লোকসভা নির্বাচন ২০১৯: বিহারে কেন বিজেপি-জেডিইউ সমান আসনে লড়বে?
এনডিএ ছেড়েও মুখ্যমন্ত্রিত্ব বজায় রাখতে পুরোনো জোটে ফিরেছেন নীতীশ
- Total Shares
লোকসভা ভোটে ৪০ আসনের বিহারে সংযুক্ত জনতা জল (জেডিইউ) ১৬টি আসনে লড়ার সুযোগ পাওয়ায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের যেমন লাভ হয়েছে, একই ভাবে লাভ হয়েছে বিজেপিরও। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে এনডিএ জোট থেকে বেরিয়ে মাত্র দু’টি আসনে জয়ী হতে পেরেছিল জেডিইউ। বিজেপি পেয়েছিল ১৬টি, রামবিলাস পাসোয়ানের লোক জনশক্তি পার্টি (এলজেপি) পেয়েছিল ৫টি, লালুপ্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) পেয়েছিল ৩টি আসন।
তবে ২০১৫ সালের বিধানসভা ভোটের আগে লালু প্রসাদ যাদবের সঙ্গে নীতীশ কুমারের জোট এবং পরে বিজেপির সমর্থন নিয়ে নীতীশের মুখ্যমন্ত্রিত্ব টিকিয়ে রাখা পুরনো সব হিসাব বদলে দিয়েছে। বিহারের ক্ষেত্রে দেখার, এনডিএ জোটের প্রতি এখনও বিহারের আস্থা আছে কিনা।
বিধানসভা ভোটের আগে লালুপ্রসাদ যাদব ও নীতীশ কুমার। এই ছবি ছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী (পিটিআই)
জোট আর মহাজোট নিয়ে যতই কথা হোক না কেন, লোকসভা ভোটের সময় শিবির হয় মূল দু’টি – বিজেপির এনডিএ এবং কংগ্রেসের ইউপিএ জোট। তৃতীয় জোট এখনও পর্যন্ত কোনও দিনই শক্তিশালী বিকল্প হিসাবে নিজেকে তুলে ধরতে পারেনি।
এখনও পর্যন্ত কংগ্রেস জোটের যে ছন্নছাড়া অবস্থা তা পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা ভোটের মুখেই স্পষ্ট। বহুজন সমাজ পার্টির প্রধান মায়াবতী জোট করেননি কংগ্রেসের সঙ্গে। পরে একই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদবও। উত্তরপ্রদেশ নিয়ে এখনও চূড়ান্ত ফয়সালা হয়নি। তবে কংগ্রেস-সহ প্রতিটি রাজনৈতিক দলই আসন্ন বিধানসভা ভোট নিয়ে ব্যস্ত। এই অবস্থায় বিজেপি এগোচ্ছে ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের কথা মাথায় রেখে।
বিহারে ভোট নেই। তাই এই রাজ্যে নিজেদের ঘুঁটি আগেভাগে সাজিয়ে রাখতে চাইছে বিজেপি তথা এনডিএ। উত্তরপ্রদেশে তারা সম্ভবত আরেকটু জল মাপবে প্রার্থী ঘোষণার আগে।
এনডিএ জোট ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে লোকসভা ভোটে একা লড়াই করে জেডিইউ পেয়েছিল ২টি আসন। বিধানসভা ভোটে তারা জোট বাঁধে আরজেডির সঙ্গে। ফল প্রকাশ হলে দেখা যায় যে রাজ্যে প্রধান রাজনৈতিক দল হিসাবে উঠে এসেছে আরজেডি, দ্বিতীয় স্থানে বিজেপি। নীতীশের দল জেডিইউ তৃতীয় স্থানে থাকলেও মুখ্যমন্ত্রী থেকে যান নীতীশই। পরে আরজেডি সমর্থন তুলে নিলেও বিজেপি তাঁকে সমর্থন করে দেওয়ায় মুখ্যমন্ত্রী পদ হারাননি নীতীশ।
নীতীশ কুমার ও অমিত শাহ: সমান সংখ্যক আসনেই তাঁরা লড়বেন (পিটিআই)
