আরবান নকশাল শব্দবন্ধ নতুন নয়, বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে তা ছিল

শুধু রাজনৈতিক নেতা নন, কবি, সিনেমা জগৎ, সাংবাদিক, সমাজসেবী কেউই বাদ নেই

 |  3-minute read |   13-09-2018
  • Total Shares

সম্প্রতি মাওবাদীদের সমর্থক হিসেবে কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত মেধাজীবী ও লেফট লিবারেলদের গ্রেপ্তার করেছে বিজেপি সরকার। তাঁদের 'আরবান নকশাল' বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য সামাজিক প্রতিষ্ঠাকে ঢাল করে ধৃতরা মাওবাদী রাজনীতি প্রচার করছেন। অর্থাৎ, তাঁরা দেশের শত্রু। এই ধরণের শব্দবন্ধ নতুন কিছুই নয়। রাজনীতিতে এই ধরণের কয়েনেজের একটা ইতিহাস রয়েছে।

১৯৩০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরণের কয়েনেজের চল প্রথম শুরু হয়। সেই সময়ে লেফট লিবারেল চিহ্নিত করতে আপার ক্লাস ও আপার মিডল ক্লাস পলিটিক্যাল লিবারেলদের গায়ে যে মার্কিন রাজনৈতিক শব্দবন্ধ জুড়ে দেওয়া হয়েছিল তা হল 'লিমুজিন লিবারেল'। এই শব্দবন্ধের বর্শামুখ ছিল তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্টের দিকে। তাঁর সরকার ধনী পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে কয়েকটি পদক্ষেপ করতেই তাঁর কপালে এই শব্দবন্ধ জুটেছিল। রুজভেল্টের সরকারকে বলা হয়েছিল 'অ্যাক্টিভিস্ট গভর্নমেন্ট'।

পরবর্তীকালে 'পলিটিক্যাল লিবারেলদের' সমালোচনা করে বলা হত জনগণের জন্য তারা সরকারি পরিবহণের কথা বলেন, মোটরগাড়ি থেকে নির্গত গ্যাসে পরিবেশ বিপন্নতার কথা বলেন আর আমজনতার জন্য সরকারি বিদ্যালয়ের কথা বলেন। অথচ, নিজেরা ভালোই উপার্জন করেন, দামি গাড়িতে চড়েন আর নিজেদের ছেলেমেয়েদের বেসরকারি স্কুলে পাঠান। এখান থেকেই, 'লিমুজিন লিবারেল' কথাটির উৎপত্তি।

body_091318042657.jpgরুজভেল্টকেও লিমুজিন লিবারেল বলা হয়েছিল

১৯৬৯ সালে নিউইয়র্কে মেয়র নির্বাচনে ব্যাপক উত্তাপ ছড়িয়ে ছিল। ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থী মারিও প্রকাচিনো তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জন লিন্ডসেকে 'লিমুজিন লিবারেল' বলে তোপ দেগেছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল জন লিন্ডসে গরিব কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য সওয়াল করছেন, নিচের তলার লোকেদের ক্ষেপিয়ে তুলে হিংসা এবং বিশৃঙ্খলা ছড়াচ্ছেন। অথচ তিনি ফিফথ অ্যাভিনিউ ও ম্যানহ্যাটনের ধনীদের কাছ থেকে সুবিধা নিচ্ছেন।

১৯৭০ সালে টেড কেনেডিকে সেনেটর নির্বাচনে বস্টনের গরিব ও কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য সুযোগ সুবিধা দেওয়ার প্রচার করে একই কথা শুনতে হয়েছিল। তবে রাজনীতির কারবারিদেরই যে শুধু এই ধরণের শব্দবন্ধ শুনতে করতে হয়েছিল তা নয়, বাদ যায়নি সিনেমা জগৎও। ১৯৯০ সালে পরিবেশবাদী আন্দোলনকারীদের সমর্থনে বক্তৃতা দিয়ে আল গোরকেও এই ভাবে আক্রমণ করা হয়েছিল।

মার্কিনমুলুকে একটু কম স্বচ্ছল লিবারেলদের বলা হত 'লেক্সাস লিবারেল'। লিমুজিনের থেকে লেক্সাসের দাম অনেকটা কম হওয়ায় এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়ে ছিল।

