আজকের হিসাবে ভারতের কাছে ব্রিটেনের ঋণ তিন ট্রিলিয়ন পাউন্ড আর এটা ফেরত চাই
ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক ঋণের প্রেক্ষিতে শশী থারুরের অবস্থান কেন ভুল
- Total Shares
১৯০ বছর ধরে ভারতকে শাসন ও শোষণ করে ব্রিটেন ভারতের কাছে ঠিক কতটা ঋণী রয়েছে?
তিরুঅনন্তপুরমের কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর তাঁর অ্যান এরা অফ ডার্কনেস: দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার অফ ইন্ডিয়া গ্রন্থে মার্কিন ইতিহাসবিদ তথা দার্শনিক উইল ডুরান্টকে উদ্ধৃত করে লিখছেন, "ব্রিটিশদের ভারতবিজয় ছিল একটি সমৃদ্ধ সভ্যতাকে আক্রমণ করে তাকে ধ্বংস করে দেওয়া, কোনও নীতিবোধ ও সঙ্কোচ ব্যতিরেকে, শিল্পকলার প্রতি উদাসীন থেকে সম্পদের প্রতি প্রলুব্ধ হয়ে, অগ্নি আর তলোয়ারের সাহায্যে দেশের লোককে অসহায় করে এবং পরিস্থিতি সাময়িক ভাবে অস্থির করে তুলে, উপঢৌকন দিয়ে ও হত্যা করে, জনপদ দখল করে ও চুরি করে এবং পুরানিদর্শন বিক্রিবাটাকে ‘আইনি’ রোজগারের উপায় করে দিয়ে যা আজ (১৯৩০) থেকে একশো তিয়াত্তর বছর আগে থেকে চলছে।”
দেখা যাক ভারতের কতটা ক্ষতি করেছে ব্রিটেন। থারুরের কথায়, "দুয়ে নেওয়ার ব্যাপারে ব্রিটিশদের সবচেয়ে পছন্দ ছিল কর (এবং চুরিকেও তারা কর তকমা দিয়ে দিত)। ভারতকে তারা অর্থদায়ী কামধেনু বলে মনে করত এবং ভারত থেকে যে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্রিটিশ রাজকোষে জমা পড়ত তাকে আর্ল অফ চ্যাথাম (উইলিয়াম পিট দ্য এল্ডারকে বোঝানো হয়েছে যিনি সপ্তবর্ষের যুদ্ধের সময় অলিখিত ভাবে ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার প্রধান ছিলেন) বলতেন, “একটি দেশ থেকে প্রাপ্তি... স্বর্গের দান।” ১৭৬৫ থেকে ১৮১৫ সালের মধ্যে প্রতি বছর ভারত থেকে ১,৮০,০০,০০০ পাউন্ড শোষণ করেছিল। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে খাজনার ন্যূনতম পরিমাণ ছিল আয়ের ৫০ শতাংশ আর এই বোঝা সামলাতে পারছিল না জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশ। ডুরান্ট লিখছেন, ‘যাঁদের (কর)বকেয়া রয়ে গিয়েছিল, তাঁরা কেউ জমিজিরেত ছেড়ে গুহায় কেউ বা খোলা আকাশের নীচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ক্রমাগত বেড়ে চলা করের ধাক্কা সামলাতে না পেরে বাবা তাঁর ছেলেকে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।’ কর বকেয়া মানেই অত্যাচার এবং জোর করে ব্রিটিশরা জমি বাজেয়াপ্ত করে নিত।”
ব্রিটেন ভারতে যা তৈরি করেছিল তাতে ভারতীয় শ্রমিকদের কম মজুরি দেওয়া হয়েছিল, ভারতীয়দের উপরে নির্মম ভাবে বাড়তি কর বসিয়ে সেই অর্থ নিজেদের দেশে পাঠিয়েছিল
