২০১৯ লোকসভার আগে কী ভাবে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটিতে অস্তিত্ব কায়েমের চেষ্টা করছে বিজেপি

পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফলাফল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চোখ খুলে দিয়েছে

 |  4-minute read |   13-07-2018
  • Total Shares

মাত্র দু'সপ্তাহের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির দুই শীর্ষ নেতার পায়ের ধুলো পড়তে চলেছে - নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ।

২০১৯ লোকসভায় এই রাজ্য থেকে ২২টি আসন জয়ের লক্ষ্য স্থির করেছে বিজেপি। এর মধ্যে তারা এখন আদিবাসী অধ্যুষিত চার জেলা -ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর ও বাঁকুড়ার - তিনটি আসনের উপর মনোনিবেশ করেছে। পঞ্চায়েত ভোটে এই অঞ্চল থেকে আশাতীত সাফল্য পেয়েছে বিজেপি।

শাসক দলের বিরুদ্ধে নির্বাচনী কারচুপি ছাড়াও হুমকি ও ভীতিপ্রদর্শনের অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও রাজ্যের এই আদিবাসী বলয়ে সেয়ানে সেয়ানে টক্কর দিয়েছে বিজেপি। দলের নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছেন যে এই অঞ্চলে রাজনৈতিক হাওয়া এখন অন্যদিকে বইছে। মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে এবং বর্তমানে এই সুযোগটাই কাজে লাগাতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গে ২০১৯ লোকসভা প্রচার শুরু করতে মোদীও আদিবাসী অধ্যুষিত পশ্চিম মেদিনীপুর জেলাকেই বেছে নিয়েছেন। এখান থেকেই তিনি তাঁর কৃষক-দরদী প্রকল্পের কথাও প্রচার করবেন। সম্প্রতি চাল সহ আরও ডজনখানেক কৃষি পণ্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বৃদ্ধি কথা কেন্দ্রের তরফে ঘোষণা করা হয়েছে।

body3_071318021743.jpg১৬ জুলাই পশ্চিম মেদিনীপুরে নরেন্দ্র মোদীর জনসভা

২৮ জুন দলের সর্বভারতীয় সভাপতি হিসেবে পুরুলিয়াতে জনসভা করেছিলেন অমিত শাহ। সেই সভায় তিনি তৃণমূল কংগ্রেস ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনের উপর তীব্র আক্রমণ করেন। তাঁর সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষিত সরকারি প্রকল্পগুলো নিয়েই যে মোদী তাঁর জনসভায় গলার সুর চড়াবেন তা বলাই বাহুল্য। প্রধানমন্ত্রী বুঝে নিতে চাইবেন যে সেই প্রকল্পগুলোর সুবিধা সাধারণ মানুষ ভোগ কতটা করতে পারছে।

মোদী যদি একবারের জন্যও জানতে পারেন যে আদিবাসী সম্প্রদায় রাজ্যের প্রকল্পগুলো নিয়ে খুশি নয়, তাদের জন্য প্রদত্ত অর্থ দেরিতে পৌঁছয় এবং রাজনীতির জন্য ত্রাণ-বণ্টনও বিলম্বিত হয়, তা হলে কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলো ঠিক কতটা স্বচ্ছ তা বোঝাতে তিনি নিশ্চয়ই উদ্যোগী হবেন। প্রধানমন্ত্রী আদিবাসীদের জানাবেন যে কেন্দ্রের প্রকল্পে প্রদত্ত অর্থ সরাসরি প্রকল্পের গ্রাহকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যায়।

তাঁর তূণীরে অবশ্য আরও অনেক বাণ রয়েছে।

body2_071318021921.jpgমিশন 'এবার বাংলা': বিজেপির হেভিওয়েট নেতা-নেত্রীরা পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে আসবেন

নেতানেত্রী নির্বাচনী প্রচারে বিজেপির বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট নেতানেত্রীর পশ্চিমবঙ্গে আসার কথা। স্বয়ং মোদীও এ রাজ্যের বেশ কয়েকটি জেলায় যাবেন, যে জেলাগুলোতে বিজেপি ভালো ফলের আশা করছে। হাজার হোক, এই নির্বাচনে বিজেপির স্লোগান তো 'এবার বাংলা'।

তৃণমূল কংগ্রেস কিন্তু চিন্তিত এবং শাসক দলের চিন্তার কারণ বিরোধী হিসেবে তাদের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে বিজেপি। বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের নাম পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতি থেকে প্রায় মুছেই গেছে। তাই আশা করা যায় যে বিরোধী ভোট খুব একটা ভাগ হবে না, বিশেষ করে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে, যেখানে সচরাচর বিরোধী ভোট ভাগ হতে দেখা যায় না, তারা বিরোধী খুঁজলে একটিমাত্র দলকে বেছে নিতে হবে।

