জম্মু-কাশ্মীরে আচমকা সমর্থন তুলে বিজেপির লাভ কী
কাশ্মীরি পণ্ডিতদের জন্য কী করেছেন, কট্টরপন্থীরা উত্তর চাইবেন মোদীর থেকে
- Total Shares
“মেহবুবা মুফতি সুবিচার করছেন না লাদাখ ও জম্মুর বাসিন্দাদের প্রতি।” সমর্থন প্রত্যাহারের সময় এই যুক্তিই খাড়া করেছিল বিজেপি। তেলে জলে মিলে, দুই মেরুকে এক জায়গায় এনে জোট সরকার হয়েছিল জম্মু-কাশ্মীরে। কিন্তু পিডিপি-বিজেপি জোটের সেই সরকার শেষ পর্যন্ত টিকল না।
বিধানসভায় ক্ষমতা
২০১৫ সালের মার্চে ভোট হয় ৮৭ আসনের জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভায়। সরকার গঠনের জন্য দরকার ৪৪টি আসন। একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে মুফতি মহম্মদ সঈদের পিডিপি ২৮টি ও দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে বিজেপি ২৫টি আসন পেয়েছিল। ওমর আবদুল্লার ন্যাশনাল কনফারেন্স পেয়েছিল ১৫টি ও কংগ্রেস পেয়েছিল ১২টি আসন। সিপিএম-সহ অন্য দল ও নির্দল মিলিয়ে পেয়েছিল ৭টি আসন।
মুফতি মহম্মদ সঈদ মুখ্যমন্ত্রী হন বিজেপির সমর্থন নিয়ে। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে তাঁর মৃত্যুর পরে মুখ্যমন্ত্রী হন সঈদের কন্যা মেহবুবা মুফতি। তিনি বলেছিলেন, “এই জোট মানুষের জোট।”
জোট ভাঙার সময় অবশ্য মেহবুবা মুফতিকে কোনও সুযোগ দেয়নি বিজেপি। তারা সরাসরি সমর্থন প্রত্যাহারের চিঠি দেয় রাজ্যপালকে। রাজ্যপাল সে কথা জানান মেহবুবা মুফতিকে। তারপরেই পদত্যাগ করেন মুফতি। এমনকী তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে কাজ চালিয়ে যেতেও রাজি হননি।
কেন সমর্থন প্রত্যাহার
সমর্থন প্রত্যাহারের আগে জোটসঙ্গীদের মধ্যে আলোচনা হওয়াই রীতি। তাতেসহমতে না পৌঁছালে সমর্থন প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বিজেপি তা করেনি। কারণ তারা মেহবুবাকে কোনও সুযোগই দিতে চায়নি।
মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে মেহেবুবা মুফতির পাশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী
লাদাখ ও জম্মুতে তিনটি লোকসভা কেন্দ্র এখন বিজেপির হাতে। লাদাখ মূলত বৌদ্ধ-প্রধান অঞ্চল, জম্মুতে হিন্দুদের সংখ্যা বেশি। গত সাড়ে তিন বছরে যেখানে এই রাজ্যে হিংসা ছাড়া কার্যত কিছুই হয়নি, সেখানে ২০১৯ সালের নির্বাচনে তিনটি আসন ধরে রাখার জন্য পিডিপির উপর থেকে বিজেপির সমর্থন তুলে নেওয়া জরুরি ছিল। তাতে অন্তত দোষটা চাপানো যাবে।
তবে তাতেও বিধানসভা ভোটে বিজেপি খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না। কারণ কাশ্মীর উপত্যকায় তাদের পক্ষে দাঁত ফোটানো মুশকিল। জম্মু ও লাদাখে আসন পেলেও তার উপরে নির্ভর করে কোনও দিনই সরকার গড়তে পারবে না বিজেপি। আর তাই, এই রাজ্য থেকে লোকসভায় দলীয় প্রতিনিধি নিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের সামনে একটাই রাস্তা ছিল, লোকের আবেগ ভাঙিয়ে এই তিন লোকসভা আসনে জয় ধরে রাখা।
উপত্যকায় কেন্দ্রীয় শাসন
দেশের অন্যত্র আইনশৃঙ্খলার অবনতি-সহ বিভিন্ন কারণে রাষ্ট্রপতি শাসন হয়ে থাকলেও, জম্মু-কাশ্মীরের ক্ষেত্রে আরও একটি উপায় রয়েছে, তা হল রাজ্যপালের শাসন। সংবিধানের ৯২ ধারায় জম্মু-কাশ্মীরের জন্য যে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানেই ৬ মাস পর্যন্ত রাজ্যপালের শাসনের কথা বলা হয়েছে। তবে সংসদের অনুমতি নিয়ে ৩ বছর পর্যন্ত রাজ্যপালের শাসন বজায় রাখা সম্ভব।