২০০৯ সালে বিহারে বড়ভাই ছিলেন নীতীশ, তিনি লড়েছিলেন ২৫টি আসনে, বিজেপি ১৫টিতে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তুলে ধরে যখন প্রচার তুঙ্গে তখন জোট ছাড়েন নীতীশ। কিন্তু ফল বার হলে দেখা যায় জোট ছেড়ে তিনি ভুলই করেছেন।
এখন ২০০৯ সালের মতো নীতীশ আর বড়ভাই নেই, ২০১৪ সালের মতো মোদী হাওয়াও নেই। আবার ২০১৫ সালের ভোটের পর থেকে বিহারে নীতীশ কুমারও যে দারুণ ভালো অবস্থায় আছেন, তাও নয়। তা ছাড়া মোদীকে বিজেপি প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তুলে ধরার পরে নীতীশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় বাসনায় আঘাত লেগেছিল বলেই এনডিএ-র সঙ্গ ছাড়েন তিনি। এখন তিনি বুঝে গিয়েছেন এনডিএ ক্ষমতায় এলে বিজেপিরই কেউ প্রধানমন্ত্রী হবেন, ইউপিএ জোট জয়ী হলে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীই মসনদে বসবেন। তৃতীয় ফ্রন্টে তিনি যোগ দিলেও তাঁকে ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তুলে ধরার কোনও প্রশ্নই নেই, প্রতিটি আঞ্চলিক দলের প্রধানই এই পদের দিকে তাকিয়ে।
এই অবস্থায় ৪০টি লোকসভা আসনের বিহারে সমসংখ্যক আসনে তাঁরা লড়বেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ ও জেডিইউ প্রধান নীতীশ কুমার। আসন সমঝোতা করা ছিল নীতীশের কাছে সম্মানের লড়াই। এই সমঝোতায় তিনি খুশি।
শোনা যাচ্ছে তাঁরা নিজেরা ১৬টি করে আসনে লড়বেন এবং ৬টি আসন এলজেপিকে ছেড়ে দেবেন, দু’টি ছাড়বেন এনডিএ জোটের অপর সঙ্গী উপেন্দ্র কুশওয়াহার রাষ্ট্রীয় লোক সমতা পার্টি (আরএলএসপি)। এখনও আসন ঘোষণা হয়নি, তবে এই ভাগবাঁটোয়ারায় খুশি নন রামবিলাস পাসোয়ান।
নরেন্দ্র মোদীকে তিনি প্রধানমন্ত্রী দেখতে চান বলে সওয়াল করলেও ইতিমধ্যেই লালুপ্রসাদ যাদবের ছেলে তেজস্বীর সঙ্গে দেখা করেছেন কুশওয়াহা। আসন সমঝোতা পছন্দ না হওয়ায় তিনি কী করবনে বলা মুশকিল। সম্ভবত পাসোয়ান এবং কুশওয়াহাকে বুঝিয়ে তার পরেই আসন ঘোষণা করবে এনডিএ জোট।
এই আসন সমঝোতা শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হলে এনডিএর তিন শরিকের কাছে চ্যালেঞ্জ হবে তাদের জেতা আসন ধরে রাখা। উল্টোদিকে আসন বাড়িয়ে নেওয়ার বিপুল সুযোগ পাবেন নীতীশ।
আগের লোকসভা নির্বাচনে একক শক্তিতে মাত্র দু’টি আসনে জেতা নীতীশ কুমারের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সম্মানজনক শর্তে আসন সমঝোতা করা। বিহার তো বটেই, মহারাষ্ট্রেও বিজেপির সঙ্গ ছেড়ে পস্তেছে বিজেপির স্বাভাবিক সঙ্গী বলে পরিচিত উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা। মাত্র দু’টি আসন নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় জোট ভেস্তে গিয়েছিল। বিহারে এনডিএ জোট ছেড়ে গোহারা হেরেছেন নীতীশ এবং পরে সিংহাসন বাঁচাতে তাঁকে আবার