ছাত্রছাত্রীরা এমন কি ঘটাল যার জন্য কলেজ পরিদর্শনে যেতে হচ্ছে মুখ্যমন্ত্রী-শিক্ষামন্ত্রীকে?
আন্দোলনে ছাত্ররা প্রাণ দিয়েছে, কিন্তু ভর্তির নামে কখনও তোলা আদায় করেনি
- Total Shares
ছাত্রদের রাজনীতিতে আসা উচিৎ কি না তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় এই বিতর্ক উঠেছে। বিতর্কের পক্ষে-বিপক্ষে বহু বিদগ্ধ ব্যক্তি মতামত দিয়েছেন। সময়ের সঙ্গে যাঁরা পা মিলিয়ে চলেন, তাঁরা অনেকেই ছাত্রদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের পক্ষেই মত দিয়েছেন।
তাদের বক্তব্য, প্রকৃতির নিয়মকে বদলাতে যাওয়া উচিৎ নয়। আঠেরো পেরোনো বয়স এক দুর্বার গতি নিয়ে এগিয়ে চলে। তাদের ধর্মই হল সময়কে পরিবর্তন করা। ষাটের দশকে পৃথিবী জুড়ে একের পর এক ছাত্র আন্দোলন সেই কথাই বলে।
ষাটের দশকে প্যারিসের ছাত্র আন্দোলন সে দেশের সমাজের প্রচলিত রীতিনীতির শিখর ধরে টান মেরেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ও ছাত্রীদের হস্টেলের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা সমাজরক্ষকদের রক্তচক্ষুর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিল ছাত্রছাত্রীরা। ধীরে ধীরে সেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে প্যারিস জুড়ে। সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘাঁটি গেড়ে ছাত্রছাত্রীরা প্যারিসের রাস্তা জুড়ে গড়ে তুলেছিল ব্যারিকেড। সেই ব্যারিকেডে এসে মিশেছিল শ্রমিক, কৃষক ও শোষিত মানুষের বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। সামাজিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং প্রতিবাদের বিরুদ্ধে সর্বমুখী আন্দোলনের চেহারা নিয়েছিল ছাত্র আন্দোলন। সেই আন্দোলন ব্যারিকেডে টেনে এনেছিল জাঁ পল সাত্রে ও জাঁক দেরিদার মতো মননশীল বিদ্বজনদের।
ছয়ের দশকে উত্তাল ছাত্র আন্দোলনের সাক্ষী হয়েছিল আমাদের রাজ্যও। খাদ্য আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছিল ছাত্ররা। সেই সময় কলেজ স্ট্রিটে দিনের পর দিন প্রতিবাদ আন্দোলনে পা মিলিয়েছিলেন ছাত্রছাত্রীরা। তাঁদের চোখে দেশ পাল্টানোর স্বপ্ন ছিল। স্বপ্ন থেকেই পৃথিবী জুড়ে ছাত্র আন্দোলনের স্লোগান এবং ব্যানার ফেস্টুন থেকে জন্ম নিয়েছিল নতুন কবিতা।
আশুতোষ কলেজে মুখ্যমন্ত্রী
হার না মানা সেই লড়াই প্রমাণ করেছে আন্দোলনের হার-জিৎ নিছকই মুদির হিসাব। আন্দোলনরত ছাত্র ছাত্রীদের আবেগ, স্বপ্ন, দিন ও সমাজ পাল্টানোর চিন্তা শাশ্বত।
এই আলোর ঝর্ণাধারায় বর্তমান সময়ে ছাত্রছাত্রীদের কার্যকলাপ চোখে কাঁটার মতো বেঁধে। আজ ছাত্রছাত্রীদের নাম জড়ায় অধ্যক্ষ বা শিক্ষককে হেনস্তায়, নাম জড়ায় কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের নির্বাচনের হিংসায়, নাম জড়ায় কলেজে ভর্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ আদায়ে।
এই অন্ধকার এতটাই গ্রাস করেছে যে তা রুখতে রাস্তায় নামতে হচ্ছে মুখ্যমন্ত্রীকে। ক্ষমতায় আসার পর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার হাল ফেরাতে আচমকা হাসপাতালে হাসপাতালে পরিদর্শন শুরু করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ বার ভর্তির অনিয়ম নিয়ে ভুঁড়ি ভুঁড়ি অভিযোগ উঠতে কলেজে পরিদর্শন করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রশ্ন উঠছে, অবস্থা কি এতটাই গুরুতর যে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীকে কলেজ পরিদর্শনে যেতে হচ্ছে?
তবে সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। আপাতত আমরা মুখ্যমন্ত্রীর এই তৎপরতায় আস্থা রেখে বলতে পারি হয়ত অন্ধকার দূর হবে। গত শনিবার থেকেই বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। অনিয়ম ঠেকাতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে কড়া পদক্ষেপ করেতে বলেছেন তিনি।
জয়পুরিয়া কলেজে শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়
প্রশ্ন হল, আমাদের শিক্ষাঙ্গনে এই অন্ধকার জমল কী করে? ছাত্র ছাত্রীদের অনেক ভুলভ্রান্তি চোখে পড়লেও অতীতে এই কলঙ্ক তাদের গায়ে লাগেনি। কোথাও কোথাও ছাত্র আন্দোলনে গতিবিধি হয়তো শালীনতাকে অতিক্রম করেছে, কিন্তু কলেজে ভর্তি করিয়ে দিয়ে অর্থ উপার্জনের চিন্তা তাদের গ্রাস করেনি— এখন যে রোগ দেখা যাচ্ছে।
তা হলে কি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই বড় গলদ রয়েছে নাকি সামাজিক অবক্ষয় ও মূল্যবোধই এই পতনের জন্য দায়ী? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার সময় এসেছে। ছাত্রছাত্রীরা যারা দেশ গড়ার কারিগর তাদেরও যেমন এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে তেমনই ছাত্রছাত্রী গড়ার কারিগর যাঁরা, সেই শিক্ষক সমাজকেও এর উত্তর দিতে হবে।

