এ রাজ্যেও সমর্থনের জন্য সম্পর্ক স্থাপন করছে বিজেপি
ওপিনিয়ন লিডারদের কাছে গিয়ে কেন্দ্রের সাফল্যের কথা বলছেন নেতারা
- Total Shares
স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর ভাবনা প্রচারের জন্য চলে যেতেন রাজা-রাজড়াদের কাছে, মানে সে সময়ের ওপিনিয়ন লিডারদের কাছে। বিজেপির সম্পর্ক যাত্রাও অনেকটা সেই ধাঁচেই। সমাজের নামজাদা লোকের কাছে নিজের মত পৌঁছে দাও, যাঁদের কথা লোকে শোনে, তাঁদের শোনাও তোমার কথা। এক লতা মঙ্গেশকর ছাড়া (শারীরিক কারণে তিনি দেখা করতে পারেননি) এখনও পর্যন্ত বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের লক্ষ্য সফল। শরিক দলের নেতাদের পাশাপাশি তিনি চলে যাচ্ছেন ওপিনিয়ন লিডারদের কাছে। এ রাজ্যের বিজেপিও এখন সেই পথে চলা শুরু করেছে।
এ রাজ্যে বুদ্ধিজীবী-বিদ্বজ্জনদের খুঁজে-পেতে মরিয়া হয়ে গিয়েছিল বিজেপি। কিন্তু সে ভাবে তারা কাউকেই দলে পায়নি— প্রোথিতযশা রূপা গঙ্গোপাধ্যায় (মহাভারত ধারাবাহিকে দ্রৌপদীর চরিত্রে অভিনয় করার তাঁকে পরিচিতি এখনও কিছুটা হলেও রয়েছে), লকেট চট্টোপাধ্যায় ও জয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে ছাড়া। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের প্রস্তুতি হিসাবে এখন থেকেই পশ্চিমবঙ্গে ওপিনিয়ন লিডারদের কাছে গিয়ে সরকারের তথা দলের সাফল্যের কথা বলছেন নেতারা। এ ব্যাপারে সামনের সারিতে রয়েছেন রাহুল সিনহা, বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। তিনি এখন নিয়ম করে প্রাক্তন আইপিএস, সেনাকর্তা থেকে বাংলার সবচেয়ে চেনা মুখ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছেন।
সবচেয়ে চেনা মুখ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছেন
এঁরা কি সকলেই বিজেপির টিকিটে ভোটে লড়বেন, নাকি বিজেপির হয়ে প্রচার করবেন আগামী লোকসভা ভোটে? কোনওটিই যে করবেন না, সে কথা বিজেপি জানে খুব ভালো করে। তবে এঁরা যদি অন্তত বিজেপির বিরুদ্ধে প্রচার না করেন, সেটাই সেটাই বিজেপির কাছে বড় পাওনা হবে।
সামান্য ইস্যু পেলেই বিরোধী দলগুলি এখন ঝাঁপিয়ে পড়ছে বিজেপির কড়া নিন্দা করতে। বিরোধী জোটের কাছে বেশ কয়েকটি উপনর্বাচনে পরাজয়ের পরে শরিকদের সঙ্গে সমঝোতার পথে এগোচ্ছে কেন্দ্রীয় বিজেপি। এখন আর তারা শরিকদের অবহেলা করছে না আগের মতো। চার বছর অবহেলা করার পরে মুম্বইয়ে বাসভবন মাতশ্রীতে গিয়ে শিবসেনা-প্রধান উদ্ধব ঠাকরের সঙ্গে দেখা করে এসেছেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ, সেখানে মহারাষ্ট্রে জোট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীশও ছিলেন। তবে এ রাজ্যের পরিস্থিতি একেবারে আলাদা। এখানে বিজেপির জোটসঙ্গী জুটবে না, শুধুমাত্র দার্জিলিং আসনে তারা গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সমর্থন পেলেও পেতে পারে। সেখানে তৃণমূল তাদের সংগঠন বেশ মজবুত করে ফেলেছে, তাই জয় আর আগের মতো হেলায় নাও হতে পারে।
অস্থায়ী রাজ্যপাল বিচারপতি (অবসরপ্রাপ্ত) শ্যামল সেনের সঙ্গে দেখা করেন বিজেপি নেতা রাহুল সিনহা
জঙ্গলমহলে তৃণমূল স্তরে ভিত শক্ত করছে বজরং দলের মতো কয়েকটি সংগঠন। সেই সব সংগঠন যখন ভোটে দাঁড়াচ্ছে, তখন তারা বিজেপির টিকিট পেয়ে যাচ্ছে। তৃণমূলস্তরে বিজেপির ভোট বাড়লেও মুখ কোথায়? লোকসভা ভোটের সময় কখনও জাদুকর পিসি সরকার বা কখনও সঙ্গীত নির্দেশক বাপ্পি লাহিড়িকে দেখা গেলেও, ভোটে হারার পরে তাঁদের আর দেখা যায় না পদ্মফুলের আশপাশে। রাজভবনে চায়ের আমন্ত্রণও অনেকে ফিরিয়েছেন। তাই এ বার রাজ্যের নামী লোকেদের কাছে গিয়ে নরেন্দ্র মোদী সরকারের সাফল্য তুলে ধরছে বিজেপি।
পঞ্চায়েত ভোটে ফল প্রকাশের পর থেকে প্রথমে রাজ্যের মহিলা বিজেপি নেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায় ও পরে বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ-সহ বেশ কয়েকজন নেতাকে জঙ্গলমহলে যেতে দেখা গেছে। তৃণমূলের তরফে মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় একবার সেখানে গেছেন। পঞ্চায়েত ভোটে সাফল্যের রেশ পরে লোকসভা ভোটেও ধরে রাখতে চাইছেন বিজেপি নেতারা। কারণ এ বারে পাহাড়ের আসন পাওয়া ও সেই আসনে জয় খুব একটা সহজ হবে না বিজেপির পক্ষে। তাই জঙ্গলমহল এখন বিজেপির পাখির চোখ।
মাতশ্রীতে সপুত্র উদ্ধব ঠাকরের সঙ্গে দেখা করতে যান বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ ও মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীশ
পাহাড়ে বিজেপি সাংসদের দেখা না পাওয়া গেলেও আসানসোলে নিয়মিত ভাবে দেখা যায় বাবুল সুপ্রিয়কে। তাঁর সাংসদ তহবিলের পুরো টাকা তিনি এলাকার উন্নয়নে খরচ করেছেন, আবার তার প্রচারও নিয়মিত করে চলেছেন। রাজ্যের বাকি আসনে বিজেপির ভরসা ভোটের মেরুকরণ।
পশ্চিমবঙ্গে ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ১২২টি আসনে হিন্দু ভোট বেশি, তাই সেই সব আসনেই এখন বিজেপি মনোনিবেশ করছে। লোকসভা ভোটের ফল যাই হোক, তার পরের বিধানসভা ভোটে এই ১২২টি আসনের অন্তত ৫০ শতাংশ আসনে জয়ী হলেই বিজেপি রাজ্যের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে।