আশ্রয় নিতে হয়েছে এনডিএ-র ছাতার তলায়। তাই এবারে সম্মানজনক ভাবে আসন সমঝোতা ছিল তাঁর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে এখনও বিহারে নীতীশের ধারেকাছে কেউ নেই। যদিও তাঁর দল ২০১৫ সালের বিধানসভা ভোটে তিন নম্বরে নেমে গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নীতীশ কুমার এখনও পর্যন্ত বিহারবাসীদের সেরা পছন্দ হলেও তাঁর দল পর পর দুই ভোটে জনতার আস্থা অর্জন করতে পারেনি। নীতীশের পক্ষে একা লড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন, সে ক্ষেত্রে প্রথমেই তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্ব খোয়ানোর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারত। দ্বিতীয়ত ভরাডুবি হতে পারে তাঁর দলও। তাই গত লোকসভায় ২টি আসনে জেতা জেডিইউ-র কাছে ১৬টি আসল পাওয়া মানে বেশ সম্মানজনক বোঝাপড়া।
অমিত শাহ কেন রাজি হলেন? কারণ তিনি জানেন পাঁচ বছরের না রাখা প্রতিশ্রুতির বিরুদ্ধে যখন তিনি ভোটের লড়াই শুরু করতে যাচ্ছেন তখন মোদী হাওয়া নেই, উত্তর দিতে হচ্ছে পেট্রল-ডিজেল-রান্নার গ্যাসের দামবৃদ্ধি নিয়ে। তার উপরে রাফাল নিয়ে অভিযোগ, বিজয় মালিয়া-মেহুল চোক্সিদের দেশ ছাড়ার মতো নানা প্রশ্নের উত্তর এখন তাঁদের দিতে হবে। তাই জেতা ১৬টি আসন ধরে রাখতে পারলেই যথেষ্ট। জোটের ক্ষেত্রে নীতীশের দলের আসনগুলিও বাড়তি লাভ।
২০১৩ সালে মোদীকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বিজেপি তুলে ধরায় এনডিএ ছাড়েন নীতীশ
উচ্চাকাঙ্ক্ষী রামবিলাস পাসোয়ান যে মাত্র ৬টি আসন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবেন না, সে কথা জানেন অনিত শাহরা। তবে এনডিএ সরকারের মন্ত্রী রামবিলাসকে এখনও অন্য কোনও পক্ষ আমন্ত্রণ জানায়নি, অন্য জোটে গিয়ে গতবারের জেতা আসন ধরে রাখাও বারে বারে শিবির বদল করা রামবিলাসের পক্ষে ধরে রাখা কঠিন হবে। তাই তাঁর জোট ছাড়ার উপায় বেশ কম। কুশওয়াহা এখনও পর্যন্ত দুই নৌকায় পা দিয়ে চলছেন বলে তাঁকে অমিত শাহরা কতটা ধর্তব্যের মধ্যে আনছেন, তা বোঝা মুশকিল।
আরজেডির সঙ্গে জোট বেঁধে গত বিধানসভা ভোটে বেশ কয়েকটা আসন বাড়িয়ে নিয়েছে কংগ্রেস। এ রাজ্যে তাদের যা অবস্থা তাতে লালুপ্রসাদের সমাধানসূত্রই মেনে নিতে হবে। তাই কংগ্রেসের পক্ষে এই রাজ্যে ২০১৯ সালের সমীকরণ ভেবে লাভ নেই। তেজস্বী যাদব যদি প্রস্তাবিত ফেডেরাল ফ্রন্টেও যান, তা হলেও বিহারের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের কোনও হেরফের হবে না।
২০১৯ সালের আগে যে যার সঙ্গেই জোট বাঁধুক না কেন, বিহারের জোট পরিস্থিতি বদলের উপায় কম। তাই এই রাজ্যে সরকারি ভাবে আসন সমঝোতার কথা ঘোষণা করে দিল ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্সের (এনডিএ) দুই শরিক বিজেপি এবং জেডিইউ।

