প্রভাব যাই হোক বনধ নিয়ে বিজেপি কেন খুশি
বনধের পরের দিনই ছাত্রমৃত্যুতে সিআইডি তদন্তের নির্দেশ সরকারের
- Total Shares
অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ছিল না ঠিকই, তবে বহু দিন পরে এক কথায় সর্বাত্মক বনধ দেখল এই রাজ্য। এক সময় বনধের রাজনীতি করা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী হয়েই রাজ্যে শিল্পের স্বার্থে ও ভাবমূর্তি তুলে ধরতে বাম রাজনীতির অঙ্গ ধর্মঘটে ইতি টেনেছিলেন।
বনধের পরের দিনই কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি নিয়ে পথে তৃণমূল (ছবি: সুবীর হালদার)
২০১১ সালে বিরোধী আসনে বসা বামফ্রন্ট এবং পরে সরকার ছেড়ে বিরোধী শিবিরে যাওয়া কংগ্রেস ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকা এবং উল্টোদিকে বনধ ব্যর্থ করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করা সরকার – দুইয়ে মিলিয়ে রাজ্য থেকে বনধ সংস্কৃতি লুপ্ত হতে বসেছিল। বনধ যে কোনও সমস্যার সমাধান নয়, তা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। এমনকী জ্বালানির দাম বাড়া নিয়ে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে ডাকা বনধেরও কোনও প্রভাব এ রাজ্যে পড়েনি।
বনধে দুই দলের দুই বার্তা
গুলি করে ছাত্র হত্যা, নেপথ্যে উর্দু ভাষায় শিক্ষক নিয়োগ। বনধ ডেকে একদিকে ভোট মেরুকরণ ও একই সঙ্গে রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের উদাসীনতা দেখিয়ে দিল বিজেপি। নেতৃত্বের অভাবে বনধ ডাকতে বিজেপির সাত দিন লেগে গেলেও তা সফল করার ব্যাপারে কর্মীদের উৎসাহ ছিল যথেষ্ট। বনধের পরের দিনই ছাত্রমৃত্যুতে সিআইডি তদন্তের সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণাও বিজেপিরই নৈতিক জয়।
ক্ষমতায় এসে ইস্তক তৃণমূল কংগ্রেস বনধের বিরোধিতা করে এসেছে এবং সব বনধ ব্যর্থ করেছে। কিন্তু বনধের দিন হুলিয়া জারি করে সরকারি কর্মীদের অফিসে হাজিরায় বাধ্য করা এবং তার বদলে একদিন একদিন ছুটি দেওয়ার কী অর্থ তা স্পষ্ট নয়। বনধে ক্ষমতা দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত একটি কর্মদিবস তো নষ্টই করছে সরকার!
উৎসবে বাড়তি ছুটি, জামাইষষ্ঠীতে হাফ-ছুটি দিয়ে রাজ্যসরকারি কর্মীদের কতটা মন জয় করতে পেরেছে সরকার? সরকারি কর্মীরা মনে করছেন যে উপযুক্ত মহার্ঘ্যভাতা সরকার দিতে পারছে না বলেই ছুটি দিয়ে পুষিয়ে চিচ্ছে। অর্থাৎ তাঁরাও খুব খুশি এমন নয়।
সেই ট্র্যাডিশন: ক্ষমতা দেখাতে বাস ভেঙেছে বিজেপি
রাজ্যে বনধ হয় না এই খবর যে শিল্পমহল রাখে, বনধে অফিস ভরিয়ে তার বদলে এক দিন ছুটির খবরও তারা রাখে। কর্ম সংস্কৃতি নিয়ে যদি সরকার ভাবিত তা হলে শহিদ দিবস পালনের নামে শাসকদল যে রাজ্যের রাজধানী কলকাতাকে পুরো অচল করে দেয়, সেই খবরও তারা রাখে। তাই বনধ সংস্কৃতি বন্ধ করে শাসকদলের রাজনৈতিক লাভ হলেও রাজ্যের ভাবমূর্তি তাতে কতটা ভালো হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ করেছে।
