ধর্মঘটের বিরোধিতা করে কঠোর হয়ে কী লাভ হয় মমতার?
রাজ্যের লাভ না হলেও রাজনৈতিক ভাবে অনেকটাই সুবিধা হয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর
- Total Shares
হরতাল তিনি সমর্থন করেন না, কিন্তু যে কারণে হরতাল তা তিনি সমর্থন করেন। এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি রসিকতা চালু হয়েছে মিস্টার বিনের ছবি দিয়ে: উনি চিলি চিকেন খেতে ভালোবাসেন কিন্তু মুরগি মারার বিরোধী।
একসময় নিজেই বনধ ডেকেছেন, সে কথা স্বীকার করে নিয়েই মুখ্যমন্ত্রী হয়ে তিনি রাজ্যজুড়ে বনধ সংস্কৃতি নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। বনধের দিন সরকারি কর্মী অফিসে না এলে কর্মদিবস থেকে এক দিন কমিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও তিনি দিয়েছেন। তবে তার বদলে তিনি আবার একদিন ছুটিও দিয়ে দিচ্ছেন। তা হলে এটা কী ধরনের নীতি?
ধর্মঘটের কারণ সমর্থন করেন, ধর্মঘট নয় (ছবি: সুবীর হালদার)
হঠকারী সিদ্ধান্ত নয়, বেশ ভেবেচিন্তেই এই অবস্থান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েই। ধর্মঘটের আগের দিন সরকারি কর্মীরা থেকে যান বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে। তাঁরা ঝুঁকি নিতে চান না। রাতভর পিকনিকের মেজাজ। সকাল থেকে ছুটির মেজাজে থেকে বিকেলে বাড়ি যান। যে কর্মসংস্কৃতি বজায় রাখতে এত পরিশ্রম, সেই পরিশ্রমের পুরস্কার হিসাবে তাঁরা পেয়ে যান একদিন ছুটি।
তা ছাড়া জামাইষষ্ঠীতেও আধবেলা ছুটি পান রাজ্যসরকারি কর্মীরা। এবার দুর্গাপুজোয় মোটামুটি দিন পনেরো ছুটি।
ছুটি ছুটি ছুটি... তা হলে বনধ ব্যর্থ করতে এত তোড়জোড় কেন? ধর্মঘটের সংস্কৃতি বন্ধ করে রাজনৈতিক ভাবে অনেকগুলি দায় ঝেড়ে ফেলতে চান রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।
তিনি যে জমি আন্দোলনের জেরে এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, সেই আন্দোলনের জেরেই রাজ্য থেকে টাটাকে মাঝপথে ন্যানোগাড়ি তৈরির কারখানা বন্ধ করে রাজ্য ছাড়তে হয়েছে। শুধু দেশ বা রাজ্য নয়, টাটার মতো ভারতীয় বহুজাতিক সংস্থাকে রাজ্য থেকে তাড়ানোর জন্য এ রাজ্যের প্রতি শিল্পপতিরা ও বিনিয়োগকারীরা বিরূপ হয়েছেন। তাঁরা এখন যা বিনিয়োগ করছেন তাকে বাঁ হাতে মনসা পুজো বলা চলে। তবে ধর্মঘট বন্ধ করে তিনি একাধিক রাজনৈতিক লাভ করেছেন।
ধর্মঘটের সমর্থনে কলকাতায় মিছিল (ছবি: সুবীর হালদার)
শ্রমিক ইউনিয়নগুলি দাবি আদায়ের জন্য ধর্মঘট করত, এটা তাদের একরম অধিকার, এটাই তাদের প্রতিবাদের ধরন। বাম আমলে তা জঙ্গি আন্দোলনে পরিণত হয়। চাক্কাজ্যামের মতো জোর-জবরদস্তি জনজীবন অচল করে রাখা বেশ কিছুদিন চলার পরে শুরু হয় সমর্থক ও বিরোধীদের মারদাঙ্গা। তারপরে ধীরে ধীরে তা একটি ছুটির দিনে পরিণত হয়। বনধ যেই ডাকুক, গাড়ি পথে নামে না বিমার টাকা না পাওয়ার আশঙ্কা থাকে বলে। লোকেও ঝঞ্ঝাট এড়াতে সারাদিন বাড়িতে-ক্লাবে কাটিয়ে দেয়।
মুখ্যমন্ত্রী হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করে দেন যে তিনি কোনও রকম বনধ সমর্থন করেন না, বনধ তিনি হতে দেবেন না। দিচ্ছেনও না। যে কোনও প্রকারে বনধ ব্যর্থ করতে রাষ্ট্রশক্তি প্রয়োগ করতে পিছপা হন না – সরকারি বাস অন্য দিনের চেয়ে অনেক বেশি থাকে, সরকারি কর্মীদের উপস্থিতির হার প্রায় ১০০ শতাংশ থাকে, এখন প্রায় সব কারখানাই তৃণমূল শ্রমিক সংগঠন স্বীকৃত হওয়ায় সেখানেই উপস্থিতির হার ভালোই থাকে। কিন্তু কাজেরকাজ কী হয়?
“যদি কিছু হয়” ভেবে অভিভাবকরা স্কুল-কলেজে পাঠান না পড়ুয়াদের, যাঁদের উপায় আছে তাঁরাও কাজে যান না। ফলে পথঘাট ফাঁকা থাকে। অর্থাৎ রাজ্যের মানুষের ভোগান্তি হলেও কাজের কাজ কিছুই হয় না। উপরন্তু সরকারি কর্মীদের ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতে একটা অতিরিক্ত দিন ছুটি দিতে হয়।
কর্মসংস্কৃতি ফেরেনি, তবে এই ছবিও উধাও (ছবি: সুবীর হালদার)
আসলে এ রাজ্য থেকে বাম শাসনের অবসানের পরে বাম সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে উঠেপড়ে লেগেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি যখন রাজ্যের প্রধান বিরোধীদলের নেত্রী ছিলেন, তখন তাঁর সম্বন্ধে একটা কথা প্রায়ই শোনা যেত – তিনি সিপিএমের চেয়েও বড় বামপন্থী। তাঁর আন্দোলনের ধরনই এর কারণ।
কোথায় কী হচ্ছে, পেট্রোলের দাম কত পয়সা বাড়ল এ নিয়ে সাধারণ লোকের মাথাব্যথা তখনই হয় যখন ভাড়া বাড়ে, তার আগে নয়। তাই সরকারের কাজকর্ম নিয়ে লোককে নাড়িয়ে দেওয়ার সবচেয়ে সহজ অস্ত্র হল ধর্মঘট। এটা এখন আর শুধু শ্রমিকদের নয়, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোরও সবচেয়ে বড় অস্ত্র। মুখ্যমন্ত্রী সবকিছু স্বাভাবিক রাখা নিয়ে যে হইচই করেন, তাতে বনধের মূল কারণের বদলে সংবাদমাধ্যমে জায়গা করে নেয় নবান্নে রাত কাটানোর ছবি, পরের দিন ভোরে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি... কমর্নাশা ধর্মঘট ব্যর্থ হওয়ার ছবি। এটিও রাজনৈতিক ফায়দা।
দেশজুড়ে বনধ নিয়ে নানা ধরনের ঘটনা ঘটলেও এ রাজ্যর ধর্মঘট ব্যর্থ। তাতে সর্বতো ভাবে রাজনৈতিক লাভ হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরই। জামাইষষ্ঠীর ছুটির খবর শিল্পপতিরা রাখেন না, তাঁরা রাখেন বনধের দিনের খবরটুকুই।

