কৃষক ও আদিবাসী ভোট নিশ্চিত করতেই রাজ্যে আসছেন মোদী

আগামী ভোট পর্যন্ত দলকে চাঙ্গা রাখতে চাইছেন বিজেপি নেতৃত্ব

 |  5-minute read |   15-07-2018
  • Total Shares

পঞ্চায়েত ভোটে রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে সাফল্যের পর ছোট-বড় নেতাদের পাশাপাশি রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চল সফর করে গেছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ। তিনি রাজ্যের ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে যে করেই হোক ২২টি চান। বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলি থেকে যে আসন কমার আশঙ্কা বিজেপি করছে, তা পূরণ করতে তাদের অন্যতম ভরসা পশ্চিমবঙ্গ। সেই লক্ষ্য পূরণের দিকে দলকে সামনে ঠেলতে এ বার মেদিনীপুরে কৃষক সমাবেশে যোগ দিতে আসছেন বিজেপির আরেক শীর্ষ নেতা তথা দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

বিজেপির স্লোগান এখন “এবার বাংলা।” লক্ষ্য পূরণে মাসে অন্তত ১৫ দিন জেলায় গিয়ে জনসংযোগ করার নির্দেশ দলের কর্মীদের দিয়ে গেছেন অমিত শাহ। আর নরেন্দ্র মোদী আসছেন জনসভার মাধ্যমে নির্বাচকদের মন জয় করতে, সরকারের সাফল্য তুলে ধরতে ও কর্মীদের চাঙ্গা করতে। তিনি বাগ্মী। রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে বিজেপি যে সাড়া পেয়েছে পঞ্চায়েত ভোটে, অন্তত আগামী লোকসভা ভোট পর্যন্ত তা ধরে রাখা এখন বিজেপির লক্ষ্য।

body1_071518031855.jpgমোদিনীপুরে আদিবাসীদের মনজয়ই লক্ষ্য হতে পারে নরেন্দ্র মোদীর

তৃণমূলের শীর্ষনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বছরভর জেলা সফর করেন। তাঁর সফরে অন্য মাত্রা যোগ হয়, কারণ তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর মতো জনপ্রিয়তা এ রাজ্যে অন্য কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তির নেই। তাঁর নিয়মিত সফরের ফলে জনসংযোগ অনেকটাই হয়ে যায়, ভোটের প্রচারের জন্য তাঁকে আলাদা করে ঝড়ো সফর করতে হচ্ছে না ইদানীং। মোদীর মতো জনপ্রিয় নেতা আবার এ দেশে নেই। তিনি বিজেপির প্রধান মুখ। তাঁরও লক্ষ্য এখন থেকে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে ভোটের মুখে খানিকটা স্বস্তিতে থাকতে পারেন।

মেদিনীপুর কেন

রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সামগ্রিক বিচারে মেদিনীপুরে বিজেপির শক্তি বেড়েছে। ঝাড়গ্রাম জেলায় ধাক্কা খেয়েছে শাসক শিবির। এই অবস্থায় রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে আগামী প্রায় এক বছর হাওয়া ধরে রাখতে বিজেপি এখন মরিয়া। পুরুলিয়ার বলরামপুরে দুই বিজেপি কর্মীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর পরে সেখানে বারে বারে যেতে দেখা গেছে বিজেপির নানা নেতাকে।

তৃণমূলও জমি ছাড়তে রাজি নয়। বাস দুর্ঘটনায় মৃতদের পরিবারের খোঁজখবর নিতে ও সমবেদনা জানাতে মেদিনীপুরে গেছেন তৃণমূলের মহাসচিব তথা রাজ্যের মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। তারপরে মৃতদের পরিবারকে সাহায্য করেছেন আরেক মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিজেপি দেশে ১০০-র বেশি আসন পাবে না বলে তিনি প্রচারও করেছেন।

বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষও বেশ কিছুদিন ধরেই (পঞ্চায়েত ভোটের অনেক আগে থেকে) মেদিনীপুরের মাটি কামড়ে রয়েছেন। তাঁর বিশ্বস্ত সেনাদের দিয়ে জমি উর্বর করাচ্ছেন তিনিও। আগামী লোকসভা ভোটে আবার মেদিনীপুর কেন্দ্র থেকে ভোটে লড়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে দিলীপ ঘোষের। এই আসনে জয় নিশ্চিত করতে চায় তাঁর দলও। তাই মেদিনীপুরে লড়াই ক্রমেই জমে উঠছে। ভোটের প্রায় এক বছর বাকি থাকতেই তাই এই রাজ্যে মেদিনীপুর দিয়েই প্রচার শুরু করছেন নরেন্দ্র মোদী।

আদিবাসীদের জন্য

প্রধানমন্ত্রীর মেদিনীপুর সফরের ঠিক মুখে ভারতীয় সাঁওতাল সমাজ সংগঠনকে বিজেপিতে যোগ দিইয়েছেন দিলীপ ঘোষ। সাধারণ ভাবে ছোট ছোট জনজাতি কোনও একটি সংগঠনকে ভোট দেয় সম্মিলিত ভাবে। তাই সাঁওতালদের নিজেদের সংগঠনে যোগ দিইয়ে প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগেই দলকে বেশ খানিকটা এগিয়ে রেখেছে বিজেপি।

body2_071518031912.jpgসাঁওতাল সংগঠনকে বিজেপিকে যোগ দেওয়াচ্ছেন দিলীপ ঘোষ

এ রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে আদিবাসীদের জনঘনত্ব বেশি। লাগোয়া ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশায় মোটামুটি ভাবে ৫০ লক্ষ মতো সাঁওতাল জনজাতির মানুষের বাস। কয়েক দিন আগেই রাজ্যসভায় অনুমোদন পেয়েছে সাওতালি ভাষা, অর্থাৎ এখন থেকে এই ভাষাতেও বলা যাবে সংসদে। আদিবাসীদের জন্য বিজেপি কী করেছে, সে প্রসঙ্গে এই উদাহরণ দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। উত্তরবঙ্গেও আদিবাসী জনজাতির বাস রয়েছে। তাঁদের অনেকের পরিবারই চা-বাগান নির্ভর। তাই আদিবাসীদের একটি বন্ধনীতে এনে তাঁদের জন্য কিছু ঘোষণা করলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা হবে।

সংসদে সাঁওতাল ভাষাকে স্বীকৃতি দিতে বিল আনা হয়েছিল এনডিএ সরকারের আমলে, ২০০৩ সালে। এখন তার মান্যতার কথা ঘটা করে ঘোষণা করা হল। দেশের রাষ্ট্রপতি একজন দলিত, তিনি বিজেপিরই মনোনীত। আর তারপরে সাঁওতালি ভাষার স্বীকৃতি। আদিবাসী ভোট পাওয়ার জন্য এবং সাঁওতালিদের মন গলাতে এই প্রসঙ্গ টানতে পারেন প্রধানমন্ত্রী মোদী।

body3_071518031929.jpgআদিবাসীদের মন পেতে মরিয়া বিজেপি

জনসভার শুরুতে স্থানীয় ভাষায় দু’চার কথা বলে থাকেন নরেন্দ্র মোদী। মেদিনীপুরে গিয়ে বাংলার পাশাপাশি সাঁওতালিতেও তিনি বলতে পারেন, নিজস্ব ভঙ্গিতে। একই সঙ্গে অলচিকি হরফের সৃষ্টিকর্তা ও কবি রঘুনাথ মুর্মুর নাম উল্লেখ করে আদিবাসীদের আরও কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।

কৃষকদের জন্য

রাজ্যে পাটশিল্প ধুঁকছে। এই অবস্থায় পাটের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য কুইন্টালপ্রতি ২০০ টাকা বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এ কথা ফলাও করে বলে এ রাজ্যের পাটচাষিদের মন পাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। একই সঙ্গে খরিফ শস্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যও ১৩ শতাংশ মতো বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। বিভিন্ন ধরনের ডালের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যও ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে সরকার। দেশে যখন কৃষকদের আত্মহত্যা নিয়ে কংগ্রেস আন্দোলন দাঁনা বাঁধতে চাইছে, তখন এই রাজ্যে এসে তাঁর কৃষকদরদী মনোভাব যে নরেন্দ্র মোদী তুলে ধরবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