ছাত্রমৃত্যু নিয়ে সরকার চুপ থেকে পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়াড়িতে ব্যবসায়ীর মৃত্যু নিয়ে মন্ত্রীরা কেন পথে নামলেন এবং বিজেপির ডাকা বনধের পরের দিনই কেন তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বিরুদ্ধে পথে নামলেন, সেটাও প্রশ্ন।
কলকাতায় ব্যর্থতা বনাম জেলায় সাফল্য
রাজ্যের রাজধানীকে সচল রাখতে শাসকদল যে সবরকম চেষ্টা করবে, সে কথা বিজেপি কেন, যে কেউ বুঝতে পারবে। তাই কলকাতায় গাজোয়ারি করে অকারণ শক্তি না খুইয়ে জেলায় জেলায় তারা বনধ সফল করার দিকে মন দেয়। তাতেই মিডিয়ার নজরও চলে যায় জেলার দিকে।
পঞ্চায়েত ভোটে প্রার্থী দিতে না পারলেও বীরভূমে বনধের সমর্থনে বুধবার মিছিল করে বিজেপি (নিজস্ব চিত্র)
কোন অফিসে কত হাজিরা সেই পরিসংখ্যানের চেয়ে কোথায় কোথায় হিংসা হল, কোথায় বাসে ভাঙচুর হল, আগুন লাগান হল সে সবই বেশি করে প্রচারিত হতে থাকে বৈদ্যুতিন মাধ্যমে। একই সঙ্গে দেখানো হতে থাকে ফাঁকা রাস্তার ছবি। দুইয়ে মিলিয়ে লাভ হয় বিজেপির। তারা নির্ধারিত সময়ের দু’ঘণ্টা আগে বিকেল চারটেয় বনধ প্রত্যাহার করে নেয়।
জনজীবন কেমন ছিল
বিজেপি বলছে বনধে লোকের নৈতিক সমর্থন ছিল, তৃণমূল বলছে ছিল না। বাস্তব কী? বাস্তব হল, সরকারি কর্মীরা জানেন যে তাঁদের অফিসে যেতেই হবে, তাই তাঁরা সেই মতো প্রস্তুত থাকেন। কলকাতা রাজ্যের রাজধানী, তাই সেখানে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে পথে বাস নামিয়ে দেওয়া সম্ভব। বিভিন্ন শিল্প, যেমন তথ্যপ্রযুক্তি থেকে চটকল, হাজিরা কোথাও একশো শতাংশ, কোথাও তার চেয়ে সামান্য কিছু কম। সেটাও শাসকদলের ক্ষমতার প্রতিফলন।
এই ধরনের পরিসংখ্যান দিয়ে অবশ্য কিছুই প্রমাণ করা যায় না। কারণ রবিবারের থেকেও অনেক কম লোক ছিল বাসে-ট্রামে। তার কারণ লোকে ঝামেলায় পড়তে চায় না। রাজ্যে এখন তৃণমূলের পরে দ্বিতীয় শক্তিশালী হল বিজেপি, তাই তারা যে শক্তি দেখাতে বনধ সফল করতে চাইবে সে কথা রাজ্যের লোক বুঝতে পেরেছিলেন। এই কারণেই সরকারি অফিস ও দু’একটা কলকারখানা ছাড়া কলকাতার বাইরে সবই প্রায় বন্ধ ছিল।
রাস্তায় বল খেলা হয়নি, কারণ তা হলেই ঝামেলায় পড়তে হবে। তাই যাদের উপায় আছে তারা ছুটির দিন কাটিয়েছে।
বনধ যে হয়েছে, মানছে তৃণমূলও
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নয়, উড়ান ধরতেই কলকাতা বিমানবন্দরে এসেছিলেন রাজ্যের পরিববহণমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিমানবন্দরে ট্যাক্সি নেই, রিপোর্টারদের কাছে এমন কথা শুনেই তিনি বললেন, সরকারি বাসের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। অর্থাৎ জনজীবন যে স্বাভাবিক নেই সে কথা ঘুরিয়ে তিনি স্বীকার করেই নিলেন।