যখন শশী থারুরের গবেষণাধর্মী বই উপযুক্ত ভাবেই ভারত ও বিদেশে সমাদৃত, তখন এই একই বিষয়ের উপরে বেণু মাধব গোবিন্দুর লেখা দ্য ওয়্যার (৬ অগস্ট ২০১৫) দারুণ বই হওয়া সত্ত্বেও তুলনামূলক ভাবে লোকের দৃষ্টি এড়িয়ে গিয়েছে।
হিসাবশাস্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গোবিন্দ আলোকিত করেছেন ভারতের কাছে ব্রিটেনের ঋণী থাকার কথা। তাঁর দেওয়া সংখ্যাগুলো সবই রাজ-হিসাব, অর্থাৎ সরকারি তথ্য। এখান থেকে ঔপনিবেশিক ভারতের কাছে ব্রিটিশদের ঋণের একটা আন্দাজ আমরা পাই। অবশ্য দ্য ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অফ ইন্ডিয়াতে ১৯৮৮ সালে আমি প্রথম এ বিষয়ে লিখেছিলাম: ব্রিটিশ রাজত্বের ঋণ ও অবহেলা।
কিন্তু একটা ব্যাপার গোবিন্দুই প্রথম বলেন, “১৯৩১ সালে ভারতের কাছে ব্রিটেনের ঋণ ১,০০০ কোটি টাকা ছিল বলে বলা হয়। ওই সময় জাতীয় কংগ্রেস বলেছিল, এই অর্থের সিংহভাগই ব্রিটিশটা তাদের নিজেদের উন্নতিসাধনেই ব্যয় করেছে। গান্ধীবাদী অর্থনীতিবিদ জেসি কুমারাপ্পার কাজের উপরে ভিত্তি করে কংগ্রেস বলেছিল, কালের নিয়মে এই সব ঋণ ও অন্য সবকিছুই মুছে যাবে। এর ফলে ধরে নেওয়া হল, ভবিষ্যতের ঋণভার স্বাধীন ভারতকেই বহন করতে হবে এবং তাও ব্রিটিশরাজের বিচারবিবেচনার বশবর্তী থাকবে। ব্রিটিশ রাজনৈতিক নেতারা এবং গণমাধ্যম এর নিন্দা করে এবং ভারতের বাধ্যবাধকতার কথা ভেবে বিষয়টি এড়িয়ে না গিয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বনের কথা বলে।
“১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে শেষ পর্যন্ত ভারত-সহ অন্য দেশগুলোর কাছে তাদের ঋণের হিসাব কষতে বাধ্য হয় ব্রিটেন। ১৬০০ কোটি দিতে রাজিও হয় ব্রিটেন, কিন্তু অন্য হিসাব থেকে অন্য তথ্য উঠে আসছিল। ১৯৪৭ সালে কুমারাপ্পা দেখান, শুধু সেনা মোতায়েনের জন্যই ভারতের খরচ পড়েছে ১৩০০ কোটি টাকা। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য খরচ হয়েছে আরও ১২০০ কোটি টাকা। তিনি সওয়াল করেন, এই খরচ ব্রিটেনের বহন করা উচিৎ, যা শেষ পর্যন্ত ৫,৭০০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়, যা ব্রিটিশদের ১৬০০ কোটি টাকার হিসাবের চেয়ে বেশ কয়েকগুণ বেশি ছিল। কুমারাপ্পার দাবি ছিল, ব্রিটেনকে কখনোই দেনদার বা বিচারক বা জুরি সদস্য হিসাবে গণ্য করতে দেওয়া যাবে না এবং তিনি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ন্যায়ালয়ে ভারতের হয়ে বলতে থাকেন। তখন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হয় ভারত এবং ব্রিটিশদের দৃষ্টিভঙ্গির জয় হওয়ায় স্বাধীন ভারতের ক্ষতিই হয়।”
