মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতে ওয়াচটাওয়ার: রাজ্যের কোন ছবি ফুটে উঠল, কেন
নিন্দুকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে প্রশাসনিক পদক্ষেপ সমর্থনযোগ্য নয়
- Total Shares
দেশের প্রধানমন্ত্রী হোন বা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, তাঁদের নিরাপত্তা যে আবশ্যিক সে কথা ধ্রুবসত্য। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা কেমন হবে তা অনেকটাই নির্ভর করে সেই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপরে। শুধু মুখ্যমন্ত্রী কেন, কোনও রাজনৈতিক দলের নেতারও নিরাপত্তার প্রয়োজন হতে পারে, যেমন শাসকদলের শীর্ষনেতা।
তা হলে এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তায় টাওয়ার তৈরি নিয়ে এত হইচই কেন?
কয়েকদিন ধরেই একটি টেন্ডারের প্রতিলিপি ঘুরছিল সাংবাদিকদের বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে। ৭৪ লক্ষ টাকা খরচ করে দুটি ওয়াচটাওয়ার তৈরি করা হবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাড়িতে। সেটা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরেই রাজ্যপুলিশ জানিয়ে দেয় যে সংবাদমাধ্যমের একাংশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে এই সংবাদ প্রচার করছে।
West Bengal government invites e-tender for construction of 2 watch towers in order to monitor security at residence of Chief Minister Mamata Banerjee. The estimated expenditure for the watch towers is Rs 74,02,780 & construction has to be completed within 90 days of commencement pic.twitter.com/KLYqVScAb1
— ANI (@ANI) October 23, 2018
Misinformation is being spread by some persons nd media with vested interest stating that watchtowers in residence of Honble Chief Minister West Bengal are being erected. This is totally motivated and there is no such decision.
— West Bengal Police (@WBPolice) October 22, 2018
নিয়ম অনুযায়ী রাজ্যের পুলিশই স্থির করবে মুখ্যমন্ত্রীর কী ধরনের নিরাপত্তা দরকার। অনেক সময় কেন্দ্রীয় সরকারও গোয়েন্দা রিপোর্ট পাঠিয়ে রাজ্যকে সতর্ক করে দেয়। সেই মতো নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করা হয়। ওয়াচটাওয়ার প্রয়োজন কিনা সেটাও রাজ্যের পুলিশ দফতর স্থির করে পূর্ত দফতরকে জানাবে। পূর্তদফতর নিজে বা টেন্ডার ডেকে সেই কাজ করাবে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কতটা নিরাপত্তা দরকার?
পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন মাওবাদী প্রভাব ছিল, এখন একেবারে নেই এ কথা বলা যাবে না। কারণ রাজ্যের জঙ্গলমহলে এখনও কেন্দ্রীয় বাহিনীর পক্ষে সওয়াল করে যাচ্ছে রাজ্য সরকার। যে রাজ্যে মাওবাদীদের প্রভাব রয়েছে, সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর বাড়তি নিরাপত্তা থাকাই উচিত।
তা ছাড়া এই রাজ্যেরই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কনভয়ে বিস্ফোরণ ঘটেছিল। তখন তাঁর নিরাপত্তাও বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তাই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য ওয়াচটাওয়ার যদি প্রয়োজন হয় তা দোষের নয়।
এ রাজ্যে পাহাড় আপাত ভাবে শান্ত মনে হলেও এখন পাহাড়ের নেতা বিমল গুরুংয়ের কোনও সন্ধান নেই। সেই নিরিখে বিচার করলেও মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার বিষয়টি কোনও ভাবেই অস্বীকার বা উপেক্ষা – কোনওটাই করা চলে না।
তা ছাড়া আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে যে ফেডারেল ফ্রন্ট গঠিত হতে চলেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই জোটের একজন নেত্রী, তাঁকে ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসাবেও তুলে ধরছে তাঁর দল। তাই আর পাঁচটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধান রাজনৈতিক দল্র নেতানেত্রীর সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পার্থক্য যে রয়েছে সে কথা অস্বীকার করা যাবে না।
নিন্দুকদের বয়ান বনাম প্রশাসন
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ। যে মুখ্যমন্ত্রী নিজেকে জনপ্রিয় বলছেন, যে মুখ্যমন্ত্রী বলছেন জঙ্গলমহলে মাওবাদী নেই, জঙ্গলমহল হাসছে, পাহাড় হাসছে – তাঁর এত নিরাপত্তার কী দরকার?
