কথায় কথায় টাকার ঘোষণা কেন করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?
আদালতে সরকার জয়ী হোক বা পরাজিত, আদপে জয় হচ্ছে শাসকদলের
- Total Shares
ক্লাবকে টাকা, ইমাম-মোয়াজ্জেনদের ভাতা, দুর্গাপুজোয় চাঁদা – এ সব দেখেশুনে অনেকেই কটাক্ষ করে বলছেন, এই সরকার খেলা-মেলার সরকার। তাতে সরকারের কিছু যায় আসে না, তারা ঘোষণা করতেই থাকে। তবে প্রশ্ন হল, ঘোষণা মতো টাকা কি লোকে পাচ্ছে? সরকার আদালতে ধাক্কা খাচ্ছে, এতবার ধাক্কা খেলেও পড়ছে না, উল্টে মজবুত হচ্ছে। আদালতে সরকার হারুক বা জিতুক, আখেরে লাভ হচ্ছে রাজ্যের শাসকদলটির। কেন?
বিষমদে মৃত্যু, ইমামদের জন্য ভাতার পরে এবার দুর্গাপুজোর জন্য চাঁদা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী (ফাইল ছবি:পিটিআই)
বিষমদ খেয়ে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে রাজ্যে পৌনে দুশো জনের কাছাকাছি লোকের মৃত্যু হয়। কয়েকমাস আগে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ঘোষণা করে দিলেন মৃতদের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হবে। কেউ বিষমদ খেলে টাকা পাবে কেন? মামলা হল আদালতে, টাকা কেউ পেলে কিনা, সেই খোঁজ কেউ রাখল না, শুধু একটি বাংলা প্রবচনের রদবদল করে রটিয়ে দেওয়া হল: মরা দাঁতাল এক লাখ, মরা মাতাল দু-লাখ। সরকার যে এই পরিবারগুলোর পাশে, সরকারের যে সদিচ্ছা রয়েছে, সেই বার্তা রটে গেল।
ইমাম-মোয়াজ্জেনদের ভাতার ব্যাপারটাও তাই। ২০১২ সালের গোড়ায় সরকার ঘোষণা করে দিল তাঁরা ভাতা পাবেন। একদল বলল, তা হলে পুরোহিতরা ভাতা পাবেন না কেন? তখন বিজেপি নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না তৃমমূল সরকারের, তাই সরকার তাতে পাত্তা দিল না। মামলা হল আদালতে, ২০১৩ সালের শেষ দিকে জনস্বার্থ সেই মামলায় জানানো হল, এই ঘোষণা অসাংবিধানিক। আদালতের রায়ে সরকারকে মাসে মাসে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিতে হল, কিন্তু রাজ্যের মুসলমানদের কাছে বার্তা পৌঁছে গেল, এই সরকার মুসলমান-বান্ধব।
বিজয়া দশমীতে দুর্গাঠাকুর বিসর্জন করা যাবে না বলে সরকার হুলিয়া জারি করে দিল, গত বছররে ঘটনা। ফের আদালত — দশমীতে ঠাকুর বিসর্জন হল বটে, কিন্তু মুসলমান সমাজের কাছে বার্তা গেল, সরকার দুর্গাপুজোয় নয়, মহরমেই গুরুত্ব দেয়।
সরকারি কর্মীদের ডিএ বকেয়া, টাকা যাচ্ছে অন্য খাতে (উপস্থাপনামূলক ছবি:পিটিআই)
ভোট মেরুকরণ নিয়ে এখন চাপে তৃণমূল সরকার। তাই এ বছর তারা ঘোষণা করে দিয়েছে রাজ্যের ২৮,০০০ পুজোকে ১০,০০০ টাকা করে দেওয়া হবে। হিনদুদের মন জয় করার চেষ্টা, পাশাপাশি ২৮,০০০ ক্লাব মানে কম ১০ লক্ষ সদস্য, তাদের পরিবারের সদস্য ধরলে বিপুল সংখ্যক ভোটার! ফের আদালত। প্রশ্ন উঠেছে যদি ইমাম-মোয়াজ্জেনদের ভাতা দেওয়া অসাংবিধানিক হয়, তা হলে দুর্গাপুজোয় চাঁদা দেওয়া কেন অসাংবিধানিক হবে না? অতএব? আদালতের রায় যাই হোক, ক্লাবগুলির মন জয় করে নিয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা।
