ভোটের মুখে কেন আচমকা অনাস্থা প্রস্তাব গ্রহণ করলেন লোকসভার অধ্যক্ষ?

কেমন ছিল ২০০৩ সালের অনাস্থা, এ বারের সঙ্গে তার পার্থক্য ও মিল কোথায়

 |  7-minute read |   19-07-2018
  • Total Shares

রাত এগারোটায় বলতে উঠেছিলেন বাজপেয়ী। তেহলকা নিয়ে তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজের পক্ষ নিয়ে। তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতায় একটিমাত্র ছোট্ট খোঁচা ছিল কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর বিরুদ্ধে, তার পরোক্ষে। সবশেষে প্রত্যাশিত ভাবেই ৩১২-১৮৬ ভোটে জিতেছিল সরকার। ১৯৯৯ সালে যে এডিএমকে তাঁর সরকার ফেলে দিয়েছিল, ২০০৩ সালে তারা ভোটদানে বিরত রইল। বহুজন সমাজপার্টি ভোট দিল সরকারের পক্ষে। মাঝে ১৫ বছর।

আবার বিজেপি সরকারের শেষ লগ্ন, আবার অনাস্থা এনেছে কংগ্রেস (টিডিপির প্রস্তাব সমর্থন করেছে)। ভোটাভুটির ফল মোটামুটি ২০০৩ সালকেই মনে করিয়ে দিতে পারে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু কী বলবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী? তার আগে একবার বিচার করে নেওয়া যাক ২০ জুলাই হতে চলা অনাস্থার প্রেক্ষাপট।

লোকসভার অধ্যক্ষ এক কথায় বিরোধীদের দাবি মেনে অনাস্থা প্রস্তাবে সায় দেওয়ায় বিরোধীরাই অস্তস্তিতে পড়ে গেল। অন্ধ্রপ্রদেশকে বিশেষ মর্যাদার দাবি, এই ইস্যুতে তেলুগু দেশম পার্টি বেশ কিছুদিন ধরেই সরব। তবে অধিবেশনের শুরুতেই বুধবার অধ্যক্ষ সেই প্রস্তাব গ্রহণ করে শুক্রবার ২০ জুলাই এ নিয়ে আলোচনা ও ভোটাভুটির দিন স্থির করায় দেখা গেল, প্রস্তুত নয় বিরোধী শিবিবরই।

১৯৯৯ সালে যে ভাবে এক ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী, এ বার তেমন যে হবে না সে কথা জানে কংগ্রেস ও তেলুগু দেশম পার্টি। তাও তারা সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনেছে। ভোটের ক'মাস আগে সরকার এমন প্রস্তাব মেনে নেবে, তারা সম্ভবত ভাবেনি। তাই সংসদে দাঁড়িয়ে সরকারকে চাঁছাছোলা আক্রমণ করার সুযোগ তারা কতটা নিতে পাবে, তা নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিরোধীরা সময় কিনতে চাইলেও অধ্যক্ষ সুমিত্রা মহাজন তাতে রাজি হননি। এক কথায় অধ্যক্ষের রাজি হয়ে যাওয়ায় স্পষ্ট যে সরকার প্রস্তুত। আর লোকসভায় কংগ্রেস সংসদীয় দলের নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে সময় নিতে চাওয়ায় বোঝা গেছে, বিরোধীরা অপ্রস্তুত।

সংখ্যার বিচারে সরকার নিশ্চিন্ত থাকলেও, বিরোধীরা সংসদে দাঁড়িয়ে চাঁছাছোলা ভাবে সরকারের সমালেচনা করার সুযোগ পেয়ে যাবে। তা সত্ত্বেও তারা বিরোধীদের এই প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। সংখ্যার বিচারে এখন সরকার যেমন স্বস্তিতে, বাজেট অধিবেশনে তারা আরও ভালো জায়গায় ছিল। তখনও অনাস্থা প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু এডিএমকে-র গোলমালকে অজুহাত হিসাবে খাড়া করে সেই আবেদনে সাড়া দেননি অধ্যক্ষ। তা হলে বাদল অধিবেশনের প্রথম দিনেই কেন সরকার অভাবনীয় ভাবে তাতে সাড়া দিল?

