হেলসিঙ্কিতে মার্কিন ও রুশ রাষ্ট্রপ্রধানের বৈঠক কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

কোন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে তাঁরা বৈঠক করলেন, ফল কী

 |   Long-form |   21-07-2018
  • Total Shares

ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কিতে গত সোমবার প্রথমবারের মতো মুখোমুখি বৈঠকে বসেছিলেন বিশ্বের প্রভাবশালী দুই নেতা, একদিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্যপ্রান্তে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বৈঠক নিয়ে কৌতূহল ছিল গোটা বিশ্বের। শক্তিশালী দুই রাষ্ট্রপ্রধান সিরিয়া, ইরান, উত্তর কোরিয়া এবং বাণিজ্যযুদ্ধ-সহ বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন, এমনটাই আশা ছিল সবার।

দীর্ঘ দু’যুগেরও আগে, ১৯৯৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের ফিনল্যান্ড বৈঠকটি ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের শেষ বৈঠক। ২০১৪ সালে ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে নেয় মস্কো। এরপর ২০১৬ সালে আমেরিকা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে জয়লাভে ক্রেমলিনের সহায়তার অভিযোগ ওঠে। এ সব বিষয় নিয়ে আমেরিকা-রাশিয়ার সম্পর্কে চিড় ধরে। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই অভিযোগ, রাশিয়া ২০১৬-র আমেরিকার নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছে, অন্যদিকে ট্রাম্পের জয়লাভে ক্রেমলিন ভূমিকা রেখেছে। রাশিয়া অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে।

আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পাম্পের মত ছিল, ট্রাম্প পুতিনকে পরিষ্কার ভাবে জানাবেন, মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ ভাবে অগ্রহণযোগ্য। ইউক্রেনে রাশিয়াপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তার জন্য পশ্চিমের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে আমেরিকাও মস্কোকে দোষারোপ করেছে। সংঘাত বাড়ার আশঙ্কায় আমেরিকা দীর্ঘদিন ইউক্রেনকে মারণাস্ত্র সরবরাহ না করলেও চলতি বছরের মার্চে কিয়েভের কাছে ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করলে রাশিয়া ক্ষুব্ধ হয়। এ ছাড়াও সিরিয়ায় রাশিয়ার মিত্র বাশার আল-আসাদ রাসায়নিক হামলা চালিয়েছেন— এই অভিযোগে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট ২০১৭-র এপ্রিল এবং চলতি বছরের এপ্রিলে বিমান হামলা চালালে দু’দেশের সম্পর্কের অবনতি হয়।

body3_072118025013.jpgরাশিয়ার ভূতপূর্ব রাষ্ট্রপতি বরিস ইয়েলৎসিন ও তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন

সিরিয়ার মতো রাশিয়ার আরেক মিত্র ইরানের প্রতি মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গিও রাশিয়াকে ক্ষুব্ধ করে। রাশিয়া ও আমেরিকাসহ পশ্চিমের কয়েকটি দেশ ২০১৫-তে ইরানের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি করলে ট্রাম্প চলতি বছর ওই চুক্তি থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহার করে নেন। এর ফলে রাশিয়া চুক্তিটিকে বাঁচানোর জন্য ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এককাট্টা হতে ইউরোপীয় শক্তিগুলোকে আহ্বান জানায়।

একই রকম ঘটনা ঘটে বাণিজ্যযুদ্ধের ক্ষেত্রেও। চিন-সহ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া, কানাডা ও মেক্সিকোর ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের উপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প, চলতি মাসে রাশিয়াও মার্কিন পণ্যের উপরে পাল্টা শুল্ক আরোপ করে যুদ্ধে সামিল হয়। এ ছাড়াও  ব্রিটেনে রাশিয়ার একজন প্রাক্তন গুপ্তচরের উপর রাসায়নিক হামলা, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ও ন্যাটোর শক্তি বৃদ্ধি নিয়ে দুটি শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগেই রয়েছে। এই প্রেক্ষিতে হেলসিঙ্কি বৈঠকে কী আলোচনা হল এবং তার ফল কী দাড়াল তা নিয়ে কৌতূহল থাকাটাই স্বাভাবিক।

