায়িত্ব দেওয়া হয় না। কেউ যদি এই দায়িত্ব নিতে রাজি না থাকেন তা হলে তিনি স্বচ্ছন্দে প্রস্তাব নাকচ করে দিতে পারেন।
মনোনীত বা নির্বাচিত, যে কোনও রাজ্যসভার সাংসদকেই সংসদ ভবনে ঢোকবার আগে রাষ্ট্রপতির সামনে শপথ নিতে নয়।
"আমি (নাম) রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত (কিংবা মনোনীত) হয়ে ঈশ্বরের নামে শপথ করছি যে সর্বদা ভারতের সংবিধানের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকব, সদা দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষা করব এবং আমি নিষ্ঠার সঙ্গে আমার দায়িত্ব পালন করব।"
রাজ্যসভার সাংসদদের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে অধিবেশন কক্ষে দেশের জনস্বার্থে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন তোলা যাতে সরকার তার নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারে।
তাঁর ছ'বছর মেয়াদকালে রাজ্যসভায় প্রায় ৪০০টি কর্মদিবসের মধ্যে সচিন মাত্র ২৯ দিন উপস্থিত ছিলেন। তিনি মাত্র ২২টি প্রশ্ন করেন এবং কোনও বিল তিনি পেশ করেননি। সত্যি, কী ভাবে ছ'বছর ধরে রাজ্যসভার একটি আসন বেকার পড়ে রইল!
সচিন অধিবেশন কক্ষে কোনও ছাপ রাখতে পারেননি
তেন্ডুলকরের পাশাপাশি বর্ষীয়ান অভিনেত্রী রেখাও রাজ্যসভায় খারাপ উপস্থিত হারের জন্য বিতর্কের সম্মুখীন হয়েছেন
কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার সচিনকে সংস্কৃতি বিভাগে মনোনীত করে
যে ক'দিন সচিন রাজ্যসভায় উপস্থিত ছিলেন সে ক'দিনেও সচিন অধিবেশন কক্ষে কোনও ভাবেই নজর কাড়তে পারেননি। প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। ২১ ডিসেম্বর, ২০১৭ তে যেমন সচিন 'খেলার অধিকার ও দেশের ক্রীড়া ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ' নিয়ে একটি ছোট্ট বক্তৃতা করেছিলেন। এর পরে আন্তর্জাতিক পদক প্রাপ্ত ক্রীড়াবিদদের জন্য কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বিনিশ্চয়তা প্রকল্প নিয়েও একটি বক্তৃতা দেওয়ার কথা ছিল সচিনের। কিন্তু রাজ্যসভায় এমন হইচই শুরু হল, (যা এখন সংসদে আকছারই হয়ে থাকে) যে সচিনের আর বক্তৃতা করতেই পারলেন না।
সংবিধানের ৮০ নম্বর ধারা প্রয়োগ করে এই বর্ষীয়ান ক্রিকেটারকে রাজ্যসভায় মনোনীত করা হয়েছিল। এই ধারায় দেশের রাষ্ট্রপতি স্বয়ং ১২জনকে মনোনীত করতে পারেন। এঁরা মূলত সাহিত্য, বিজ্ঞান, সমাজসেবা ও সংস্কৃতি জগতের কেউকেটা হন, নিজের নিজের ক্ষেত্রে তাঁরা যথেষ্ট পারদর্শী।
কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার সচিনকে সংস্কৃতি বিভাগ থেকে মনোনীত করে। দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বকে নিয়ে যে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে কোটি কোটি ভারতবাসী উচ্ছ্বসিত হবেন, সেটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সচিনের এই মনোনয়ন নিয়ে দিল্লি হাইকোর্টে মামলাও হয়েছিল। মামলা চলাকালীন সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে সচিনের মনোনয়ন প্রশ্নাতীত কারণ তিনি এই দেশের একজন বিশিষ্ট নাগরিক।
এমন একটা সময় যখন সরকার ক্রীড়াবিদদের সম্পর্কে যথেষ্ট উদাসীন বা রাজ্যগুলো সঠিক ক্রীড়া পরিকাঠামোর অভাবে ভুগছে তখন একজন বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদ রাজ্যসভায় মনোনীত হলে ক্রীড়া জগতের লোকজন তো আশার আলো দেখবেনই। কিন্তু সচিন সেই সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করলেন। ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার আগেই তিনি এই গুরুদায়িত্ব নিয়েছিলেন। তারই খেসারত দিতে হল সচিনকে।
এই আসনটি এমন একজন ক্রীড়াবিদকে দেওয়া যেতেই পারত যিনি সত্যি সত্যি খেলোয়াড়দের হয়ে এবং ক্রীড়া পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য রাজ্যসভায় গলা ফাটাতেন। ৯০ লক্ষ টাকা সচিনের কাছে কোনও বড় অঙ্ক নয়। রাজ্যসভার সদস্য না হয়েও তিনি এই টাকা দান করতে পারতেন। সচিনের দানধ্যানের রেকর্ড কিন্তু এমনিতে খুব ভালো।
সচিন যে ব্যাট দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার শততম শতরানটি করেছিলেন সেই ব্যাটটি তিনি ইতিমধ্যেই দান করে দিয়েছেন। কন্যা সারার জন্মদিন তিনি মুম্বাইয়ের একটি বস্তিতে উদযাপন করেছিলেন। দেশের কয়েকশো শিশু নিখরচায় শিক্ষালাভ করে সচিনের জন্য। সচিন সমাজকে অনেককিছুই দিয়ে থাকেন।
তাই বলে সংসদ ভবনের আসনের প্রতি নিষ্ঠা কিন্তু দানধ্যান করে পূরণ করা যাবে না। আশা করি সচিনের পরিবর্তে যিনি এই আসনে বসবেন তিনি এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করবেন না।
রেখা নিয়ে এখনও কিছু বলার সময় আসেনি। গণতন্ত্রের মন্দিরে কোনওরকম অবদান না রাখার ক্ষতিপূরণ তিনি কী ভাবে দেবেন তাই তো আমরা এখনও জানি না।

