সোমেন সভাপতি: শুধু তৃণমূলের সঙ্গে জোটের দরজা খোলা নয়, সিপিএমকেও চাপে রাখলেন রাহুল
অধীর বিজেপিতে গেলে কংগ্রেসের ক্ষতি হবে না, কারণ অধীরের মুর্শিদাবাদ মূলত মুসলিম-প্রধান
- Total Shares
কংগ্রেসের হাইকম্যান্ডের হঠাৎ ঘোষণায় পশ্চিমবঙ্গে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির পদ হারালেন অধীর চৌধুরী। দু'দশক পরে ওই পদে এলেন সোমেন মিত্র। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন সোমেন। সেই সময়ে বামেদের শাসনে বাংলা বিপর্যস্ত বলে কংগ্রেসিরা প্রচার করলেও স্লোগান শোনা যেত 'সোনার বাংলার সোনার ছেলে সোমেন মিত্র জিন্দাবাদ'।
ঘোষণা হঠাৎ হলেও এবং পদ হারানোর কথা অধীরবাবু সংবাদমাধ্যমের কাছে শুনলেও গত দু'মাস ধরেই কংগ্রেস মহলে জল্পনা চলছিল। মুকুল রায় তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার কয়েক মাস পরে অধীরবাবু মুকুল রয়ের সঙ্গে বৈঠক করে ছিলেন। বৈঠকের কথা স্বীকার করে ছিলেন অধীর চৌধুরী। পাশাপাশি তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে যতটা তীব্র আক্রমণ চালিয়েছেন বিজেপি সম্পর্কে ততটা কড়া কথা বলেননি। সাড়ে চার বছর পদে ছিলেন অধীর, এই সময়কালে বিজেপিকে খুব একটা আক্রমণ করতে তাঁকে দেখা যায়নি। তৃণমূল সম্পর্কে তাঁর যতটা না ক্ষোভ তার চেয়ে অনেক বেশি তিনি মমতা-বিরোধী।
এক সময় স্লোগান শোনা যেত 'সোনার বাংলার সোনার ছেলে সোমেন মিত্র জিন্দাবাদ' [ছবি: এএনআই]
এই অবস্থায় লোকসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে প্রদেশ কংগ্রেসের শীর্ষ পদে রদবদলে বিশেষ অবাক হওয়ার কিছু নেই। তীব্র মমতা-বিরোধী অধীরকে সরিয়ে সোমেন মিত্রকে দায়িত্বে আনার পিছনে লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের সঙ্গে জোটের রাস্তা খোলা রাখা হল বলেই অনেকে মনে করছেন। যদিও, ১৯৯২ সালে রাজ্যে তৎকালীন যুবকংগ্রেস সভাপতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাংগঠনিক নির্বাচনে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি পদের লড়াইতে সোমেন মিত্রের কাছেই হেরে ছিলেন, এখন তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান। সেই সময়ে সোমেন মিত্রের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিবাদ চরমে উঠেছিল।
নব্বইয়ের দশকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সোমেন মিত্রের বিবাদ চরমে পৌছিয়ে ছিল [সৌজন্যে: তৃণমূল কংগ্রেস ওয়েবসাইট]
এর পর লোকসভা নির্বাচনের আগে প্রার্থী বাছাইয়ের দায়িত্ব না দিয়ে শুধু প্রচার কমিটির দায়িত্ব দেওয়ায় সোমেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে দল ছেড়েছিলেন মমতা। তৈরি করে ছিলেন নতুন দল তৃণমূল কংগ্রেস। যদিও, মমতা-মুকুল দল গড়ার পরে মমতার সঙ্গে সমঝোতা করে সোনিয়া গান্ধীর বাছাই করা প্রার্থীকে হারিয়ে কংগ্রেস নেতা জয়ন্ত ভট্টাচার্যকে রাজ্যসভায় পাঠিয়ে ছিলেন সোমেন মিত্র। এই কারণে সোনিয়া গান্ধী সোমেনকে সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন।
সোনিয়া জমানায় সোমেন মিত্র আর কোনও দিন কংগ্রেসে তেমন গুরুত্ব পাননি। এ কারণে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে চলে গিয়ে মমতার সাহায্যে ডায়মন্ড হারবারের সংসদ হয়েছিলেন। ফলে, সোমেন মিত্র মমতা বিরোধ থাকলেও বিভিন্ন সময়ে সেই বিরোধ কিছুটা ফিকে হয়েছে।
তৃণমূল সম্পর্কে অধীরের যতটা না ক্ষোভ তার চেয়ে অনেক বেশি তিনি মমতা-বিরোধী [ছবি: পিটিআই]
এই অবস্থায় সোমেন মিত্রকে ফিরিয়ে এনে রাহুল গান্ধী শুধু তৃণমূল কংগ্রেস নয়, প্রয়োজনে বামেদের সঙ্গেও সমঝোতার পথ খুলে রাখলেন বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, কংগ্রেস ছাড়ার সময় মমতার মূল অভিযোগ ছিল সোমেন মিত্রর সিপিএম বিরোধিতা তেমন আগ্রাসী নয়।
এ বারও অধীরকে প্রার্থী বাছাইয়ের দায়িত্ব না দিয়ে শুধুই প্রচার কমিটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই কারণে মমতা দল ছাড়লেও অধীর কী করবেন তা নিয়ে জল্পনা চলছে। তবে কংগ্রেসের সূত্রে খবর, হাইকম্যান্ড মনে করে অধীর দল ছাড়লে তেমন কিছু ক্ষতি হবে না। কারণ, মুর্শিদাবাদের নেতা অধীর চৌধুরী বিজেপিতে যদি যান তাহলে মুসলিম প্রধান ওই জেলায় তিনি কংগ্রেসের ভোটে থাবা বসাতে পারবেন না।
বঙ্গ সিপিএমকেও চাপে রাখলেন রাহুল গান্ধী [ছবি; পিটিআই]
তবে যে সোমেন মিত্রকে সোনিয়া গান্ধী সরিয়ে ছিলেন সেই সোমেন মিত্রকে রাহুল গান্ধী ফিরিয়ে এনে সিপিএমের বঙ্গ ব্রিগেডের উপরও চাপ বাড়ালেন। কারণ লোকসভা নির্বাচনের আগে কংগ্রেস যদি তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা করে তাহলে কংগ্রেসের সঙ্গে জোটপন্থী সিপিএমের নেতাদের মুখ পুড়বে। কারণ ইতিমধ্যেই, সিপিএমের রাজ্য কমিটি কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে বসে আছে। এই অবস্থায় সিপিএমের সঙ্গে জোটপন্থী অধীর চৌধুরীর পদ হারানোয় বঙ্গ ব্রিগেড আগামী সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে যথেষ্ট চাপেই থাকবে।