পূর্বনির্ধারিত সময়ের বেশ কিছুক্ষণ পর শুরু হওয়া ওই বৈঠকে রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার আশা প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, তাদের সম্পর্ক খুব যে ভালো তা তো নয়। তবে গত দু’বছর ধরে সম্পর্কের দূরত্ব কমছে। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হলে ভালো ছাড়া খারাপ কিছু হবে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এও বলেন যে, একসঙ্গে কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে তাদের, আসলে তারা অনেক বছর কাছাকাছি হতে পারেননি। কিন্তু তাদের একসঙ্গে চলাটা সারা বিশ্ব দেখতে চায়। তবে বিশ্বের ৯০ শতাংশ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে তাদের কাছে, এটা ভালো ব্যাপার নয়।

body1_072118025037.jpgহেলসিঙ্কিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন

বৈঠকে বসার আগে ট্রাম্প কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে আমেরিকার খারাপ সম্পর্কের জন্য ওয়াশিংটনের উপর দায় চাপিয়ে ছিলেন। টুইটারে তিনি বলেছিলেন, আমেরিকার বোকামি এবং নির্বুদ্ধিতার কারণে রাশিয়া-আমেরিকার সম্পর্ক খারাপ অবস্থায় রয়েছে। বৈঠকে তারা বাণিজ্য, সেনাবাহিনী এমনকি চিনের আধিপত্য বিস্তার নিয়েও যে আলোচনা করবেন, একথাও ট্রাম্প আগেই জানিয়েছিলেন। তারা যে নিজেদের পরমাণু অস্ত্রের বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবেন সে আশাও প্রকাশ করেন তিনি। অন্য দিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কিতে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পেরে তিনি আনন্দিত। যদিও তাঁদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ আছে... তাঁরা ফোনে কথা বলেছেন এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে তাঁদের বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। তবে অবশ্যই নিজেদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত কথা বলার এবং বিশ্বের সমস্যায় থাকা অনেকগুলো এলাকা নিয়ে আলোচনার এটাই সঠিক সময়।

বৈঠকের সূচি অনুযায়ী, দুই নেতা প্রথমে অন্তত এক ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। সেই সময়ে দু’জন দোভাষী ছাড়া অন্য কেউ তাদের সঙ্গে ছিলেন না। তারপর দুই নেতা একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজন সারেন। অন্য কূটনীতিকেরাও তাতে যোগ দেন। ইতিমধ্যে তাদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। হোয়াইট হাউস বলে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি প্রত্যক্ষ বৈঠক চেয়েছিলেন; যেখানে অন্য কারও হস্তক্ষেপ অথবা কোনও তথ্য ফাঁস হবে না। এমনকি ওই বৈঠকের কোনও কথাবার্তারও রেকর্ড থাকবে না। ট্রাম্প-পুতিনের বৈঠক নিয়ে আলোচনা শুরুর কয়েক মাস আগে হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারাও রুশ প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে দুই প্রেসিডেন্টের রুদ্ধদ্বার বৈঠকের কথা তুলেছিলেন। তার মানে এই রুদ্ধদ্বার বৈঠক নানা ভাবেই জরুরি হয়ে উঠেছিল।

প্রথমত, পুতিনকে ব্যক্তিগত ভাবে মূল্যায়নের জন্য ট্রাম্প একক ভাবে তার মুখোমুখি হতে চেয়েছেন। তা ছাড়া দুই নেতার মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যেও তিনি এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসার আগ্রহ দেখিয়েছেন। অতীতে বহু বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর আলোচিত বিষয়বস্তু ফাঁস হয়ে যাওয়ায় ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এ বার তিনি তার সহযোগীদের বলেছেন, পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁস হয়ে যাক সেটা তিনি চান না। তা ছাড়া রাশিয়াকে কঠোর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হোক ট্রাম্প এমন সহযোগীদেরও চান না। এমনকি পুতিনের সঙ্গে আলোচনায় হস্তক্ষেপ অথবা বাধার সৃষ্টি হোক সেটাও তার পক্ষে বরদাস্ত করা সম্ভব নয়। যে কারণে তিনি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেছিলেন।