জননেতাদের কখনোই অজাতশত্রু বলা চলে না। তাঁর কঠোর নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করার প্রয়োজন হতেই পারে। কিন্তু রাজ্যের প্রশাসন মুখ্যমন্ত্রীর ভাবমূর্তি রক্ষায় অত্যন্ত সচেতন। তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাদামাটা পোশাকের মতোই তাঁর নিরাপত্তাও সাদামাটা হিসাবেই দেখাতে চান।
মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেও বিভিন্ন জায়গায় নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মিশতে দেখা গেছে। সেই মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতে ওয়াচটাওয়ার!
আরও একটা ব্যাপার রয়েছে, এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কোনও সরকারি আবাস নেই। মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে ও তার পরেও জ্যোতি বসু থাকতেন সরকারি আবাসে, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য থাকতেন এবং এখনও থাকেন বালিগঞ্জে পাম অ্যাভিনিউতে একটি ছোট ফ্ল্যাটে। একই ভাবে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও থাকেন তাঁর হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাড়িতে।
ওই বাড়িটি সরকারি নয়, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন না তখনও ওই ওয়াচটাওয়ার থেকে যাবে যা সরকারি অর্থে তৈরি। তা নিয়ে বিরোধীরা কটাক্ষ করতে পারেন এবং আসন্ন লোকসভা ভোটের আগে যা রাজনৈতিক ভাবে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সে কথাও মাথায় রাখছে প্রশাসন।
ভাবনা ও সমন্বয়ের অভাব
প্রশাসন চলার কথা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে। মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকেন একজন আইপিএস আধিকারিক। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর হাতেই রয়েছে স্বরাষ্ট্র (পুলিশ) দপ্তর। তাই সিদ্ধান্ত হলে সেটি মুখ্যমন্ত্রীর দফতরও জানবে (তার মানে এই নয় যে তা মুখ্যমন্ত্রী নিজেও জানবেন)। তার পরে সে কথা রাজ্যের পূর্ত দফতরকে জানানো হবে। পূর্তদফতর সেই মতো পদক্ষেপ করবে।
এ ক্ষেত্রেও সেই পদ্ধতি মানা হয়েছিল ধরে নিতে হবে। মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার মতো বিষয়টি মোটেই ছেলেখেলা করার মতো নয়। তাই ধরেই নিতে যে পূর্ত দফতরও গুরুত্বের সঙ্গেই পুরো বিষয়টি সামলেছে।
কলকাতা পুলিশ পুরো বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বললেও এ সংক্রান্ত টেন্ডার নোটিস এখনও রয়েছে পূর্ত দপ্তরের ওয়েবসাইটে।
এ থেকে প্রশাসনের মধ্যে চূড়ান্ত সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট।
টেন্ডার নোটিশ এখনও রয়েছে পূর্ত দপ্তরের ওয়েবসাইটে
১৩ অক্টোবর জারি যে টেন্ডার জারি হয়েছে সেই টেন্ডার সংশ্লিষ্ট সাইটে থাকা অবস্থাতেই গণমাধ্যম উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে এই প্রচার করছে – বলা রাজ্যের পুলিশের পক্ষে চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়।
বিভিন্ন অভিযোগের/ অপরাধের তদন্ত করে থাকে যে দফতর (গোয়েন্দা তথা পুলিশ), সেই দফতর যদি এমন দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দেয় তা হলে সেই দফতরের কাজকর্ম নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই!
প্রশাসনের কোন দিক ফুটে উঠল
জনগণের কাছে মুখ্যমন্ত্রীর ভাবমূর্তি তুলে ধরা নয়, এ ক্ষেত্রে পুলিশের প্রধান কাজ ছিল মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। প্রশাসন কোনও রাজনৈতিক সংগঠন নয়, তাই নিন্দুক কী বলছে সেই মতো কাজ করাও প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচায়ক নয়।
নিন্দুকরা কিছু বললে সেই জবাব দেওয়ার কথা শাসকদলের, তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার মতো বিষয়কে উপেক্ষা করা পুলিশ ও প্রশাসনের অপেশাদার মনোভাবেরই পরিচায়ক।