আদিবাসী দলগুলো যদি প্রার্থী দেয় কিংবা যদি কোনও আদিবাসী নেতা যদি নির্দল প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ান তা হলে লড়াইটা হয়ত দু'মুখী হবে - আদিবাসী বনাম যারা ক্ষমতায় আসবে। কিন্তু আদিবাসীরা যদি বুঝতে পারেন যে তাদের শক্তি অপ্রতুল সেক্ষেত্রে তারা সাধারণত বিরোধীদের উপর ভরসা রাখে, যাদের কাছ থেকে আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

body1_071318021957.jpgতৃণমূল কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে নেই

এই মুহূর্তে বিজেপিকেই একমাত্র বিকল্প হিসেবে মনে করা হচ্ছে। আর, আরএসএস যে ভাবে এই আদিবাসী গ্রামগুলোর অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে তা তৃণমূলকে যথেষ্ট চিন্তায় রেখেছে। শাসকদল অবশ্য হাত গুটিয়ে বসে নেই। তারা ক্রমাগত তাদের শক্তিতে শান দিয়ে চলেছে যাতে নির্বাচনের আগে তাদের দুর্বলতাগুলো মেরামত করে নেওয়া যায়।

পঞ্চায়েত ভোটের ফলাফল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর চোখ খুলে দিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সর্বদাই তার দলের দোষ ত্রুটি সম্পর্কে বিস্মৃত থাকতে দেখা যেত। এখন, অন্তত একবারের জন্য হলেও, তিনি সমস্যার কথা স্বীকার করে নিয়ে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছেন।

তিনি প্রথমেই এলাকার জনপ্রতিনিধিদের, যেমন স্থানীয় বিধায়ক তথা মন্ত্রী, বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন। জনগণ এদের উপর ক্ষিপ্ত ছিল। ক্ষমতায় আসার পরে এঁরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং তাঁদের পকেট রীতিমতো ফুলেফেঁপে ওঠে।

জনপ্রতিনিধিদের সাধারণ বাড়িগুলো প্রাসাদোপম বাড়ি হয়ে ওঠে। যখন আদিবাসীদের দু'বেলা দু'মুঠো অন্ন জোটে না তখন তাঁরা সাইকেল ছেড়ে এসইউভি হাঁকিয়ে এলাকায় দাপিয়ে বেড়ান। এমনকি রেশন থেকে শুরু করে ১০০ দিনের কাজ ও অন্যান্য প্রকল্পের মজুরি আদিবাসীরা কবে পাবে তাও নির্ভর করে এই রাজনৈতিক দাদাদের মর্জির উপরে।

body_071318022051.jpgঋতব্রত কি আদিবাসীদের চোখ, কান গলা হয়ে উঠতে পারবেন?

২০১৯ লোকসভার আগে হাতে বেশি সময় নেই। গত সপ্তাহে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের সদর দপ্তরে একটি তড়িঘড়ি বৈঠক ডাকেন যেখানে তিনি আদবাসীদের সঙ্গে মিলিত হন।

বৈঠকে যোগ দেওয়া আদিবাসীদের দুটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভলভো বাসে শহরে নিয়ে আসা হয় এবং তাঁদের দেখভালের কোনও খামতি রাখা হয়নি। আদিবাসীরাও মনপ্রাণ খুলে তাদের ক্ষোভ ও অভিযোগ উগরে দিয়েছেন।

ঝাড়গ্রামে ৪২ শতাংশ ও পুরুলিয়ায় ৩৩ শতাংশ আসন বিজেপি জিতে যাওয়ায় রাজ্যের তৎকালীন আদিবাসী উন্নয়নমন্ত্রীকে গদি হারাতে হয়েছে।

তৃণমূল স্তরের আদিবাসী নেতা-নেত্রীদের নিয়ে মমতা একটি কমিটি গঠন করেছেন। একমাত্র ঋতব্রত বন্দোপাধ্যায় ছাড়া সেই কমিটিতে কোনও জনপ্রতিনিধি জায়গা পাননি। এই কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন ঋতব্রত।

তাঁর বিলাসবহুল জীবনযাপন ও অকমিউনিস্ট চালচলনের জন্য সিপিএম ঋতব্রতকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে। সেই বহিষ্কৃত নেতার চোখ দিয়ে সরকার কী ভাবে আদিবাসীদের দুঃখ দুর্দশা দেখবে এবং সেই বহিষ্কৃত নেতার মাধ্যমে আদিবাসীদের গলা কতটা সরকারের কানে পৌঁছাবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

(সৌজন্যে: মেল টুডে)

লেখাটি পড়ুন  ইংরেজিতে

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

ROMITA DATTA ROMITA DATTA

The writer is Associate Editor, India Today.

Comment