২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগে ট্রাম্প-পুতিনের এই বৈঠককে বিতর্কিত হিসেবে দেখছেন অনেক মার্কিন কর্মকর্তাই। নির্বাচনে ট্রাম্পকে জেতাতে রাশিয়া কাজ করেছে বলে অভিযোগ আছে। তবে এই অভিযোগের ব্যাপারে আমেরিকা এখনো তদন্ত করছে। ওই বছর নভেম্বরে নির্বাচনের আগে দেশটির বর্তমান বিরোধীদল ডেমোক্র্যাটের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার ইমেইল হ্যাকিংয়ের সঙ্গে এক ডজন রুশ নাগরিক জড়িত বলে মাত্র কয়েকদিন আগেই মার্কিন তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন। রুশ নাগিরকদের হ্যাকিংয়ে জড়িত থাকার তথ্য প্রকাশের পরও কেন পুতিনের সাথে ট্রাম্প বৈঠকে বসলেন সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বৈঠক শুরুর আড়াই ঘণ্টা পর সাংবাদিক সম্মেলন সেরেই ট্রাম্প হেলসিংকি বিমানবন্দরে চলে যান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই শীর্ষ বৈঠক নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজের দেশে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে গিয়েছেন, অন্য দিকে  রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের জন্য একটি রাজনৈতিক সাফল্য। 

বৈঠকে কোন কোন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে তা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি। তবে দু’দেশের বাণিজ্য, সামরিক, চিনের আধিপত্য বিস্তার ও নিজেদের পরমাণু অস্ত্রের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হেলসিঙ্কিতে ট্রাম্প ও পুতিনের বৈঠক ঘোষিত হওয়ার পর  দুই রাষ্ট্র নেতার বিরুদ্ধে বহুবার বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে। ‘হেলসিঙ্কি অ্যাগেইনস্ট ট্রাম্প অ্যান্ড পুতিন’ নামের একটি সংগঠন এই বিক্ষোভের আয়োজন করে। বিক্ষোভকারীরা এই দুই নেতার কার্টুন, প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন নিয়ে বিক্ষোভ দেখায়। দুই নেতাকে মানবাধিকারের শত্রু, যুদ্ধাপরাধী ও শিশু হত্যাকারী বলে আখ্যা দেয় বিক্ষোভকারীরা। তাঁরা ট্রাম্পকে আমেরিকার শত্রু বলেও উল্লেখ করে।

এরপরও হেলসিঙ্কিতেই বৈঠক হয় এবং এটাই প্রথম বৈঠক নয়, এর আগেও আমেরিকা ও রাশিয়ার নেতারা হেলসিঙ্কিতে বৈঠক করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ফিনল্যান্ড রাজনৈতিক ও সামরিক ভাবে নিরপেক্ষ দেশ হিসেবে পরিচিত। যে কারণে দুই পরাশক্তি রাষ্ট্রের বৈঠকের জন্য ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কিকেই বাছাই করা হয়। এ ছাড়াও মার্কিন-রুশ নেতারা যুগে যুগে বহু বৈঠকেই বসেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পর থেকে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে হওয়া অনেক বৈঠকই বিশ্বের ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পর ১৯৪৩ সালের নভেম্বরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট ইরানের রাজধানী তেহরানে প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা জোসেফ স্টালিন ও তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে ১৯৪৫ সালের ৪ থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি ক্রিমিয়ার ইয়াল্টায় তাঁরা তিনজন আবার মিলিত হন। এতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাপানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনায় রাশিয়ার সমর্থন চান রুজভেল্ট। ওই সম্মেলনেই স্বাধীন ইউরোপ-এর ঘোষণা করা হয়েছিল।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ১৯৫৫ সালের ১৯ জুলাই সাক্ষাৎ করেন আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার, সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী নিকোলাই বুলগানিন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি এডেন ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট এডগার ফোরে। পারমাণবিক উত্তেজনার মধ্যেই গোটা দুনিয়ার নিরাপত্তায় পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনার জন্য তাঁরা সাক্ষাৎ করেন। ওই বৈঠকের সূত্র ধরে বুলগানিনের উত্তরসূরি নিকিতা ক্রুশ্চেভ ১৯৫৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর আমেরিকার মাটিতে পা রাখেন। পরে ১৯৬১ সালের জুনে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির সঙ্গে ভিয়েনায় সাক্ষাৎ করেন তিনি। ১৯৬১ সালের জুনে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির সঙ্গে ভিয়েনায় বৈঠক করেন সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকিতা ক্রুশ্চেভ। ১৯৬৭ সালের জুনে আমেরিকা সফর করেন সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সি কোসেগিন।

