সাম্প্রতিক আন্দোলনের দাবি থেকেই স্পষ্ট আদিবাসীদের না পাওয়া
ভাষার স্বীকৃতি আগেই পেয়েছেন, ক্ষোভ অন্য জায়গায়
- Total Shares
রেল অবরোধে ধ্বস্ত খড়্গপুর ডিভিশন, চরম সমস্যায় যাত্রীরা। লোকাল তো বটেই দূরপাল্লার বহু ট্রেন বাতিল। কারণ ভাষার স্বীকৃতি চাই। সাঁওতালি ভাষার। সাঁওতালি ভাষা তো স্বীকৃতই, তা হলে আবার কিসের স্বীকৃতি?
পশ্চিমবঙ্গে সাঁওতালি ভাষা স্বীকৃত, এই ভাষায় পরীক্ষা দেওয়া যায়, কেউ এই ভাষায় দারুণ ফল করলে তা সংবাদমাধ্যমে খবর হয়, কিন্তু ১৯৬১ সালের এ রাজ্যের ভাষা সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী বাংলার সমান মর্যাদা যদি কোনও ভাষার থেকে থাকে সেটি হল নেপালি ভাষা। নেপালি ভাষাভাষীদের তুলনায় এ রাজ্যে সাঁওতালি ভাষাভাষীদের সংখ্যা অনেক বেশি হলেও, এখনও নেপালি ভাষার সমান মর্যাদা পায়নি সাঁওতালি ভাষা।
অনেকের হয়তো মনে নেই যে এ বছর মে মাসেও একটি অবরোধ হয়েছিল জঙ্গলমহলে, তখন দাবি ছিল সারনা-কে পৃথক ধর্মের স্বীকৃতি দিতে হবে, এ বার দাবি সাঁওতালি ভাষাকে মর্যাদা দেওয়ানোর।
এ রাজ্যে আদিবাসী ভোট বিজেপির ঝুলিতে যাওয়া নিয়ে নানা মত পাওয়া গিয়েছে, তবে ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহলের দাবিদাওয়াগুলির দিকে চোখ বোলালে স্পষ্ট হয়ে যাবে কেন তারা রাজ্যের শাসকদলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। আদিবাসীরা জানেন কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থে রাস্তা তৈরি হচ্ছে, দু’টাকা কেজি দরে যাঁরা চাল পাচ্ছেন তাঁরা জানেন এই চাল রাজ্য সরকার দিচ্ছে না আর যাঁরা পাচ্ছেন না, তাঁরাও জানেন সেই চাল কোথায় যাচ্ছে। আর আন্দোলন করলেই যে সরকারি চাকরিরত আদিবাসীদের শাস্তিমূলক বদলি করে দেওয়া হচ্ছে, সেটাও তাঁরা বুঝতে পেরেছেন। এখন তাঁরা চাইছেন, যাঁরা এ ভাবে বদলি হয়ে গেছেন তাঁদের পুরোনো কর্মস্থলে ফেরানো হোক।
কেন আন্দোলনে আদিবাসীরা? (পিটিআই)
ভাষার দাবি তো বড় দাবি, আজ বললেই কাল মেনে নেওয়া মুশকিল, তবে শাস্তিমূলক বদলি রুখতে তাঁরা যখন একজোট হয়ে দেশের একাংশ অচল করে দিয়েছেন তখন একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, প্রতিশ্রুতি আর কবিতায় চিঁড়ে ভিজবে না।
এই দাবি সরকার যদি মেনে নেয় তা হলে সরকারের মনোভাব কী তা স্পষ্ট হয়ে যাবে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি তা নিয়ে প্রচারও করতে পারবে যে আদিবাসীদের আন্দোলনের ফল কী। আবার সরকার তা না মানলে আদিবাসীরা আরও দূরে সরে যাবেন। এ রাজ্যে আদিবাসী ভোটের সংখ্যা খুব কম নয়।
এ দেশে ইংরেজ আমল থেকে আদিবাসীরা ভীষণ ভাবে বঞ্চিত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে তাঁরা স্বীকৃতি পেয়েছেন, কিন্তু মর্যাদা পাননি। তাই এখন তাঁদের লড়াই স্বীকৃতির নয়, মর্যাদার। সাঁওতালি ভাষা এখনও লেখা হয় বাংলা, ওড়িয়া, দেবনাগরি এমনকি রোমান হরফেও, প্রায় একশো বছর হতে চলল এই ভাষারও হরফ তৈরি হয়েছে, সেই হরফের জন্য আলাদা বর্ণমালাও রয়েছে যা দেবনাগরী থেকে সৃষ্ট ভাষাগুলির বর্ণমালার সঙ্গে মেলে না, তাঁর ছাঁদও মেলে না অন্য ভারতীয় হরফের সঙ্গে। তাঁরা চান সেই অলচিকি হরফের স্বীকৃতি, সাঁওতালি ভাষা যদি অলচিকিতে লেখাই না হল, তা হলে কিসের স্বীকৃতি!
এ দেশে লুপ্ত হতে বসা ভাষার সংখ্যাও কম নয়। সংস্কৃত ভাঙতে ভাঙতে এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে এখন নামেই সেটি মাতৃভাষার তালিকায় রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কতজন সংস্কৃত ভাষায় কথা বলেন সে কথা বলা মুশকিল। প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে অবশ্য তার অস্তিত্ব এখনও রয়েছে, তা হয়তো থাকবেও তার সাহিত্যমূল্যের জন্য। কিন্তু সাঁওতালি তার সঙ্গে তুলনীয় নয়, তাই এই ভাষাকে উপযুক্ত ভাবে টিঁকিয়ে রাখতে বিদ্যালয়গুলিতে অলচিকি জানা শিক্ষকের দাবি করেছে সংগঠনটি।
দাবি ভিন্ন হলেও আদিবাসীরা রেল-সড়ক অবরোধ করেছিলেন মে মাসেও (ফাইল চিত্র)
আদিবাসীরা সরকারি ভাবে যে সব সুযোগসুবিধা পান, তা যে ভুয়ো শংসাপত্রের মাধ্যমে অন্যদের সুবিধা করে দিচ্ছে, আন্দোলনের একটি দাবি থেকে তাও স্পষ্ট হয়ে গেছে যে কী ভাবে এই শংসাপত্র দেওয়ার নামে দুর্নীতি চলছে।
বাম আমলে যে সব জায়গার নাম শোনা যেত মাওবাদী কার্যকলাপের জন্য, এখন সেই সব নাম শোনা যাচ্ছে আদিবাসী আন্দোলনের জন্য – সেই বেলপাহাড়ি, খেমাশুলি আবার সংবাদে। এর অর্থ একটিই, আবার রাজ্যের শাসকদলের প্রতি আস্থা হারিয়েছে জঙ্গলমহল, তাদের মোহভঙ্গ হয়েছে।
আইনের মাধ্যমে স্বীকৃতি এসেছে, বাস্তবতা বদলায়নি।