বিজেপি কয়েকটি জায়গায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে বলে অভিযোগ করেছেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেসের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়। তাতে একটা কথাই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে রাজ্যে বিজেপির ক্ষমতাকে আর অস্বীকার করার জায়গায় নেই তৃণমূল কংগ্রেস।
যে বীরভূম জেলায় বিরোধীরা পঞ্চায়েত ভোটে প্রার্থীই দিতে পারেনি, সেই জেলায় বনধে বিজেপির মিছিল তৃণমূলকে বার্তা দেওয়ারই সামিল।
বনধের সমর্থনে সিউড়িতে মিছিল বিজেপির (নিজস্ব চিত্র)
সকাল থেকে ট্রেন যে অনিয়মিত চলেছে সে কথাও মেনে নিয়েছে তৃণমূল, তবে এ ব্যাপারে তারা দুষেছে কেন্দ্রীয় সরকারকে। বিজেপি বনধ ডেকেছে বলেই রাজ্য সরকারের অনুরোধে সাড়া মেলেনি বলে অভিযোগ করেছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। সকালের দিকে দীর্ঘক্ষণ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে।
বনধে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বাস ভাঙচুর ও বাসে আগুনের ছবি দেখা গেছে। তাতেই স্পষ্ট যে রাজ্যে বনধ নিয়ে গোলমাল হয়েছে। সরকার অবশ্য বলেছে সবই বিক্ষিপ্ত ঘটনা। সব সরকারই তা বলে থাকে।
বিজেপি কেন খুশি
রাজ্যে কোথায় কখন কোন মিছিল বার হবে, সে কথা সকাল পর্যন্ত গোপন রেখেছিল বিজেপি। প্রাথমিক ভাবে তাদের ছন্নছাড়া মনে হলেও সকাল হতেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে তারা সাজিয়েগুছিয়েই বনধ করতে নেমেছে। মিছিলও বার করে। তবে কলকাতায় তারা মোটেই সুবিধা করতে পারেনি।
জেলায় জেলায় বিজেপি সক্রিয় ছিল। সকালের দিকে ব্যস্ত সময়ে বাস চলেনি। হাওড়া ময়দানে বাসে ভাঙচুর করাতেই বিস্তীর্ণ অংশের বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায় দীর্ঘক্ষণের জন্য। শহরতলিতে দুপুর পর্যন্ত ট্রেন চলাচল বিঘ্নিত হয়। বিভিন্ন জায়গায় তৃণমূল-বিজেপি সংঘর্ষও হয়।
বনধে পথে নামেননি সাধারণ মানুষ (নিজস্ব চিত্র)
ছবিতে দেখা যায় এক মহিলাকে পদাঘাত করছে এক পুরুষ। বিজেপি সেই মহিলাকে নিজেদের কর্মী বলে দাবি করে অভিযুক্ত ব্যক্তি তৃণমূলের কর্মী বলে দাবি করেছে। বনধের পরের দিন এ রাজ্যে এসে সেই অভিযোগ করেছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা কৈলাশ বিজয়বর্গীয়ও।
ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, লোকে পথে নামেনি। সেটাই যদি বনধের মাপকাঠি হয় তা হলে এই বনধ সফল। বনধে যা ভাবা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি সাড়া পেয়েছে বিজেপি। ভোটের মাস ছয়েক আগে তারা নিজেদের ক্ষমতাও দেখে নিতে ও দেখিয়ে দিতে পেরেছে। তাই কংগ্রেস ও বামেদের ভাঙিয়ে রাজ্যের বিধানসভায় তৃণমূল বাড়ালেও, ২৯৪ আসনের রাজ্য বিধানসভায় মাত্র তিনটি আসন থাকা বিজেপি দেখিয়ে দিয়েছে তারাই এখন বাস্তবে প্রধান বিরোধীদল। তাই এই বনধে তারা খুশি। এবার তারা দল ভাঙানো শুরু করে দিতে পারে।