body4_072118025104.jpg১৯৪৩ সালে ইরানের তেহরানে বৈঠকে স্তালিন, রুজভেল্ট ও চার্চিল

সত্তরের দশকে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও রুশ নেতা লিওনিদ ব্রেজনেভ তিনবার সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিরোধ চুক্তি, পারমাণবিক যুদ্ধ প্রতিহতকরণ চুক্তি-সহ বেশ কয়েকটি চুক্তি সম্পাদন করেন। পরের দশকে রোনাল্ড রেগ্যান ও মিখাইল গর্বাচেভ পরস্পর বিরোধী দুই শক্তিকে আরও কাছে নিয়ে আসেন। এ ক্ষেত্রে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের সঙ্গেও সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ অব্যাহত রাখেন গোর্বাচেভ। ইরাকে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ, রাসায়নিক অস্ত্রসহ নানা ব্যাপারেই তাঁরা কাজ করেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পরও রুশ ফেডারেশনের প্রথম প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সম্পর্কও ভালো ছিল। পুতিনের যুগেও জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসনের সঙ্গে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের তিনটি সম্মেলন হয়। কিন্তু বারাক ওবামার প্রশাসনের সময় থেকে দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করে। তবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্মেলনে ওবামা-পুতিন একাধিক সাক্ষাৎ হয়েছে। 

পশ্চিমে নয়া নয়া মহাশক্তির টানাহেঁচড়া একেবারেই নতুন ঘটনা নয়। হেলেনিক গ্রিসের দোর্দণ্ডপ্রতাপ ফিকে করেই রোম সাম্রাজ্যের যাত্রা শুরু করেন সিজার। সেই রোমান সাম্রাজ্যের শুরুর প্রভাব সুদূর মিসরের তৎকালীন রাজনীতিতেও পড়েছিল। এমনই এক ক্রান্তিলগ্নের ওপর দাঁড়িয়ে আছে পশ্চিমী রাজনীতি। হেলসিঙ্কিতে আমেরিকার জন্য সিজার-বেশে ভ্লাদিমির পুতিনের আগমনের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এমনও হতে পারে, রাশিয়া, আমেরিকা আর ইউরোপের ত্রিপক্ষীয় সংঘাত।

তবে আপাতত তা জল্পনা মাত্র। তবে তাদের আলোচনায় সমরাস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ে কথা হয়ে থাকতেই পারে। পুতিন কিছুদিন আগেই বিশাল পারমাণবিক অস্ত্রের মহড়া দেখিয়েছেন বিশ্বকে। সবাইকে মেনে নিতে বলেছেন নতুন বাস্তবতা। ট্রাম্পও পিছিয়ে নেই। তিনিও বাজির দান বাড়িয়েছেন। বলেছেন, যদি ওয়ারহেড বাড়াতেই হয়, আমেরিকা থাকবে সবার ওপরে। তবে নতুন করে আবার পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হলে রাশিয়া ও আমেরিকার টাঁকশাল খালি হবে। নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্রদৌড় শুরু হতে পারে সারা দুনিয়ায়।

ট্রাম্প সব সময় দাবি করে থাকেন, দুনিয়ায় তাঁর চেয়ে চতুর কেউ নেই। তবে তিনি তো বাবার কাছ থেকে এক কোটি ডলার ধার নিয়ে নিজেকে বিশাল ধনী বানিয়েছেন। সেটা আরও ভালো করে যাচাইয়ের কষ্টিপাথর হেলসিঙ্কি। ওখানে ভুল হয়ে থাকলে আমেরিকার নড়বড়ে অর্থনীতি আবার তাসের ঘরের মতো ধসে পড়তে পারে। তাতে অবশ্য পুতিনের বিশেষ মাথাব্যথা নেই। তাঁর দেশে পড়ন্ত অর্থনীতি নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের গুলাগে মিলিয়ে যাওয়ার এক অদ্ভুত প্রবণতা আছে। পারমাণবিক অস্ত্রের এই খরুচে ইঁদুরদৌড় ঠেকাতেই ওবামা আর মেদভেদেভ ২০১০ সালের ৮ এপ্রিল নিউ স্টার্ট নামে একটি চুক্তি করেছিলেন। সেই চুক্তিমতে,  ১,৫৫০-এর বেশি নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড কেউ রাখতে পারবে না।