ব্রিটেনে আবার যাঁদের পলিটিক্যাল কনভিকশন আর সোশ্যাল স্টেটাসে তফাৎ রয়েছে, অর্থাৎ যাঁরা বামপন্থী অথবা সমাজবাদী কিন্তু আর্থিক দিক থেকে স্বচ্ছল তাদের বিপক্ষে যাঁরা তাঁরা যে শব্দবন্ধটি আবিষ্কার করে ছিলেন তা হল 'শ্যাম্পেন সোসালিষ্ট'। রাইটউইং ক্রিটিক্স যাঁরা, তাঁরা যাঁদের লেফটিস্ট মতাদর্শ রয়েছে অথচ স্বচ্ছল জীবনযাপন তাঁদেরকেই নিশানা করেছিলেন এই অভিজাত পানীয়ের নাম দিয়ে।

body1_091318042805.jpgশুধু রাজনৈতিক নেতা নন, লেখক থেকে সমাজকর্মী সাংবাদিক থেকে আইনজীবী সকলেই শব্দবন্ধের শিকার হয়েছেন [ছবি: পিটিআই]

ব্রিটেনের প্রথম লেবার প্রধানমন্ত্রী র‌্যামোসে ম্যাকডোনাল্ডকে আবার 'শ্যাম্পেন সোসালিষ্ট' কথাটা শুনতে হয়েছিল খোদ বাম শিবির থেকে। বাম মহলের সমালোচনা ছিল ম্যাকডোনাল্ড শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন।

শুধু রাজনীতি বা বলিউড কেন, সাহিত্য সংস্কৃতিও বাদ পড়েনি এর আওতা থেকে। ব্রিটিশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক উইল সেলফ সাহিত্যিক অস্কার ওয়াইল্ডকে বলেছেন তিনি পৃথিবীর আদি 'শ্যাম্পেন সোসালিষ্ট'। ১৮৯১ সালে অস্কার ওয়াইল্ড 'দ্য সোল অফ ম্যান আন্ডার সোশালিজম' প্রবন্ধটি লিখেছিলেন। অস্কার ওয়াইল্ড-এর নান্দনিক জীবন আর সমাজবাদী চিন্তার মধ্যে বৈপরীত্য রয়েছে বোঝাতে গিয়েই উইল সেলফ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছিলেন।

রাষ্ট্র এবং রাইট উইং ফোর্সগুলো বিভিন্ন সময়ে প্রতিপক্ষকে এই ধরণের রাজনৈতিক শব্দবন্ধে আক্রমণ চোখ এড়ায়নি জর্জ অরওয়েলের। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশে অধ্যাপক, সাংবাদিক, এনজিও কর্মী, প্রাক্তন বিচারপতি ও আইনজীবীরা এই ধরণের আক্রমণের মুখে পড়েছেন। অরওয়েল আক্রমণকারী দুই শিবিরকে ব্যঙ্গ করে অভিযুক্তদের পক্ষ নিয়ে তাদের 'লোয়ার আপার মিডল ক্লাস' বলে চিহ্নিত করেছেন।

সাম্প্রতিক বিশ্বে এই 'লেয়ার আপার মিডল ক্লাস'-দেরই এখন দক্ষিনপন্থীরা নানাভাবে কাঠগড়ায় তুলছেন। এরা রাষ্ট্রের সমালোচনা করতে গিয়ে যে নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক মানুষজনের দাবির কথা তুলছেন তাঁদের সঙ্গে মাওবাদীদের যোগ খোঁজা হচ্ছে। অথচ এদের বক্তব্যে বা লেখায় কোথাও হিংসাকে সমর্থনের কথা নেই।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম আড্ডায়, আলোচনায় থেকে থেকেই বলে উঠতেন, "দে গরুর গা ধুইয়ে"। এখন নজরুল জীবিত থাকলে এই কথা বলতেন, তাহলে হয়ত ধরে নেওয়া হত তিনি গো-রক্ষকদের সমর্থক। অথবা, তিনি গো-হত্যার প্রস্তুতি হিসেবে গা ধুইয়ে দেওয়ার কথা বলছেন।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

BISWAJIT BHATTACHARYA BISWAJIT BHATTACHARYA

Veteran journalist. Left critic. Political commentator.

Comment