পঞ্চায়েত বোর্ড গঠন নিয়েও এত হিংসা কেন?
পুলিশ আত্মরক্ষা করতে না পারলে সাধারণের নিরাপত্তার হাল কী?
- Total Shares
সিপিএম জমানার শেষ দিকে সিপিএমকে যে ধরনের আক্রমণের মুখে পড়তে দেখা গেছে, এ রাজ্যে জায়গায় জায়গায় অনেকটা তেমনই আক্রমণের মুখে পড়তে দেখা যাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেসকে। পঞ্চায়েত ভোটে শাসকদলের বিরুদ্ধে যে দমন-পীড়ন করে বিরোধীদের প্রার্থী না দিতে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল, শুরুটা করা যেতে পারে সেখান থেকেই।
রাজ্যে উন্নয়নের যজ্ঞ চলছে, বিরোধীদের কিছুই বলার থাকতে পারে না, তাই তাদের প্রার্থী প্রচারে গিয়ে কী বলবেন? কী বলে ভোট চাইবেন? বিরোধী দলের প্রার্তীদের বিড়ম্বনার হাত থেকে রক্ষা করতে শাসকদলের সমর্থকরা অনেক জায়গাতেই তাদের প্রার্থী দিতে দেয়নি বলে অভিযোগ। এ নিয়ে মামলা দেশের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। ভোটগ্রহণ পর্ব শেষ হওয়ার তিন মাস পরে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে গ্রামপঞ্চায়েতে ৩৪ শতাংশ মতো আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন প্রার্থীরা, ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে তাঁরা সকলেই রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী।

আমডাঙায় উদ্ধার হওয়া বোমা
যে সব আসনে ভোট গ্রহণ হয়েছে, শাসকদলের দাপটে (অভিযোগ তাতে মদত ছিল পুলিশ-প্রশাসনের) সেখানে ভোটগ্রহণ প্রহসনে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ। তার পরেও যেখানে বিরোধীরা জয়ী হয়েছে, সেখানে যে তারা শক্ত গাঁটি গাড়তে পেরেছে, তা স্পষ্ট। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বোর্ড গঠন করলেই ঝামেলা মিটে যেত। কিন্তু রাজনীতি অত সরল নয়। শাসকদল চাইছে জয়ী বিরোধী প্রার্থীরা তৃণমূলে যোগ দিক। উল্টোদিকে বিরোধীরা চাইছে তারা একজোট হয়ে তৃণমূলকে বোর্ড গড়া থেকে দূরে রাখবে।
শাসকদলের প্রবল দাপটের মধ্যেও যেখানে বিরোধীরা জয়ী হয়েছে, সেখানে তারা সূচ্যাগ্র মেদিনী ছাড়তে রাজি নয়। সরকারেরে সঙ্গে পাল্লা দিয়েই তারা এই সব আসনে জয়ী হয়েছে।
গাঁটে গোনা যায় এমন যে কয়েকটি জায়গায় বামেরা জিতেছে সেখানে একটা ব্যাপার স্পষ্ট, সেই সব জায়গা সত্যিই এখনও বামেদের দুর্গ। যেখানে বিজেপি জিতেছে সেখানে একটা ব্যাপার স্পষ্ট যে ভোটের মেরুকরণ হয়েছে। তৃতীয় আরেকটি সম্ভাবনাও রয়েছে। ওই সব জায়গায় ভোটাররা তৃণমূলকে চাইছে না বলে বিরোধীপক্ষকে ভোট দিয়েছে। উত্তর যাই হোক, সেখানে জনসমর্থন যে তৃণমূলের পক্ষে নেই এটা স্পষ্ট। ২০১৩ সালে বোর্ডগঠন পর্ব মেটার বহু পরে ধীরে ধীরে দল ভাঙানো শুরু হয়েছিল, ধীরে ধীরে বদলাচ্ছিল বোর্ডের রং। এ নিয়ে কয়েকটিমাত্র জায়গায় সংঘর্ষ হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে ভোটের রেশ কাটার আগেই বোর্ড দখল করার জন্য সবপক্ষ ঝাঁপাচ্ছে তাই লড়াই, তাই হিংসা। হিংসা ছড়িয়েছে পুরুলিয়া, মালদা থেকে উত্তর ২৪ পরগনায়।
যে সব জায়গায় বামেরা (মূলত সিপিএম) ও বিজেপি জিতেছে সেখানে এখন তারা তৃণমূলকে বোর্ড গঠন না করতে দিতে দরকারে জোট করছে বা একে অপরকে সমর্থনও করছে। দলের শীর্ষনেতারা যাই বলুন না কেন, পঞ্চায়েতে চিরকালই এই ধরনের রামধনু বোর্ড গঠন হয়ে থাকে। তা নিয়ে হইচই সাধারণত হয় না। এ বারে সবই অন্য মাত্রা পেয়েছে বিজেপি ভোট পেয়ে যাওয়ায়।
পথে সংঘর্ষের চিহ্ন
বোর্ড গঠনের সময় শুরু হয়েছে প্রবল লড়াই। পুলিশও এখন আর ছেড়ে দিয়ে তেড়ে ধরতে পারছে না, মানে পরিস্থিতি তাদের হাতের বাইরে চলে গেছে। যেখানে তৃণমূল মার খাচ্ছে সেখানে ধরেই নেওয়া যেতে পারে যে শাসকদলের পেশীশক্তি ও পুলিশ মিলে শাসকদলের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। যদি নেতারা প্রহৃত হন তা হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার হাল কী? এক কথায়, মালদহে তিন বছরের শিশু গুলিবিদ্ধ হয়েছে!
এই ধরনের কোনও ঘটনা ঘটলে যা হয় তাই হচ্ছে, প্রশাসনিক পদে রদবদল।
মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, “খুন-সন্ত্রাসকে মার্কেটিং করে রাজনীতিতে নতুন মডেল তৈরি করতে চাইছে কেউ কেউ। আমরা সেটাকে ঠেকাতে চাই। এটা সুস্থ নয়, অসুস্থ রাজনীতি। সাত বছরে জঙ্গলমহলে একটাও খুন হয়নি, কয়েকটা আসনে জিতেই লম্ফঝম্ফ বেড়ে গিয়েছে।” মুখ্যমন্ত্রীর আক্রমণের তির বিজেপির দিকে। কিন্তু আমডাঙার অশান্তির সঙ্গে বিজেপির যোগ কী?
রাজ্যে গণ্ডগোল যে রাজনৈতিক দলই করুক না কেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব প্রশাসনের। প্রশাসন সেই দায়িত্ব কতটা মেনে চলছে? পুলিশের বিরুদ্ধে যখন চিকিৎসককে নিগ্রহের অভিযোগ উঠছে তখন পুলিশকর্মীরা মার খাচ্ছেন উঠতি নেতাদের কাছে। পুলিশ কি তা হলে এখন শক্তের ভক্ত নরমের যম?
আত্মসমীক্ষা করুক পুলিশ আর জনতার রায় মানতে শিখুন রাজনৈতিক নেতারা।

