মানবাধিকার কর্মীদের তো কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে, গণতন্ত্রে তা কাম্য নয়
স্বৈরতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মধ্যে কী পার্থক্য তা একটা উপমাতেই স্পষ্ট
- Total Shares
কোনও এক সমাজকর্মীর লেখায় পড়েছিলাম স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ও গণতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য। স্বৈরতন্ত্র কাকে বলে? যখন মাঝরাতে পুলিশ আসে, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটিয়ে কাউকে তুলে নিয়ে যায় অথবা ভোরের দিকে কারও বাড়িতে ঢুকে খানাতল্লাশি করে, কাউকে তুলে নিয়ে গিয়ে গ্রেপ্তার করে – এক কথায় আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করে। গণতন্ত্র কী? সকালবেলা বাড়ির দরজায় কড়া নাড়েন দুধওয়ালা বা বেল বাজান খবরের কাগজওয়ালা, প্রাতঃভ্রমণ করতে গেলে লোকে সুপ্রভাত বলে কুশল বিনিময় করেন।
সাম্প্রতিক ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন, কোন ঘরনের ঘটনা ঘটছে। তা হলেই বুঝতে পারবেন সার্বিক পরিস্থিতি কেমন। কারও বাড়িতে পুলিশ হাজির হয়ে মাঝরাতে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, কখনও ভোরের বেলা কাউকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, কারও অফিসে হানা দিয়ে নিরাপত্তারক্ষীদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে... এ তো গুন্ডাদের মতো আচরণ। কোনও ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত কোনও তথ্যপ্রমাণ দাখিল করতে পারছে না পুলিশ। পরিস্থিতি কী তা সহজেই অনুমেয়।
গৌতম নওলখা ও ভারাভারা রাও (ইন্ডিয়া টুডে)
যে দশজনের নাম উঠে এসেছে এবং যাঁদের মধ্যে থেকে পাঁচজনকে সম্প্রতি গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তাঁদের আটজনকেই আমি চিনি। আমি ১৯৮০-র দশক থেকে মানবাধিকার কর্মী হিসাবে কাজ করে আসছি। আমি সেই আশির দশক থেকেই সোমা সেন, গৌতম নওলখাদের সঙ্গে আমি কাজ করেছি। তাঁদের কাজের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। সেই কাজের ধরণ ভেঙে আশি ছুঁই-ছুঁই বয়সে কিছুতেই তাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার মতো বিষয় ভাবতে পারেন বলে আমার মনে হয় না। তাই সবকিছু দেখেই মনে হচ্ছে যে পুরোটাই সাজানো ব্যাপার।
পাঁচজন সমাজকর্মীকে গ্রেপ্তার করা করা নিয়ে বিচারপতি যে মন্তব্য করেছেন সেটা এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
কিছুদিন আগে গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার প্রসঙ্গেও বিচারপতি একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন যে, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রভৃতি গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত। এগুলি লঙ্ঘন করা রাষ্ট্রে অনুচিত। কেউ বিরোধী মত পোষণ করেন বলে তাঁদের এ ভাবে আটকে রাখা যায় না, এই ভাবে বিরোধীদের আটকে রাখা রাষ্ট্রের অনুচিত। তার সঙ্গেই যোগ করলেন, বিরোধী মত থাকবে, বিক্ষোভ থাকবে – না হলে বিস্ফোরণ হবে – মানে গণবিদ্রোহ ঘটবে।
