অভিযোগ গুরুত্ব পেয়েছে, পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় পরিষেবা পাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়েছে আদালত
বিরোধীরা এখন বলছে ভবিষ্যতের লড়াই হবে ময়দানে, তখন জনতার রায়
- Total Shares
রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে যে ডামাডোল শুরু হয়েছিল তার লড়াই বোমা-গুলি-ভয় দেখানোর গণ্ডী ছাড়িয়ে আদালতে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল। আর, সেই আদালতের জল শেষ পর্যন্ত পৌঁছে ছিল সুপ্রিম কোর্টে। ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের ৫৮,৬৯২টি আসনের মধ্যে ২০,১৫৯টিতেই এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। শাসক দলের সন্ত্রাসের জেরে মনোনয়ন জমা দেওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল বিরোধী দলগুলো।
তিন মাস শুনানি চলার পর সেই মামলা শুক্রবার খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। তবে, সুপ্রিম কোর্ট বলেছে বিরোধীদের অভিযোগ যথেষ্ঠ গুরুতর। আইনি মারপ্যাঁচে যা উঠে এসেছে সুপ্রিম কোর্টের মতে তা হল পঞ্চায়েত ভোটের বৈধতা রয়েছে কি না তার বিচার পঞ্চায়েত নির্বাচন আইনের ৮৯(১) ধারা অনুযায়ী ইলেকশন পিটিশনের মাধ্যমেই হওয়া উচিত। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের রায়ে বলা হয়েছে কোথাও সুষ্ঠু বা অবাধ ভোট হয়নি বলে কারোর ক্ষোভ থাকলে তিনি আলাদা মামলা করতে পারবেন।
আইনজীবীদের একাংশের ব্যাখ্যা, বিরোধীদের অভিযোগ যেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে সুপ্রিম কোর্ট তেমনি পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক মানুষজনের সরকারি পরিষেবা পাওয়ার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরত্ব দিয়ে দেখেছে কোর্ট। সেই কারণে পঞ্চায়েত বোর্ড গঠনের পথে আদালত কোনও অন্তরায় রাখতে চায়নি। অন্যদিকে, বিরোধীরাও যাতে সুবিচার পায় তার জন্য ইলেকশন পিটিশনের মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তির রাস্তা খুলে দিয়েছে কোর্ট।
নির্বাচনী লড়াই বোমা গুলি ভয় দেখানোর গণ্ডী ছাড়িয়ে আদালতে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল [ছবি: পিটিআই]
আইনজীবীদের একটি বড় অংশের বক্তব্য হল এ ক্ষেত্রে যদি বিরোধীরা ইলেকশন পিটিশন দায়ের করে তা হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতা কুড়ি হাজার আসনের আলাদা আলাদা মামলা করতে হবে। রাজনীতিকরাও বলছেন কুড়ি হাজারের বেশি মামলা করার লোক কোথায়। তা ছাড়া প্রথমে নিম্নআদালত তারপরে হাইকোর্টে গিয়ে সেই মামলার নিষ্পত্তি হতে হতে বহু সময় চলে যাবে। তাই সামনে লোকসভা নির্বাচনে প্রস্তুতি নেওয়াই শ্রেয় বলে মনে করছেন বিরোধী নেতানেত্রীরা।
আইনি লড়াইয়ে ধাক্কা খাওয়ার পর বিরোধীরা বলছে ভবিষ্যতের লড়াই হবে ময়দানে। তখন জনতার রায়।
বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক উঠানে 'জুডিশিয়াল এক্সট্রিমিজম' বলে একটা কথা খুব ঘোরাফেরা করে। গোটা দেশেই রাজনীতির লড়াইতে যখন হলে পানি পাওয়া যায় না তখনি রাজনৈতিক দলগুলো আদালতের শরণাপন্ন হয়। ঠিক যে ভাবে রাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধা করতে না পেরে সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনী নিয়োগ করে। রাজনৈতিক দলগুলি রাজনৈতিক লড়াইয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে এঁটে উঠতে না পেরে আদালতে দ্বারস্থ হওয়ার ঘটনা দিনদিন বাড়ছে। আর, এর সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে 'জুডিশিয়াল এক্সট্রিমিজমের' অভিযোগের সংখ্যাও।
এই যেমন পঞ্চায়েত ভোটের যে রায় সুপ্রিম কোর্ট দিল তা বিরোধীদের পছন্দ হয়নি। ঠিক এই রকম ক্ষেত্রেই অনেক সময়ে বিচার ব্যবস্থার বাড়াবাড়ি নিয়ে সরব হয় রাজনৈতিক দলগুলি।
কুড়ি হাজারের বেশি আসনে ভয় দেখিয়ে বিরোধীদের মনোনয়ন জমা দিতে দেওয়া হয়নি [ছবি: এএনআই]
এই মামলার ক্ষেত্রে যেহেতু কুড়ি হাজার মামলা আলাদা আলাদা ভাবে করতে হবে তাই আপাতত আর আদালতের দরজা পেরোনোর কথা বলছে না বিরোধীরা। এখন আবার তারা ময়দানের লড়াইয়ের কথা বলছে। ভবিষ্যতে দেখা যাবে রাজনৈতিক ময়দানের লড়াই আবার হয়ত আদালতের কড়া নাড়ছে।
আসলে, গত কয়েক দশকের সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের অনেক মৌলিক সমস্যার সমাধানে পথ দেখাতে হয়েছে আদালতকে। দেখা গিয়েছে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের যে দায়িত্ব পালন করা উচিত ছিল তা তারা করেনি। এই বিষয়গুলো নিয়ে আদালতে যাওয়ার পর আদালতের রায়ে তা করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। সেই কারণেই সাধারণ মানুষের আদালতের উপর ভরসা বেড়েছে।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক দলগুলিও যে লড়াই রাজনীতির ময়দানে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত তা নিয়ে গিয়েছে আদালতে। সেই সব মামলায় আদালতের রায় যার বিরুদ্ধে গিয়েছে তারাই অনেক সময় বিচার ব্যবস্থা বাড়াবাড়ি করছে বলে সরব হয়েছে।
এই ঘটনা পরম্পরা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমশ তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। এর ফলে যে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে সেই শূন্যস্থান পূরণ হচ্ছে না। সেই কারণেই মানুষের আস্থা সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলোর উপর থেকে সরে গিয়ে আদালতের উপর সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়ছে।

