প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি পদ থেকে কেন অধীর চৌধুরীকে সরিয়ে দায়িত্ব সোমেন মিত্রকে
লোকসভা ভোটে এ রাজ্যে কংগ্রেসকে আসন ছাড়বে না তৃণমূল
- Total Shares
পশ্চিমবঙ্গে জোটের কথা ভেবেই কি প্রবল ভাবে মমতা-বিরোধী বলে পরিচিত অধীররঞ্জন চৌধুরীকে সরিয়ে সোমেন মিত্রকে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি করা হল? এই প্রশ্নই এখন রাজনৈতিক মহলে। তবে এ ক্ষেত্রে আরও বড় একটি প্রশ্ন উঠতে পারে, লোকসভা ভোটে যখন এ রাজ্য থেকে ৪২টি আসনই চাইছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তখন কোন আসনটি তিনি কংগ্রেসকে ছাড়বেন?
দেশের অন্যত্র আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে রাহুল গান্ধী যদি জোট গড়তে সফল হন তা হলেও এ রাজ্যের ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনা খুবই কম, কারণ এ রাজ্যে ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটের পর থেকে তৃণমূলের ভোট বেড়েছে, ২০১১ ও ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, সেই ধারা সদ্যসমাপ্ত পঞ্চায়েত ভোটেও দেখা গিয়েছে।
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি পদে মনোনীত হয়েছেন সোমেন মিত্র (ইন্ডিয়া টুডে)
এ রাজ্যে বিজেপির উত্থান যা হয়েছে তা প্রধান বিরোধী দল হিসাবে, এখনও তৃণমূল কংগ্রেসকে চ্যালেঞ্জ জানানোর অবস্থায় তারা নেই। ২০১৬ সালের ভোটের কংগ্রেসের যা ক্ষমতা ছিল, আসনের বিচারে এখন তা অনেক কমেছে, কারণ বহু বিধায়কই তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন, আরও কে কখন যোগ দেবেন তা নিয়ে মাঝেমধ্যেই জল্পনা শোনা যায়।
অধীরে সমস্যা কী
চিরকালই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কট্টর বিরোধী বলে অধীর চৌধুরী পরিচিত। তিনি কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ই একের পর এক কংগ্রেস বিধায়ককে দলে টেনেছে তৃণমূল কংগ্রেস। বারবারই এ ব্যাপারে অভিযোগ উঠেছে, মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েই শাসকদল কংগ্রেস বিধায়কদের দলে টেনেছে। স্বাভাবিক ভাবেই তাকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি অধীর চৌধুরীর তিক্ততা আরও বেড়েছে। কংগ্রেস দুর্বল হয়েছে। রাজনৈতিক ভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও শক্তিশালী হয়েছেন।
কট্টর মমতা-বিরোধী বলে পরিচিত অধীর চৌধুরী (পিটিআই)
২০১৩ সালে পঞ্চায়েত ভোটের পরে অতৃণমূল পঞ্চায়েতগুলিকে দখল করতে শুরু করে তৃণমূল কংগ্রেস, পঞ্চায়েত সদস্যদের দলে টেনে। যাঁরা তৃণমূলে গেছেন, তাঁরা বলেছেন উন্নয়ন দেখে যাচ্ছেন, যে দল তিনি ছাড়ছেন সেই দল বলেছে — মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ও প্রলোভন দেখিয়ে দল ভাঙানো হয়েছে।
কারণ যাই হোক, এই ভাবে বহু পঞ্চায়েত হাতছাড়া হয়েছে কংগ্রেসের। তাতেও অধীর চৌধুরীর খুশি হওয়ার কথা নয়। তিনি বারে বারেই তৃণমূলের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন, এমনকি ব্যক্তিগত আক্রমণ করতেও ছাড়েননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। রাজ্যে কংগ্রেস ও তৃণমূলের স্বল্পমেয়াদী জোট ভেঙে যাওয়ার পরে “হার্মাদকে তাড়িয়ে উন্মাদকে এনেছি” বলেও মন্তব্য করেন।
তাই আপাত ভাবে মনে হতে পারে, অধীর চৌধুরী এ রাজ্যে কংগ্রেসের দায়িত্বে থাকলে জোট অসম্ভব, তাই তাঁকে সরিয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী।
সোমেন ও মমতা
সোমেন মিত্র যখন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি, তখন ব্যক্তিত্বের সংঘাতের জন্যই তকালীন যুবকংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নতুন দল গড়েন। তার আগে থেকেই কংগ্রেসে সোমেনপন্থী ও মমতাপন্থী শিবির ছিল। মমতা দল গড়ার পর থেকে ধীরে ধীরে তাঁর দিকেই পাল্লা ভারী হয়েছে। তবে সোমেন-মমতা কাছাকাছি আসেননি।
১৯৭২ সাল থেকে ২০০৬ পর্যন্ত কংগ্রেস বিধায়ক থাকা সোমেন মিত্র ২০০৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে প্রগতিশীল ইন্দিরা কংগ্রেস নামে নতুন দল গড়েন। তবে ২০০৯ সালে তিনি ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্র থেকে লড়াই করেন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীকে। একবারমাত্র তিনি সাংসদ হয়েছিলেন রাজনৈতিক শত্রু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৌজন্যেই। যদিও তিনি সাংসদপদ ছেড়ে দেন মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি আবার যোগ দেন তাঁর পুরোনো দল কংগ্রেসেই। লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।