গণতন্ত্রে বিরোধী মতের পক্ষে মত সর্বোচ্চ আদালতের (ছবি: পিটিআই)
গ্রেপ্তার করার অন্যতম কারণ হিসাবে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ষড়যন্ত্রের কথা বলা হয়েছে। আদালত অবশ্য তাতে কোনও গুরুত্ব দেয়নি, পুলিশের তত্ত্বের কোনও ভিত্তি নেই মনে করে আদালত বলেছে যে, বিরোধী মত কেউ পোষণ করেন বলে কাউকে এ ভাবে আটকে রাখা যায় না। অর্থাৎ পরোক্ষে কটাক্ষ করে বলা হল যে, পুলিস যে সব তথ্য দাখিল করেছে তা দিয়ে এই মামলা দাঁড়াচ্ছে না। কার্যত বিরোধীপক্ষদের, বিশেষ করে মানবাধিকার কর্মীদের বক্তব্যের কণ্ঠরোধ করার জন্য এই পরিকল্পনা।
গ্রেপ্তার করা হয় কেন? জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। তাঁদের তো ডেকে পাঠিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারত। সর্বোচ্চ আদালত বলেছে প্রত্যেকে তাঁদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে। এক কথায় পুরোটাই যে বিরোধীর উপরে আঘাত ও প্রকারান্তরে গণতন্ত্রের উপরে আঘাত, সে কথাই সুপ্রিম কোর্ট বলেছে।
পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে সুপ্রিম কোর্ট আরও একটি বিষয় উল্লেখ করেছে: ভিমা করেগাঁওয়ের ঘটনার ন-মাস পরে কেন গ্রপ্তার করা হল এবং এফআইআরে যাঁদের নাম আছে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। প্রশ্ন হল একটি আইনকে এই ভাবে ব্যবহার করা যায় কিনা। আইনকে এই ভাবে ব্যবহার করা দেখে আমি খুব অবাকই হয়েছি।
আদালতে কী প্রমাণ হবে সেটা গৌণ ব্যাপার। আসল কথা হল পুলিশের হাতে কাউকে গ্রেপ্তার করার যে ক্ষমতা হয়েছে তার প্রয়োগ এবং বিচারপ্রক্রিয়া দু’টি সম্পূর্ণ পৃথক ব্যাপার। সুপ্রিম কোর্টের বহু বিচারপর্বে তা উঠে এসেছে। তা ছাড়া যে আলোচনাসভার কথা বলা হচ্ছে গৌতম নওলখা সেখানে উপস্থিতই ছিলেনই না।
তখন ধৃত ভারাভারা রাও (পিটিআই)
ভারাভারা রাও মনে করেন না যে ভারতের গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মধ্য দিয়ে বৈষম্যমুক্ত সমাজ তৈরি হবে। তবে ওঁর এই মতাতর্শ নতুন নয়, যত ধরে আমি ওঁকে চিনি ততদিন ধরেই ওঁর এই মতাদর্শের কথা শুনে আসছি, জেনে আসছি। আমি কেন এই প্রসঙ্গ তুলছি? গান্ধী-হত্যাকারী নাথুরাম গড়সের বই বাজারে বিক্রি হচ্ছে, এই ধরনের বই আরএসএস-বিশ্ব হিন্দু পরিষদের স্টলে পাওয়া যাচ্ছে, রাজনীতি না করেও তাঁরা নিজেদের মতবাদ প্রাচর করতে পারবেন এবং সেগুলি গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মধ্যে স্থান পাবে, গণপ্রহার করার পরে প্রহারকারীকে মালা দিয়ে সংবর্ধনা জানানো হবে, আসিফার হয়ে আদালতে সওয়াল করতে যাওয়া আইনজীবীকে মারধর করা হবে, আন্দোলনকারীদের জেলে পোরা হবে... সবরমতী এক্সপ্রসের সাজা হবে, গোধরার কোনও সাজা হবে না। কিন্তু এর বিপরীত কোনও মতাদর্শ থাকলে গণতন্ত্রে তার কোনও স্থান হবে না? জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বা ভিত্তিহীন কোনও অভিযোগ তুলে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হবে?
জাতীয় নিরাপত্তা আইনের সঙ্গে শাসকদলই সঙ্ঘাত করছে। এত দিন ধরে যে তাঁরা লেখালিখি করে আসছেন, তাতে নিরাপত্তার কোথায় কী ক্ষতি হয়েছে?