body2_072118025137.jpgনিকিতা ক্রুশ্চেভ ও জন এফ কেনেডি

ট্রাম্প-পুতিন চাইলে ২০২১ সালে শেষ হতে যাওয়া  অস্ত্র চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে পারতেন। তাতে কারোরই আপত্তি থাকার কথা নয়। শ্যাম ও কুল দুই রাখতে পারতেন ট্রাম্প ও পুতিন। যতই ধমক দিন, রাজত্ব করতে হলে এই পৃথিবীতেই করতে হবে। দুনিয়ার ধ্বংসস্তূপের ওপর সম্রাট আদতে খুবই একা। ট্রাম্প চাইলে এই সুযোগে রাশিয়াকে চাপ দিয়ে বাশার আল-আসাদের বন্ধুতা থেকে সরিয়ে আনতে পারতেন। কারণ গুপ্তহত্যা, আমেরিকার ২০১৬ নির্বাচনে নাক গলানো—এসব কারণে রাশিয়ার ওপর মহা খাপ্পা সবাই। এর ফলে রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরও শক্ত হয়ে চেপে বসেছে। নিজেকে কড়া লোক ভাবতে ও ভাবাতে ভালোবাসেন ট্রাম্প। হেলসিঙ্কি বৈঠক তাকে সুযোগ দিয়েছিল তাও এককালের দুর্ধর্ষ কেজিবি এজেন্ট পুতিনের সামনে। ডোনাল্ড ট্রাম্প পুতিনকে শুনিয়ে দিতেই পারতেন, বাশার আল-আসাদের অপসারণ ও প্রতিস্থাপনের আগে সিরিয়া থেকে নড়ছে না আমেরিকা ও ৬৮ রাষ্ট্রের জোট। গুপ্তহত্যার চেষ্টা না থামালে রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা কমবে না, সেটাও পুতিনের জানা থাকা দরকার। ওগুলো বন্ধ না করলে তার বদ-প্রভাব রাশিয়ার ওপর পড়বে।

কিন্তু কয়েকটি খবর আমাদের অন্য ভাবে ভাবাচ্ছে। কিছুদিন আগেই ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি লন্ডভন্ড করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ফলে, বাজার থেকে ইরানের তেল হাওয়া হয়ে যেতে পারে। এভাবে চলতে থাকলে তেলের বাজারে সবচেয়ে বড় নাম হয়ে উঠতে পারে ট্রাম্পের আমেরিকার। তখন এই পাল্টাপাল্টি ট্যারিফের যে লড়াই চলছে, সেটাতে আমেরিকারই জয়। পেট্রো-ডলার তখন ঝুঁকে পড়বে আমেরিকার দিকেই। ঠিক এখানেই পুতিনের রাশিয়ারও বাজিমাত। বিশ্ববাজারে তেলের মজুতে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ঠিক পেছনেই রাশিয়া। রাশিয়ার মজুতে আছে ৮০ হাজার মিলিয়ন ব্যারেল তরল সোনা (১ মিলিয়ন = ১০ লক্ষ)। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে দৈনিক ১০.৮৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন ছিল রাশিয়ায়। ন্যাটোর উপর গোঁসা করে ট্রাম্প যদি এবার রাশিয়ার সঙ্গেই গাঁটছড়া বাঁধতেন, তবে পেট্রো-ডলারের লাগাম থাকত ট্রাম্প-পুতিন জোটের হাতেই।