২০০৮ সালে কংগ্রেস ছাড়ার পরে ২০১৪ সালে দলে ফেরেন সোমেন মিত্র (ফেসবুক)
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিত্বের সংঘাত যে এখনও রয়েছে তা স্পষ্ট। তিনি নিজেও তৃণমূল কংগ্রেসের (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের) কড়া সমালোচক। তাই তাঁকে সামনে রাখলে এ রাজ্যে জোটের ব্যাপারে আলোচনায় সুবিধা হবে বা তিনি খোলা মনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলোচনা করতে পারবেন, এটি বেশ কষ্টকল্পনা।
জাতীয় রাজনীতি ও পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেস
জাতীয় রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধীরে ধীরে অনেকটা জায়গা করে নিয়েছেন। সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো, তাই সোনিয়া গান্ধী যখন কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন তিনি তাঁর সঙ্গেই সরাসরি কথা বলেছেন। এখনও যদি কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁকে আলোচনায় বসতে হয় তা হলে তিনি কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর সঙ্গেই বসবেন। কারণ মমতা নিজেই এখন প্রধানমন্ত্রী পদে বসার কথা ভাবছেন বলে রাজনৈতিক মহলের ধারনা। প্রধানমন্ত্রী হতে গেলে তাঁর দলকে অন্য দলের চেয়ে বেশি আসন পেতেই হবে, তাই এ রাজ্য থেকে ৪২টি আসনই তিনি পেতে চাইছেন।
২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজেপি যদি একক ভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায় বা সরকার গড়ার অবস্থায় না থাকে তা হলে বিরোধীরা একজোট হয়ে সরকার গড়ার চেষ্টা করবে। কংগ্রেস যদি দ্বিতীয় স্থানে থাকে, তা হলেও রাহুল গান্ধীর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে। সে ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থন তাঁর প্রয়োজন হতে পারে। তাই তিনি প্রধানমন্ত্রী পদের কথা ভেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরাগভাজন হতে চাইবেন না।
অধীররঞ্জন চৌধুরী যদি কংগ্রেস প্রার্থীদের জেতাতে নাও পারতেন, তা হলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথে কাঁটা বিছানোর চেষ্টা করতেন। তাঁর নিজের জেলা মুর্শিদাবাদে মুসলমান ভোট কংগ্রেসের দিকে টেনে বিজেপির সুবিধা করে দিতে পারতেন। রাজ্যের অন্যত্রও তিনি একই কাজ করতেন এবং কংগ্রেসের শীর্ষনেতারা না চাইলেও। এর আগেও দেখা গেছে ‘অধীর চৌধুরী সমর্থিত প্রার্থী’রা মুর্শিদাবাদে লড়ে জিতেছেন, পরে কংগ্রেসেই যোগ দিয়েছেন তাঁরা। অধীর এই কাজ করে তৃণমূলের আসন কমিয়ে দিলে সরকার গড়ার সময় তৃণমূলকে দরকার হলে তখন রাহুল গান্ধীর পক্ষে দর কষাকষি কঠিন হত। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি পদে সোমেন মিত্র থাকলে কংগ্রেসকে এই বিড়ম্বনায় পড়তে হবে না।
রাজ্যে এই অবস্থায় যদি কংগ্রেস-তৃণমূল জোট হয় তা হলে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ছেলে অভিজিৎ মুখোপাসধ্যায়কে একটি আসন ছাড়তে পারেন মমতা, আগেও তিনি অভিজিৎকে সমর্থন করেছেন। এই ধরনের আরও একটি বা দু’টি আসন ছাড়তে পারেন, যেমন গণি পারবিরের সদস্যদের জেতা আসন। তবে তিনি অধীর চৌধুরীর আসন ছাড়বেন বলে মনে হয় না।
অধীর কী করতে পারেন
যদি রাজ্যে দুই কংগ্রেসে জোট না হয় তা হলে অধীর চৌধুরীর পক্ষে প্রচার কমিটির প্রধান হিসাবে কাজ করে যেতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সে ক্ষেত্রে এ রাজ্যে সিপিএমের সঙ্গে জোট করে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকতে পারবে কংগ্রেস। অধীর চাইবেন নিজের আসন যে কোনও ভাবে ধরে রাখতে।
মালদহে গণি পরিবার যদি কংগ্রেসে থেকে যান সে ক্ষেত্রে কংগ্রেসের ভোট ও গণির ভোট মিলিয়ে তাঁরাও ভালো জায়গায় থাকবেন। রায়গঞ্জ আসনে কংগ্রেস প্রার্থী না দিলে সিপিএমের পক্ষে জেতা আসন ধরে রাখার লড়াই সহজ হবে। রাজ্যে জেতা আসন অধীর-সোমেন জুটি ধরে রাখতে পারলে তাতে তাঁদেও কদর বাড়বে।
যদি দুই কংগ্রেসে জোট হয় এবং মুর্শিদাবাদ জেলায় অধীরের আসন কংগ্রেসকে না ছাড়েন মমতা, সে ক্ষেত্রে অধীরের সামনে নির্বাচনে লড়ার দু’টি পথ খোলা থাকবে। তিনি নির্দল হয়ে জয়ী হতে চাইবেন, অথবা বিজেপিতে যোগ দেবেন। তিনি বিজেপিতে যোগ দিতে পারেন বলে জল্পনা অনেক দিনের। অধীর নিজে অবশ্য জানিয়েছেন কোনও জল্পনার জবাব দেবেন না।