body_071918060323.jpg

বিরোধীদের সামনে সুযোগ

২০০৩ সালে সরকারের কাজের বিরুদ্ধে সংসদে বলার জন্যই মূলত অনাস্থা প্রস্তাব এনেছিল কংগ্রেস। এবারেও তাই। জনসভায় ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকারের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস যে সব প্রচার করছে, এখন তারা সে সব কথা সরাসরি সংসদে দাঁড়িয়ে বলার সুযোগ পাবে। অনাস্থা প্রস্তাবে তথ্য-পরিসংখ্যান নিয়ে সরকারকে আক্রমণ করার করার সুযোগ পাবে বিরোধীরা। বিরোধীদের উত্তর দেওয়ার আগে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার জন্য সরকার সামান্য সময় হাতে পাবে যা না পাওয়ার মতো। তেলুগু দেশম পার্টির আনা অনাস্থা প্রস্তাব সমর্থন করেছে কংগ্রেস, সিপিএম, ওয়াইএসআর কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস এবং মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (এমআইএম)।

কর্নাটক ভোটের আগে রাহুল গান্ধী এই প্রথম বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। অনাস্থা প্রস্তাবের পক্ষে তিন বলতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নরেন্দ্র মোদীর বিকল্প হিসাবে নিজেকে তুলে ধরার এটাই সবচেয়ে বড় সুযোগ। তিনি দেশ চালানোর জন্য কতটা প্রস্তুত, সারা দেশ তা দেখতে পাবে। বিজেপি-বিরোধী শিবিরের নেতা হিসাবে নিজেকে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও এটা তাঁর সামনে সবচেয়ে ভালো ও বড় সুযোগ।

বিরোধীরা কতটা এককাট্টা এবং এনডিএ শরিকরা কতটা বিজেপি-বিরোধী, এই সুযোগে সেটা প্রমাণ করে দিতে পারবে বিরোধীরা। একই সঙ্গে আচ্ছে দিন নিয়ে ভোটের মাত্র কয়েকস মাস আগে সরকারকে কোণঠাসা করতে পারবে। জিএসটি নিয়ে দেশজুড়ে কী সমস্যা হচ্ছে, কত লোক চাকরি পেয়েছে মোদীর জমানায়, যে বিপুল পরিমাণ কালো টাকা সরকার বিদেশ থেকে ফেরাবে বলেছিল এবং ১৫ লক্ষ টাকা করে প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে ঢুকবে বলে নরেন্দ্র মোদী

যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তার কী হল, নোটবন্দি করে দেশের কী লাভ হল সে সব ব্যপারে প্রশ্ন তুলতে পারে বিরোধীরা। কাঠুয়া-উন্নাও নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে, সরকার কৃষক-বিরোধী বলেও কোণঠাসা করতে পারে বিরোধীরা।বিরোধী ঐক্য তুলে ধরার এটাই সবচেয়ে বড় সুযোগ। তাই ২১ জুলাই নিজেদের বড় শো থাকলেও তৃণমূল কংগ্রেসের ৩৪ জন সাংসদকেই লোকসভায় উপস্থিত থেকে সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার হুইপ জারি করেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। তবে এখনও পর্যন্ত বিজু জনতা দল (বিজেডি) ও তেলেঙ্গনা রাষ্ট্র সমিতির (টিআরএস) অবস্থান স্পষ্ট নয়। তৃতীয় ফ্রন্ট গড়ার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি উদ্যোগী চন্দ্রশেখর রাওয়ের টিআরএস। তবে তিনি নিজেই এখন প্রধানমন্ত্রী হতে উৎসাহী। তাই যে অন্ধ্রপ্রদেশ ভেঙে তিনি আলাদা তেলাঙ্গনা রাজ্য গড়েছেন, সেই অন্ধ্রপ্রদেশের শাসকদল তেলুগু দেশম পার্টির ডাকা অনাস্থা প্রস্তাব, যাকে আবার কংগ্রেস সমর্থন করছে, তাতে তিনি কতটা সাড়া দেবেন বলা মুশকিল। নবীন পট্টনায়কের বিজেডি কী অবস্থান নেবেন, সেটাও এখনও স্পষ্ট নয়।