চলুন, কুমারাপ্পার দাবি মতো ওই ৫৭০০ কোটি টাকা, বাণিজ্যিক ভাবে ব্রিটিশরা যে টাকার ব্যাপারে ভারতের কাছে ঋণী, অর্থাৎ অর্থনৈতিক ক্ষতি, ব্রিটিশদের নির্মমতার জন্য হারানো মানুষের জীবনের দাম বা ভারতের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের নির্মম কণ্ঠরোধের বিষয়টি ব্যতিরেকে যে ঋণ, সে দিকে দৃষ্টিপাত করি।
থারুর বলছেন, ক্ষতিপূরণ দরকার নেই, ক্ষমাপ্রার্থনা এবং প্রতীকি হিসাবে এক পাউন্ড দিলেই চলবে। উনি ঠিক বলছেন না। ক্ষতিপূরণ চাই। ক্ষমাপ্রার্থনা যথেষ্ট নয়। শশী থারুর তাঁর বইয়ে লিখছেন, “প্রতীকি হিসাবে ভারতের প্রতি বছর ১ পাউন্ড করে পাওয়া উচিৎ, ২০০ বছর ধরে—২০০ বছর ব্রিটিশ শাসনের হিসাবে। আমার মনে হয় এ ভাবে অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়াই ভালো, টাকা দেওয়ার বদলে একবার দুঃখপ্রকাশও যথেষ্ট। যদিও ভারতীয় লেখক মিনহাজ মার্চেন্ট ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের মতো একটা অতিকায় অঙ্ক খাড়া করেছেন – কেউ এই বিশাল অঙ্কের টাকা দিতে পারবে, এমনটা আশা করাই চলে না। (এই অর্থ ২০১৫ সালে ব্রিটেনের মোট জাতীয় উৎপাদনের চেয়েও বেশি)।”
অবশ্যই এই তিন ট্রিলিয়ন পাউন্ডের (থারুরের লেখা মতো ৩ ট্রিলিয়ন ডলার নয়) বিষয়টি বিচার করে দেখবে অর্থনীতিবিদ ও টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে তৈরি আন্তর্জাতিক আর্বিট্রেশন প্যানেল। স্বাধীনতার আগেই কুমারাপ্পার কাজের উপরে ভিত্তি করে এই একই দাবি করেছিল কংগ্রেস। ধরে নেওয়া যাক ওই ট্রাইবুনালে উপনিবেশের কাছে ব্রিটিশদের প্রদেয় ক্ষতিপূরণের পরিমাণ দাঁড়াল ২.৫ ট্রিলিয়ন পাউন্ড।
এই ক্ষতিপূরণ পরিশোধের জন্য ৫০ বছরের বেশি সময় দেওয়া যেতে পারে, বিনা সুদে বছরে ৫০ বিলিয়ন পাউন্ড (৪,৫০,০০০ কোটি টাকা) করে। এটা ব্রিটেনের মোট জাতীয় আয়ের (২.৬ ট্রিলিয়ন পাউন্ড) দুই শতাংশ এবং ব্রিটেন সে দেশের জাতীয় স্বাস্থ্য পরিষেবায় যে অর্থ খরচ করে তার চেয়ে বেশি নয়।
ব্রিটিশদের ভারতবিজয় ছিল হামলা এবং সমৃদ্ধ সভ্যতাকে ধ্বংস করা
ব্রিটেন কি আগামী ৫০ বছর ধরে তাদের মোট জাতীয় আয়ের দুই শতাংশ ভারতকে ক্ষতিপূরণ হিসাবে দিতে সক্ষম হবে?
এটা ভারতের ভাবার বিষয় নয়, ব্রিটেনের ভাবার বিষয়।
প্রায় ২০০ বছর ধরে ব্রিটেন ভারতকে লুঠ করেছে, ভারতের নাগরিকদের উপরে জঘন্য অপরাধ করেছে এবং জাতীয় উৎপাদনকে শ্বাসরুদ্ধ করেছে। এই পদ্ধতি অবলম্বন করে তারা তাদের শিল্পবিপ্লবে অর্থ জুগিয়েছে, ফ্রান্সের বিরুদ্ধে নেপোলিয়নীয় যুদ্ধ করে ১৮০০ শতকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। এর ফলেই ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লবোত্তর অলস শ্রেণীর সৃষ্টি হয় এবং তারপরে তাদের সঙ্গীত, খেলাধুলো ও শিল্পকলার উন্মেষ ঘটে।
ভারতে ব্রিটেনের অবদান কী: রেল, সমন্বয়, ইংরেজি, আইসিএস/আইএএস, বিশ্ববিদ্যালয় এবং আইন?