লোকসভায় বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই বললেই চলে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ২৭২ জনের সমর্থন দরকার। সেই হিসাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। কিন্তু তার মধ্যে একজন অধ্যক্ষ। তাই কার্যক্ষত্রে তারা এখন ২৭১ টি পর্যন্ত ভোট পেতে পারে। তাতে অবশ্য কিছু যায় আসে না, কারণ সহযোগী দলগুলি রয়েছে।
সুসময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও মুফতি মুহম্মদ সঈদ
প্রশ্ন হল, বিজেপি এখন যদি তার পরেও কোনও কারণে সমস্যার সমাধান না হয়, তা হলে রাষ্ট্রপতি শাসন হবে।
তাই দেশের অন্য রাজ্যের মতো এখনি এই রাজ্যের সাসপেন্ডেড অ্যানিমেশনে চলে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। বিধানসভা এখনও ভেঙে দেওয়া হয়নি। তাই কয়েকটি দল একজোট হয়ে এখানে সরকার গড়তেই পারে। তবে তার সম্ভাবনা এখনই নেই।
ওমর আবদুল্লা চাইছেন বিধানসভা ভেঙে দেওয়া হোক। তাঁর দল ও কংগ্রেস আলাদা করে জানিয়ে দিয়েছে, তারা সরকার গড়তে আগ্রহী নয়, কাউকে সমর্থনও করছে না। কিন্তু বিজেপি চাইবে বিধানসভা জিইয়ে রাখতে। তাতে রাজনৈতিক ভাবে তাদের লাভ বেশি। তা ছাড়া এখন যা আসন সংখ্যা, তাতে বিজেপিকে ছাড়াও বাকি তিন প্রধান দল (পিডিপি, এনসি এবং কংগ্রেস) মিলে সরকার গঠন করতেই পারত। তারা কেউ রাজি হয়নি। তাই রাজনৈতিক ভাবে পুরো দায় বিজেপির উপরে বর্তাবে না।
The J&K state assembly should be dissolved immediately & fresh elections should take place as soon as appropriate. The former DCM has admitted that BJP can’t be trusted not to horsetrade for Govt formation. https://t.co/dbX4bK8goc
— Omar Abdullah (@OmarAbdullah) June 20, 2018
কাশ্মীর ও বিজেপি
অটলবিহারি বাজপেয়ী টানা ছ-বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পরে বাতাসে কান পাতলে শোনা যেত, বিজেপি একক ক্ষমতায় সরকার গড়লে কাশ্মীরের ওই বিশেষ সুবিধা বিলোপ করে দিত। ২০০৪ সালে ফিল গুড ফ্যাক্টরের মধ্যেই পরাজয় ঘটে বাজপেয়ী সরকারের। তার এক দশক পরে আবার কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে বিজেপি, এবার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে। তার আগেই বিভিন্ন প্রচারের মাধ্যমে নরেন্দ্র মোদী নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে চলে যান। এই রাজ্য থেকে ৬টির মধ্যে তিনটি (উধমপুর, জম্মু ও লাদাখ) আসন পায় বিজেপি।
মোদী আসার পরে ফের আলোচনা শুরু হয়, এ বার বিজেপি যখন একক ক্ষমতা নিয়ে এসেছে, তা হলে কাশ্মীর সমস্যা মিটবে। সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করে মোদীর জনপ্রিয়তাও তুঙ্গে উঠেছিল। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর যখন নরেন্দ্র মোদী জাতির উদ্দেশ্য লম্বা বক্তৃতা করছেন, তখন তো অনেকেই ভেবেছিলেন এই বুঝি পাকিস্তানকে আক্রমণ করল ভারত, কারণ মোদী তা পারেন। বাস্তবে হল নোট বাতিল! তাতে জম্মু-কাশ্মীরে পাথর ছোড়া বন্ধ হয়েছে বলে প্রচার হল। কিন্তু গুলি ছোড়া কি বন্ধ হল?