ইমাম-মোয়াজ্জেনরা ভেবেছিলেন সরকার দিতে চাইছে, এখন ক্লাবের লোকজন ভাবছেন সরকার দিতে চাইছে... এখানেই সরকারের লাভ। যদি মামলা না হত তা হলে কী হত? সরকার তো আর মন্ত্রীদের বেতন থেকে টাকা দিত না, টাকা দেওয়া হত করদাতাদের টাকা থেকে।
যারা ভাবছে সরকার তো দিতে চেয়েছে তারা কারা? তারা সেই সব লোক যারা ভাবেইনি যে কেন সরকার এই টাকা দেবে অথবা সরকার এই টাকা দেবে বললেই তারা এই টাকা নেবে কেন। এই ধরনের ভাবনার লোকই লোকই রাজ্যে সংখ্যাগুরু। অতএব সদিচ্ছা দেখিয়ে সরকার, মানে সরকার চালানো রাজনৈতিক দল, ভোটারদের মন জয় করার কাজটি করে ফেলছে। টাকা দেওয়া নয়, তাদের মূল উদ্দেশ্য ভোটারদের মন জয় করা।
পঞ্চায়েত ভোট ঘোষণার পরে রাজ্য সরকার নিয়ম ভেঙে ঘোষণা করে দিল মহার্ঘ্য ভাতা দেওয়া হবে। এমন ঘোষণার ফল কিছুটা হলেও ভোটবাক্সে পড়বে। ২০১৭ সালের জুন মাসের হিসাব অনুযায়ী, রাজ্য সরকারের কর্মীর সংখ্যা ছিল ৩ লক্ষ ৬ হাজার ৮২০। মানে মোটামুটি ভাবে তাঁদের পরিবারের ভোটার ধরলে ২০ লক্ষ মানুষের মন জয় করা গেল।
ক্ষমতায় আসার পরে মহার্ঘ্যভাতা ঘোষণার সময় মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন ৩৪ বছরের বামফ্রন্টের রেখে যাওয়া ১,২৮,০০০ কোটি টাকা ঋণের জন্যই সরকার সমস্যায় পড়েছে। গত বছর বিধানসভায় এক প্রশ্নের উত্তরে জানানো হয়, তৃণমূল সরকার নতুন করে ১ লক্ষ ৩৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ করেছে। মানে বছর ছয়েকে এই ঋণ করা হয়েছে। এই ঋণ নাকি লেগে গিয়েছে সুদাসল পরিশোধ করতে। মহার্ঘ্য ভাতা ঘোষণার সময় আগে দোষ দেওয়া হত বামফ্রন্টের ঋণের বোঝাকে, এখন দোষ দেওয়া হয় কেন্দ্রীয় সরকার প্রাপ্য টাকা কেটে নিচ্ছে বলে!
ঋণ নিয়ে পরিকাঠামো উন্নয়ন কতটা হয়েছে? পরিকাঠামো উন্নয়নের বদলে এ ক্ষেত্রেও সরকার জোর দিয়েছে সৌন্দর্যায়নে, সেখানেও চমকের রাজনীতি, রাজ্য অন্তঃসারশূন্য হয় হোক, যেন লোকে আপাত ভাবে খুশি হয়। সেতুতে নীল-সাদা রং হয়েছে, দেখা হয়নি তার অবস্থা। তাই সেতু ভেঙে পড়েছে। একটা নয়, কয়েকটা। প্রতিবারেই দোষ দেওয়া হয়েছে পূর্বসূরীকে। ক্লাবগুলিকে ২ লক্ষ টাকা করে দিয়েছিল তৃণমূল সরকার। কিন্তু সেতুর অবস্থা খতিয়ে দেখা হয়নি। কেন, তার উত্তর পাওয়া যাবে না।
কোনটা অসাংবিধানিক, কোনটা অবাস্তব, সে সব নিয়ে সরকারের সরকারের মাথাব্যথা নেই। সিঙ্গুর থেকে যার শুরু। সিঙ্গুর নিয়ে আইন হয়েছে, সেখানে চাষ হচ্ছে কি? সেই খবর কে রাখে?

