প্রধানমন্ত্রী হিসাবে অটলবিহারী বাজপেয়ী ও নরেন্দ্র মোদীর তুলনা কেন অবান্তর
দু’জনের কার্যপদ্ধতি শুধুমাত্র নীতি মেনে কৌশলকে বাস্তবায়িত করা
- Total Shares
রাজনীতি একটা বহমান ঘটনা, যেখানে নীতি নিত্যসত্য কিন্তু কৌশল পরিবর্তনশীল। কয়েকটি রাজনৈতিক দল শুধুমাত্র কৌশলভিত্তিক রাজনীতি করে। কিন্তু যখন বিজেপি দাবি করে যে তারা পার্টি উইদ ডিফারেন্স, তার নেপথ্যে মূল সত্যটি হচ্ছে যে বিজেপি ও তার পূর্বসূরী জনসঙ্ঘ রাজনীতির সত্যকে অনুসরণ করে নীতিতে অবিচল, শুধু কৌশলে পরিবর্তন এনেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। এই কারণেই কংগ্রেসি খানদানের মতো কোনও ইতিহাস না থাকা সত্ত্বেও তারা আজ ভারতের শাসকদল।
অটলবিহারী বাজপেয়ী ও নরেন্দ্র মোদী (ইন্ডিয়া টুডে)
এটা নিশ্চিত যে আগামী দিনে ভারতের রাজনীতিতে এই রাজনৈতিক দলের শক্তিশালী উপস্থিতি কোনও না কোনও চেহারায় থেকেই যাবে।
দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অটলবিহারা বাজপেয়ী প্রয়াত। তাঁর বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর নাম করে সারা দেশে একটি অদ্ভুত প্রবণতা তীব্র হয়ে উঠেছে যে আজকের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নগ্ন ভাবে বাজপেয়ীর প্রয়াণকে তাঁর রাজনৈতিক ফায়দা তোলার কাজে লাগাচ্ছেন।
তাঁরা বিভিন্ন রকমের তুলনা করছেন, যার মূল বক্তব্য হল বাজপেয়ী কতটা মহান ও মোদী কতটা নিম্নস্তরের রাজনীতিক। যুক্তি দিয়ে সেটা প্রমাণ করার চেষ্টাও চলছে।
বাজপেয়ী শ্রদ্ধা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর
বিজেপি একটা রাজনৈতিক দল, যার অন্তর্নিহিত কার্যপদ্ধতি সম্বন্ধে দেশের খুব অল্প মানুষের ধারণা আছে; যাঁরা নিজেদের রাজনৈতিক বিশ্লেষক বা বোদ্ধা হিসাবে মনে করেন তাঁরাও ব্যতিক্রমী নন।
অটলবিহারী বাজপেয়ী ভারতের একমাত্র নেতা যিনি জোট রাজনীতিকে একটি দীর্ঘ সময় ধরে সার্থকতার চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। এটাই ছিল সময়ের দাবি এবং সাংগঠনিক ভাবে এই দায়িত্বই তাঁর উপরে ন্যস্ত করা হয়েছিল।
যাঁরা ১৯৯৫ সালে মুম্বইয়ের রেসকোর্সে বিজেপির দ্বিতীয় প্লেনারি সেশনের জনসভা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল তাঁরা একটা বিষয় জানেন: শিবাজি ময়দানের সেই জনসভায় সকলকে চমকে দিয়ে বক্তৃতার একদম শেষ পর্যায়ে লালকৃষ্ণ আডবাণী প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে বাজপেয়ীর নাম ঘোষণা করেছিলেন। সেটা ছিল সম্পূর্ণ সময়ের দাবি, সমসমায়িক রাজনীতিক গতিপ্রকৃতি উপলব্ধি করে অত্যন্ত সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত।
অটলবিহারী বাজপেয়ী (ইন্ডিয়া টুডে)
আজকে নরেন্দ্র মোদী যে প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী, সে দিন সেই একই প্রক্রিয়ায় বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হয়েছিলেন। সেই সময়ের পরিপ্রক্ষিতে লালকৃষ্ণ আডবাণী নন, অটলবিহারী বাজপেয়ী ছিলেন সঙ্ঘ পরিবারের প্রথম পছন্দ। পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে এই চয়ন কতটা সঠিক ছিল এবং কতটা সময়োপযোগী ছিল।
সেই সময়ে আরএসএস পরিবারের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে সময়ের দাবি অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল। তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার গঠন সম্ভব নয়। তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন জোট সরকার চালাতে গেলে কী ধরনের ব্যক্তিত্ব প্রয়োজন। বাজপেয়ী সেই কৌশল বাস্তবায়িত করেছেন। কিন্তু কখনও নীতি থেকে ভ্রষ্ট হননি।
তার পরে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেছে। ২০১৩ সালে গোয়াতে যখন বিজেপির রাষ্ট্রীয় কর্মসমিতির অধিবেশেন হয়েছে, সেখানে নরেন্দ্র মোদীকে বিজেপির নির্বাচনী প্রচার কমিটির চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হল।
দলের অভ্যন্তেরর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তখন অনেকটাই নিশ্চিত যে তাঁরা একক ভাবে ক্ষমতা দখলের অনেক কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। তখন তাঁদের প্রয়োজন ছিল এমন একজন ব্যক্তিত্বের যিনি একক সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারকে নির্দিষ্ট পথে পরিচালনা করতে পারেন। এটাও আরেকটা সময়ের দাবি।
এই তুলনা অবান্তর যে আজ অটলবিহারী বাজপেয়ী থাকলে তিনি কী ভাবে সরকার চালাতেন অথবা নরেন্দ্র মোদী কেমন ভাবে সরকার চালাচ্ছেন অথবা বাজপেয়ী যখন প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন সেই সময়ে নরেন্দ্র মোদী কী ভাবে সরকার চালাতেন। দু’জনের কার্যপদ্ধতি শুধুমাত্র নীতিতে অবিচল থেকে কৌশলকে বাস্তবায়িত করা।