body1_071918060509.jpg

সরকার কেন প্রস্তাব গ্রহণ করল

কংগ্রেসের পক্ষে কারা আছে, সরকারি ভাবে তা বুঝে নেওয়ার সবচেয়ে বড় সুযোগ বিজেপির সামনে। একই সঙ্গে তারাল বুঝে নিতে পারবে, তেলুগু দেশম পার্টি জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরে অন্য শরিকদের অবস্থান কী। এ ক্ষেত্রে তারা প্রাথমিক ভাবে সফলও হয়েছে। শিব সেনা জানিয়ে দিয়েছে, তারা সরকারের পক্ষেই ভোট দেবে। এই শরিককে নিয়েই সবচেয়ে চিন্তায় পড়তে পারত বিজেপি।

ধরেই নেওয়া যায় যে সরকার আগে থেকেই স্থির করে রেখেছিল যে অনাস্থা প্রস্তাব আসা মাত্রই তারা তা গ্রহণ করবে, দ্রুত আলোচনায় যাবে। তাই সরকার প্রস্তুত। বিরোধীরা কোন পথে আক্রমণ করতে পারে, তা বুঝে নিয়ে হাতের কাছে বেশিরভাগ সম্ভাব্য প্রশ্নের জবাব তৈরি রেখেছে। বিরোধীরা যে সব ইস্যুতে সরব, সরকার সেই সব ইস্যুর জবাব প্রস্তুত করে, সুপরিকল্পিত ভাবেই এই প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। তা ছাড়া এই প্রস্তাব গ্রহণ করার মানে আগামী ভোটে বিরোধীরা কী কী বিষয়ে সরব হতে চলেছে, সে ব্যাপারে সম্যক ধারনাও করে ফেলতে পারবে সরকার।

সংখ্যার বিচারে এখন নিশ্চিন্তে রয়েছে সরকার। এই মুহূর্তে লোকসভার যা অবস্থা, তাতে ২৬৮টি ভোট পেলেই জয়ী হবে বিজেপি। ৫৪৫ আসনের লোকসভায় বিজেপির আসন সংখ্যা ২৭৩। তারা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। এর বাইরে শরিক দলগুলিও রয়েছে। সব মিলিয়ে তাদের আসন সংখ্যা ৩০০-র বেশি। নিশ্চিন্ত অবস্থানে থেকে অনাস্থা প্রস্তাব গ্রহণ করে সরকার দেখিয়ে দিল তারা সমালোচনা গ্রহণে প্রস্তুত।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মতো বাগ্মী বিরোধী শিবিরে কেউ নেই। রাহুল গান্ধী যদি কিছু না বলেন, তা হলে নরেন্দ্র মোদী তাঁকে আক্রমণ করবেনই, আর যদি মোদীর বিরুদ্ধে আক্রমণের মুখ হন রাহুল নিজে, সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে সকলের শেষে বলার সুযোগ পাবেন নরেন্দ্র মোদী নিজে। সরকার একবার ভোটাভুটিতে জয়ী হয়ে গেলে, বিরোধীদের আক্রমণ আরও ভোঁতা হয়ে যাবে। কারণ গণতন্ত্র নেই, প্রধানমন্ত্রী কারও কথা শোনেন না বলে যে অভিযোগ বিরোধীরা তুলে থাকেন অহরহ, এর পরে সেই অভিযোগ তুলতে পারবেন না।

বিরোধীদের ক্ষতি

অনাস্থা প্রস্তাব যে দলই এনে তাকুক আর যে প্রসঙ্গেই এনে থাকুক, বড় দলগুলি প্রত্যেকেই সরকারের কাজের মূল্যায়ন করার সুযোগ পাবে। তাই শেষ পর্যন্ত পুরোটাই গিয়ে দাঁড়াবে এনডিএ বনাম ইউপিএ, সংক্ষেপে বিজেপি বনাম কংগ্রেসে, আরও সংক্ষেপে নরেন্দ্র মোদী বনাম রাহুল গান্ধীতে। তাই বিরোধী জোটের নেতা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইবেন রাহুল। কয়েকটি আঞ্চলিক দলের সমর্থন তিনি পেয়ে গেলেই তৃতীয় ফ্রন্ট গঠন ভেস্তে যাবে। এতে রাজনৈচিক ক্ষতি হবে তৃণমূল ও টিআরএস প্রধানদের।