প্রকল্প উদ্বোধন ও উন্নয়ন করে বা তার প্রচার করে জম্মু-কাশ্মীর কেন, দেশের মন ভেজাতে পারবেন না নরেন্দ্র মোদী। কাশ্মীর সমস্যাও মেটাতে পারবেন না। কাশ্মীরকে ইস্যু করে ২০১৯ সালের ভোটে লড়তে হলে তাঁকে এমন কঠোর পদক্ষেপ করতে হবে যাতে তিনি সহযোগী হিন্দু মনোভাবাপন্ন শরিকদের সমর্থন পান। ইতিমধ্যেই কট্টরদের মধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, কাশ্মীরের হিন্দুদের জন্য নরেন্দ্র মোদী কী করেছেন, কাশ্মীরি পণ্ডিতদের জন্য, তাঁদের ঘরে ফেরানোর জন্য নরেন্দ্র মোদী কী করেছেন। ভোটের আগে বিজেপিকে এই সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
রাজ্যটির কী হবে
সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াত বলেছেন যে তাঁরা কোনও রাজনৈতিক প্রভাবে প্রভাবিত নন। রাজনৈতিক দলের শাসন থাক বা না থাক, আপাতত যে ভাবে এই রাজ্যে নিরাপত্তারক্ষীরা জঙ্গিদমন করছে, সে ভাবেই এ রাজ্যে জঙ্গি দমন চলতে থাকবে।
রাজ্যপালের শাসন আর রাষ্ট্রপতি শাসনের মধ্যে খুব একটা ফারাক নেই। তাই আপাতত সেনা অভিযান বন্ধ হচ্ছে না। তবে রাজ্যপালের শাসন থাকায় সরাসরি এই দায় কেন্দ্রীয় সরকারের উপরে সরাসরি পড়বে না। তবে উন্নয়নের খাতে খরচে সমস্যা হবে বলে ধরে নেওয়া যায়।
বিজেপির সমর্থনে জম্মু কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন মুফতি মুহম্মদ সঈদ
আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে কাশ্মীরে কোনও ভাবে সে-রাজ্যের সংখ্যালঘু, অর্থাৎ হিন্দু ভোটের পালে হাওয়া লাগানোর চেষ্টা করবে বিজেপি। তাতে বিধানসভায় আরও দু-একটা আসন বাড়তে পারে, লোকসভার তিন আসনও অটুট থাকতে পারে।
কেন্দ্রের দায়িত্ব
চার বছরেও কেন জম্মু-কাশ্মীরে শান্তি স্থাপিত হল না? এই দায় কার? কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ও রাজনাথ সিংকে এই দায় নিতেই হবে। একই সঙ্গে এই দায় নিতে হবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেও। তাঁর চার বছরের সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা যদি মন্ত্রক হিসাবে অর্থমন্ত্রকের হয়, তা হলে ঠিক তার পরেই থাকবে কাশ্মীর সমস্যা মেটাতে না পারা।
অনেক চমকই দিয়েছেন প্রধানমমন্ত্রী। ভারতের বদলে রাষ্ট্রসঙ্ঘে গিয়ে অনুনয়-বিনয় করছে পাকিস্তান। কিন্তু প্রশ্ন হল, কাশ্মীরে শান্তি ফেরাতে ব্যর্থ হলে এ বার সার্জিক্যাল স্ট্রাইককেও গিমিকের পর্যায়ে ধরা হবে, সেনার পরিশ্রম জলে যাবে রাজনৈতিক কারণে।