প্রতিটি ক্ষেত্রে থারুর একটি করে প্রেক্ষিত বেছে নিয়েছেন। স্থান সঙ্কুলানের কথা ভেবে শুধুমাত্র একটা ব্যাপার বিবেচনা করুন, রেলপথ: “শুধুমাত্র পরিকল্পনা ও নির্মাণের বিচারে, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের বিরাট দুর্নীতি হল ভারতীয় রেল। ১৮৫০ ও ১৮৬০-এর দশকে প্রতি মাইল নির্মাণের জন্য খরচ পড়েছিল ১৮,০০০ পাউন্ড। ওই সময়ের মার্কিন ডলারের হিসাবে এই খরচ ছিল মাইলপ্রতি ২০০০ ডলার।”
সংক্ষেপে, ব্রিটেন ভারতে যে সব নির্মাণ করেছিল, তা করতে ভারতীয় শ্রমিকদের কম মজুরি দিয়েছিল, ভারতীয়দের উপরে নির্মম ভাবে বিপুল করের বোঝা চাপিয়ে সেই অর্থ নিজেদের দেশে পাঠিয়েছিল লন্ডনের শান বাঁধানো রাস্তা তৈরি করতে আর সাম্রাজ্যের যুদ্ধের খরচ বহন করতে। নিজের দেশ থেকে ঔপনিবেশিকদের খরচ বহন করতে করতে ভারত শেষ হয়ে গেল। ব্রিটেন সব সুবিধা ঘরে তুলল, সব খরচ বহন করল ভারত।
ভারতীয় বংশোদ্ভুত দীর্ঘ সময়ের ব্রিটিশ সাংসদ বীরেন্দ্র শর্মা কিছুদিন আগে আর্লি ডে মোশনে (ইডিএম) একটি প্রস্তাব পেশ করেন, তাতে তিনি ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের জন্য হাউস অফ কমনসকে ক্ষমা চাওয়ার প্রস্তাব দেন। আর্থিক ভাবে এই ধরনের কোনও ক্ষতির পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
কিন্তু অনেক ক্ষতির ক্ষেত্রেই পরিমাপ করা সম্ভব। তাই ব্রিটেনকে ক্ষতিপূরণ দিতেই হবে।
১৯৪৭ সালে এক স্টার্লিং পাউন্ড ছিল ১৩ টাকার সমতুল, ১৯৪৭ সালে এই অঙ্ক ছিল ৪৪০ কোটি পাউন্ড। টাকা ও স্টার্লিং পাউন্ডের আজকের অনুপাত কত?
টাকার দামের ঠিক হারে পরিবর্তন হয়েছে, তা বোঝার ঠিকঠাক নির্দেশক হল সোনা ও রিয়েলএস্টেট। ১৯৪৭ সালে ১০ গ্রাম সোনার দাম ছিল ৮০ টাকা এবং ২০১৭ সালে তা ছিল ৩১,০০০ টাকা – মোটামুটি ৪০০ গুণ দাম বেড়েছে।বাড়িঘর, বিভিন্ন ধরনের পণ্য ও গৃহস্থালির অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দামও ৭০ বছরে ৪০০ থেকে ৫০০ গুণ বেড়েছে। (১৯৪৭ সাল থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ব্রিটেনের মুদ্রাস্ফীতি হিসাব কষলে ১৫০ গুণ মতো হবে। তা সত্ত্বেও টাকা এবং টাকা-স্টার্লিং পাউন্ড অবচিতির হার ১৯৪৭ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত হিসাব করলে তা ৪০০ গুণ মতোই হবে।)
এবার গাণিতিক হিসাব: গোবিন্দুর হিসাব অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালে ভারতের কাছে ব্রিটেনের ঋণ ছিল ৫৭০০ কোটি টাকা বা ৪.৪০ বিলিয়ন পাউন্ড, তখন ১৩ টাকায় ১ স্টার্লিং পাউন্ড হত। একে ৪০০ দিয়ে গুণ করুন। আজকের দিনে মুদ্রাস্ফীতি ও বিনিময় দর হিসাব করেও ঋণের পরিমাণ হবে ১.৭৬ ট্রিলিয়ন পাউন্ড (১,৭৬,০০০ কোটি পাউন্ড)।
তবে এটা হল হিমশৈলের চূড়ামাত্র। ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের মোট জাতীয় উৎপাদন শূন্যের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়াকে আমরা হিসাবের মধ্যে রাখিনি, আবার ভারতের বাণিজ্যকে ইচ্ছাকৃত ভাবে ধ্বংস করাকেও এই হিসাবের মধ্যে রাখিনি।
যদি বৈজ্ঞানিক ভাবে এ সব হিসাব কষা হয়, ভারতের কাছে ব্রিটেনের ঋণ সহজেই ৩ ট্রিলিয়ন পাউন্ডে (২৭০ লক্ষ কোটি টাকা) পৌঁছে যাবে, যা ব্রিটেনের বর্তমান মোট জাতীয় উৎপাদনের চেয়ে বেশি।