body4_071518031952.jpgরাজ্যের পশ্চিমাঞ্চল সফরে অমিত শাহ

এ রাজ্যের বর্ধমানে একাধিক কৃষক আত্মহত্যা করেছেন, যদিও সেগুলি পারিবারিক কারণে আত্মহত্যা বলে সরকারি ভাবে জানানো হয়েছিল। রাজ্যে বড় শিল্প নতুন করে প্রায় আসছেই না। মুখ্যমন্ত্রীর একটি উক্তি ঘিরে চপশিল্প নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন ভাবে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ হচ্ছে। তাই কৃষির পাশাপাশি এ রাজ্যের বেহাল শিল্পের কথাও ছুঁয়ে যেতে পারেন নরেন্দ্র মোদী। একই সঙ্গে তুলনা টানতে পারেন দেশের বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলির।

দেশের কৃষকদের আয় বর্তমান আয়ের চেয়ে দ্বিগুণ যাতে হয়, সরকার সে দিকে পদক্ষেপ করছে। ২০২২ সালের মধ্যে যাতে আয় দ্বিগুণ হয়, সেই পথেই এগোচ্ছে সরকার। এ কথা বলে রাজ্যের কৃষকদের মন পেতে চাইবেন প্রধানমন্ত্রী।

মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাব্য যুক্তি

“না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা।” নিজে খাব না, কাউকে খেতেও দেব না। ২০১৪ সালে ভোটের আগে ঘুষ রুখতে একথা বলেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। বিরোধীরা বলছেন, নরেন্দ্র মোদী এ কথা নাকি বলেছিলেন ডাল নিয়ে! চার বছরে ডালের দাম হু হু করে বেড়েছে। তবে বিরোধীদের কটাক্ষকে নিজের পক্ষে নেওয়ার ব্যাপারে নরেন্দ্র মোদী যে কোনও রাজনীতিকের চেয়ে দড়। তাই দামবৃদ্ধির হাওয়াও নিজের পালে লাগাতে পারেন মোদী। তিনি বলতেই পারেন, কৃষকদের ন্যায্য মূল্য তিনি পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন। তাই খোলা বাজারে দাম বাড়ছে। যাঁদের সামর্থ্য নেই, তাঁদের জন্য তো সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে!

জিএসটি নিয়ে অবশ্য তিনি কতটা বলবেন সন্দেহ আছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প

কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প এ রাজ্যে নাম বদলে রাজ্য সরকারের প্রকল্প বলে চালানো হচ্ছে, যেমন স্বচ্ছ ভারত হয়েছে নির্মল বাংলা। কেন্দ্রীয় সরকারের টাকায় এ রাজ্যে কোন কোন প্রকল্প চলছে, সে কথা উল্লেখ করতে পারেন প্রধানমন্ত্রী, সঙ্গ গ্রামসড়ক যোজনার ফল জঙ্গলমহল পেয়েছে। তাই সেই কৃতিত্ব তিনি দাবি করতে পারেন।

রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা গ্রহণ করছেন না বলে সম্প্রতি এ রাজ্যে এসে অভিযোগ করেছেন কেন্দ্রীয় খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ মন্ত্রী হরসিমরত কৌর বাদল। রাজ্য সরকারের এই মনোভাব নিয়েও খোঁচা দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

বঙ্গ সংস্কৃতির প্রসঙ্গ

শুধু শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও স্বামী বিবেকানন্দই নন, বিজেপি কতটা বাংলার সংস্কৃতি নির্ভর, বাংলার সঙ্গে তাদের টান কত আত্মিক, তা প্রমাণ করতে কলকাতায় বিড়লা সভাগারে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (বন্দেমাতরম্), অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (ভারতমাতার ছবি) প্রমুখের কথা উল্লেখ করেছিলেন অমিত শাহ। তা ছাড়া অতি সম্প্রতি প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে এ ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে এসেছিলেন উপরাষ্ট্রপতি বেঙ্কাইয়া নাইডু। মেদিনীপুরে গিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ক্ষুদিরাম বসু ও মাতঙ্গিনী হাজরার প্রসঙ্গ টানতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। এখন সামগ্রিক ভাবে রাজ্যের মন পেতে তিনি মরিয়া।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

SUMITRO BANDYOPADHYAY
Comment