জঙ্গলমহল হাসছে, তাও কেন কেন্দ্রীয় বাহিনী চাইছে রাজ্য সরকার
পুজোর মরসুমে ঝাড়গ্রাম-লালগড়ের মানুষ বিভ্রান্ত এবং আতঙ্কিত
- Total Shares
২০০৯ সালের ১৫ জুন। ধরমপুর পার্টি অফিসের সামনে অনুজ পাণ্ডের বাড়ি ভাঙার এবং পার্টি অফিস ভাঙার তথাকথিত সফল আন্দোলনের পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের মাওবাদীদের সশস্ত্র বাহিনীর কোনও এক নেতা।
শোনা যায় সেই যুবক বিকাশ নামে পরিচিত ছিল। সেই বিকাশ প্রথম প্রকাশ্যে ঘোষণা করে যে, ২০০৮ সালের ২ নভেম্বর শালবনি থেকে ফেরার পথে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের উপরে যে আক্রমণ হয়েছিল তা মাওবাদীরাই সংঘটিত করেছিল এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রাণহানি ঘটানোটাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।
লালগড়ে পোড়ানো হচ্ছে সিপিএম পার্টি অফিস (ফাইল চিত্র: পিটিআই)
কতিপয় সাংবাদিকের সামনে এই ঘোষণা সে দিন ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে। এবং তার ঠিক দু’দিন পরে ১৭ জুন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক পশ্চিমবঙ্গে অপারেশন গ্রিন হান্ট শুরু করে। মাওবাদীদের কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে সেটাই ছিল কেন্দ্রীয় বাহিনীর প্রথম উপস্থিতি।
তারপরে কেটে গেছে দশটি বছর। সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলেছে। চারিদিকে প্রচারে ছয়লাপ ‘’জঙ্গলমহল হাসছে। ‘’উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে জঙ্গলমহল। তা হলে অসুবিধাটা কোথায়, কোন রাজ্য সরকারের আপত্তি জঙ্গলমহলের অবশিষ্ট অংশ থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে? এবং এটা একবার নয়, বারবার ঘটে চলেছে।
লালগড়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর টহল (ফাইল চিত্র: পিটিআই)
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক যত বার মাওবাদী সমস্যা নিয়ে বৈঠকে বসেছে, যতবার ইস্টার্ন জোনাল কাউন্সিলের বৈঠক বসেছে ততবার পশ্চিমবঙ্গ থেকে দাবি করা হয়েছে যে এ রাজ্যে মাওবাদী সমস্যা নিয়ন্ত্রণে। আধাসামরিক বাহিনীর অযথা অপব্যবহার বন্ধ করতে ইতিমধ্যেই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে এই বাহিনী। বাকি রয়েছে মূল জঙ্গলমহল অংশ। যাকে কেন্দ্র করে লালগড়ের কুখ্যাতি সারা দেশজুড়ে।
স্বাভাবিক ভাবেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং প্রশ্ন তুলেছেন, এই অংশ থেকেও কেন্দ্রীয় বাহিনী কেন প্রত্যাহার করা হবে না? রে-রে করে উঠেছে রাজ্য সরকার। এই রাজনীতির বাস্তবতা পশ্চিমবঙ্গবাসীর বোধগম্য হচ্ছে না।
পশ্চিমবঙ্গে কাজিপাড়ার মতো ঘটনায় জেএমবি থেকে আলকায়দার তত্ত্ব খাড়া করা হচ্ছে। জঙ্গলমহল থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী প্রত্যাহারে আপত্তি জানানো হচ্ছে। তা হলে পশ্চিমবঙ্গে আইনশৃঙ্খলার প্রকৃত অবস্থা কী। রাজ্য সরকারের কাছে কি কোনও বিশেষ এবং গোপন তথ্য আছে, যা অতি ভয়ঙ্কর কিন্তু প্রকাশ্যে আনা সম্ভব হচ্ছে না?
এটা ঘটনা যে সরকার পরিচালনা করার ক্ষেত্রে বহু তথ্য গোপনা রাখা খুবই জরুরি। কিন্তু সরকারের ব্যবহার এবং প্রচারের মধ্যে যদি বিপরীতমুখী সঙ্ঘাত থাকে, তাহলে মানুষের মনে সন্দেহ জাগা স্বাভাবিক।
ঝাড়গ্রাম-লালগড়ের মানুষ আজ আতঙ্কিত, তা হলে তারা কি দশ বছর বাদেও সুরক্ষিত নয়? কিসের প্রয়োজন কেন্দ্রীয় বাহিনীর? প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে কেন আপত্তি তুলছে রাজ্য সরকার?
নবান্নে (বাঁ দিক থেকে) ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী রঘুবর দাস, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী সুশীল মোদী (পিটিআই)
একটা রাজ্য মাওেবাদমুক্ত, এই তকমা যদি পাওয়া যায়, তা হলে সেটা তো সরকারের চূড়ান্ত সাফল্য! সরকার এই সুযোগ হাতছাড়া করছে কেন? কারণ হিসাবে আলোচনায় আসছে দুটি বিষয়। হয় মাওবাদীদের কোনও গোপন গতিবিধি সরকারের নজরে রয়েছে, অথবা মাওবাদকে কেন্দ্র করে যে বিশাল কেন্দ্রীয় আর্থিক সহায়তা পাওয়া যায়, তার অপব্যবহার করার একটি প্রচেষ্টা রাজ্য সরকারের তরফ থেকে রয়েছে।
বাস্তব যাই হোক না কেন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সাম্প্রতিক সফরের মধ্যে এই পুজোর মরসুমে ঝাড়গ্রাম-লালগড়ের মানুষ বিভ্রান্ত এবং আতঙ্কিত। রাজ্য সরকার বা শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে এ ব্যাপারে তিনি যদি স্পষ্ট ব্যাখ্যা না পান, তা হলে তাঁদের কাছে শারদীয়ার উসব যথেষ্ট আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
এমনিতেই কাজিপাড়ায় বিস্ফোরণের পরে উত্তরবঙ্গ থেকে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর পুলিশ বাহিনীকে যে সাবধানবানী শুনিয়েছেন তা মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করার পক্ষে যথেষ্ট, বিশেষ করে পুজোর মরসুমে।
পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজো ভারতের একমাত্র উৎসব যাতে একই সময়ে সারা রাজ্য জুড়ে কয়েক কোটি মানুষ রাস্তায় থাকেন। এইরকম একটা প্রেক্ষাপটে মাওবাদ নিয়ে রাজ্য সরকারের প্রতিক্রিয়া অথবা কাজিপাড়া নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর উদ্বেগ রাজ্যবাসীর কাছে রীতিমতো নেতিবাচক বার্তা বহন করছে।