রাহুল যদি ধারালো যুক্তিতে সরকারকে তুলোধনা করতে না পারেন, তা হলে তাঁর নিজের রাজনৈতিক ক্ষতি এবং আবার তাঁকে বিদ্রুপ করতে শুরু করে দেবে সরকারপক্ষ। তাঁর রাজনৈতিক অরিপক্কতা নিয়ে আবার কটাক্ষ শুরু হয়ে যাবে, যা ভোটের মুখে কংগ্রেসের কাছে মোটেই সুখের হবে না। উত্তরপ্রদেশে অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি এবং মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টির সঙ্গে জোট গড়ে আসন্ন বিধানসভা ভোটে যাওয়ার কথা ভাবছে কংগ্রেস। উপনির্বাচনগুলিতে তারা প্রার্থী না দিয়ে জোটের বার্তাও দিয়েছে। কিন্তু কয়েক দিন আগে বহুজন সমাজপার্টির এক নেতা যে ভাবে সোনিয়া গান্ধীর বিদেশিনী পরিচয় খুঁচিয়ে তুলে রানির ছেলের রাজা হওয়া হবে না বলে যে মন্তব্য করেছেন, সেটি বিরোধী জেটের সাম্প্রতিকতম ধাক্কা। এই প্রশ্নে খোঁচা শুনতে হতে পারে কংগ্রেসকে, আবার এই মন্তব্যের দায়ও বহন করতে হবে না বিজেপিকে।

অনাস্থা ভোট ২০০৩ ও ২০১৮

২০০৩ সাল এবং ২০১৮ সালের মধ্যে অন্তত দুটি মিল রয়েছে। প্রথমত প্রধানমন্ত্রী বিজেপি দলের এবং তিনি বিরোধীদলের যে কেনও কারও চেয়ে ভালো বক্তা। দ্বিতীয়ত সরকারের পতনের কোনও আশঙ্কা নেই। তবে দুই বাগ্মী প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের ধরন একেবারে আলাদা। অটলবিহারী বাজপেয়ী কথা বলতেন ধীরে, ব্যক্তিগত খোঁচা তিনি দিতেন না। তবে নরেন্দ্র মোদী ব্যক্তি আক্রমণ করেই থাকেন, কখনও সরাসরি, কখনও ঘুরপথে।

এ বার বিরোধীদের বক্তব্যের জবাব দেওয়ার পাশাপাশি সংসদের সরকারের সাফল্য তুলে ধরার সুযোগ হাতছাড়া করবেন না নরেন্দ্র মোদী। তিনি নানা ভাবে সরকারের তথা নিজেরল প্রচার করে থাকেন। সংসদে বিরোধীদের আনা অনাস্থাকে নিজের ভোটপ্রচারের কাজে ব্যবহার করতে পারেন নরেন্দ্র মোদী। বাজপেয়ীর পথ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে বর্তমান কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীকে শুধু আক্রমণ করা নয়, ঘুরিয়ে বিদ্রুপও করতে পারেন। সংসদে এ কাজ তিনি আগে করেওছেন।

৩০০-র উপরে ভোট মোটামুটি ভাবে নিশ্চিত নরেন্দ্র মোদীর। ২০০৩ সালে বাজপেয়ী সরকার পেয়েছিল ৩১২টি ভোট। অনাস্থার পক্ষে ভোট পড়েছিল ১৮৬টি। সংসদ আস্থা দেখালেও পরের দশ বছর জনগণ ক্ষমতায় ফেরায়নি বিজেপিকে। দেশ জুড়ে তখন ফিলগুড ফ্যাক্টর। এবার লোকসভার ভিতরে বিজেপির জয় একপ্রকার নিশ্চিতই। এখানেই প্রশ্ন, আর কয়েক মাস পরে যখন নতুন করে ভোট হবে তখন সরকার তকে গড়বে? সংসদের পাশাপাশি এবার জনগণেশকে জবাব দেওয়ার জন্যও তৈরি হতে হবে নরেন্দ্র মোদীকে।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

SUMITRO BANDYOPADHAY
Comment