ইউরোপীয় ইউনিয়নেও চলছে বিচ্ছেদের সুর। বিদায় জানিয়েছে ইংল্যান্ড। চৌকাঠে পা রেখে দাঁড়িয়ে আছে অনেকেই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিশ্রুতি ছিল সামাজিক কৃচ্ছ্রসাধনের। সে দায় ইউরোপ মিটিয়েছিল ন্যাটো চুক্তির মাধ্যমে। আমেরিকা তার বাজেটের বিশাল অংশ সামরিক খাতে ব্যয় করে। তাই আমেরিকার কাঁধে ভর দিয়েই খানিকটা সামরিক খাতে বরাদ্দ কমিয়ে কৃচ্ছ্রসাধনে মন দিয়েছিল তারা। এখন ট্রাম্পের দাবি মেটাতে হবে। না হলে টুইটারে বারবার হুমকি দিয়েই যাচ্ছেন ট্রাম্প। চুক্তি না মানলে ন্যাটো রেখে লাভ কী? এখন তো দাবিও বাড়িয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। ট্রাম্প বলছেন, ইউরোপের জাতীয় আয়ের ২ শতাংশ সামরিক খাতে দিলে আর কাজ হবে না, ওটা বাড়িয়ে করতে হবে ৪ শতাংশ।

ন্যাটো জোটের এই বিভেদে হয়ত ক্রেমলিনে বসে মুচকি হাসছেন পুতিন। ওদিকে সি জিনপিংও বসে আছেন বলে মনে হয় না। কিছুদিন আগেই উত্তর কোরিয়ার একনায়ক কিম জং-উনের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন তিনি। হয়ত তিনিও ভাবছেন, লাঠিটা কিম জংয়ের হাতে তুলে দিয়ে চিনের কৃচ্ছ্রসাধন অর্থনীতি আরও জোরদার করবেন। সব মিলিয়ে ২০১৩ সালের পুতিন আর এই সময়ের পুতিনের বিস্তর ফারাক।

ওবামা বলেছিলেন ‘পুতিন একলা হয়ে গেছেন।’ তবে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি থেকে সেটা আর ঠিক নয়। একটু একটু করে ছবিটা বদলেছে। বিশ্বকাপে ফুটবলারা পায়ের জাদু দেখিয়েছেন আর বিশ্বনেতাদের পাশে বসিয়ে, স্মিতহাসিতে বিশ্বকাপ আয়োজন করেছে পুতিনের রাশিয়া। এককালের কেজিবি ‘গুপ্তচর’ বা ‘গুন্ডা’ শাসকের জন্য ব্যাপারটা মন্দ কেন বেশ ভাল। হেলসিঙ্কি বৈঠকেও একটা জয় নিয়েই শুরু করেছিলেন পুতিন। রবার্ট মুলারের বিশেষ তদন্তে এখন পর্যন্ত ১১ জন রাশিয়ানের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলে হয়েছে। অভিযোগ আমেরিকার ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনের গণেশ উলটে দেওয়া।

ট্রাম্পের হেলসিঙ্কি যাত্রা নিয়ে তোলপাড় করেছিল ডেমোক্র্যাটরা। তাতে ট্রাম্পের চিড়ে ভেজেনি। আপাতত মনে হচ্ছে, পুতিনের স্মিতহাসি ছাড়া ভিজবেও না। এখানেই জিতে গেছেন পুতিন, পাঁচ বছরে একাকী থেকে তিনি বিশ্বরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। বিশ্ববাণিজ্য, পেট্রো-ডলার, রাজনৈতিক আদর্শের এক ত্রিমুখী সংঘাতের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব। লড়াইটা যেহেতু অর্থনীতির, আশা করা যাচ্ছে, কোনো নেতাই হয়তো সর্বগ্রাসী যুদ্ধে নামবেন না। কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো খোলনলচে বদলাবে আন্তর্জাতিক ভরকেন্দ্রের। বিশ্ববাণিজ্যের দাঁড়িপাল্লা যেদিকেই হেলুক, এর সঙ্গে বদলাবে আদর্শের কম্পাস। নতুন খদ্দের ধরতে ছুটবে টালমাটাল অর্থনীতির দেশগুলো, বদলাবে রাজনীতির বোলচাল। তাই দক্ষিণ এশিয়ার উঠতি অর্থনীতিরাও চোখ রেখেছিল হেলসিঙ্কিতে, ব্রাসেলস আর চিনে। না হলে হোঁচট খাওয়ার বিপদ আছে।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

TAPAN MALLICK CHOWDHURY TAPAN MALLICK CHOWDHURY

The writer is a journalist.

Comment