গরমে হিটস্ট্রোক থেকে রেহাই পেতে জেনে নিন কী খাবেন
পুষ্টিকর খাবারদাবার খেলে গরমে সংক্রমণ ও জীবাণুর হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায়
- Total Shares
গ্রীষ্মকালের দহনে সবারই প্রায় হাঁসফাঁস অবস্থা। এই সময় বহু মানুষ হিটস্ট্রোক, শরীরে জলের অভাব (dehydration) ও নানা সংক্রমণের জেরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাই রোগগুলিতে আক্রান্ত হওয়ার আগেই সেগুলিকে চিহ্নিত করতে হবে। উঠে দাঁড়ালেই যদি কারও মাথার ভেতরে অস্বস্তি হয় কিংবা মাথাটা হালকা মনে হয় তাহলে ভুগতে হবে যে সেই ব্যক্তির শরীরে জলের অভাব হয়েছে।
ঠোঁট ও জিভ শুকিয়ে যাওয়া, মাথা ব্যথা, অসম্ভব ক্লান্তি, গা গোলানো ও পেশিতে টান ধরার মতো আরও কয়েক ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কারও যদি হিটস্ট্রোক হয় তাহলে পূর্বাভাস হিসেবে দু'হাতের ও পায়ের কিংবা চেটো এবং পেটের পেশিতে টান ধরা, জ্ঞান হারানো কিংবা মাথা ঘোরা, ক্লান্তি ও ভীষণ ঘাম হতে পারে। তবে ঠিকঠাক খাবার খেলে এই সব সমস্যা থেকে দূরে থাকা সম্ভব।

গরমে শীতল হওয়ার জন্য ঠান্ডা পানীয় না খেয়ে এমন খাবার খাওয়া উচিৎ যা আমাদের শরীরকে ভেতর থেকে ঠান্ডা রাখবে সঙ্গে পুষ্টি ও শক্তি জোগাবে। পুষ্টিকর খাবারদাবার খেলে এই সময় বিভিন্ন সংক্রমণ ও জীবাণুর হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
গরমকালে সুস্থ ও রোগ মুক্ত থাকতে এই খাবারগুলো খান:

১. অঙ্কুরিত সবুজ ছোলা
অঙ্কুরিত ছোলা শরীর ঠান্ডা রাখে। অঙ্কুরিত সবুজ ছোলার সঙ্গে কিছুটা আলু সেদ্ধ ও কয়েক টুকরো শশা দিয়ে একটা চাট বানিয়ে খেতে পারেন। গ্রীষ্মকালের জলখাবার হিসেবে এটা উপযুক্ত। সারা রাত জলে মধ্যে ছোলা ভিজিয়ে রেখে সেই জলটা পরের দিন সকালে খেলে তাতেও শরীর ভীষণ ঠান্ডা হয়।
২. কোকুম ফল
গুজরাট ও কোঙ্কন উপকূল এলাকায় এই ফলটি শরীর ঠান্ডা রাখার জন্য খাওয়া হয়। ফলটি খেতে টক। তাই এই গরমে তেতুল না খেয়ে কোকুম খেতে পারেন। (পশ্চিমবঙ্গে এই ফলটির তেমন একটা দেখা যায় না, কতটা পাওয়া যায় তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।)

এতে খাবারে যেমন স্বাদও বাড়বে তেমন শরীরও ঠান্ডা হবে।

৩.ডাবের জল
গরমে ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে ইলেক্ট্রোলাইট বেরিয়ে যায়। ডাবের জলে প্রচুর পরিমাণে খনিজ থাকে বলে আমাদের শরীর যেমন পুষ্টি পায় তেমনই শরীরকে সম্পৃক্ত করে ও ইলেক্ট্রোলাইটের মাত্রা ঠিক রাখে।
৪. করলা
তেতো বলে অনেকেই করলা খেতে পছন্দ করেন না, কিন্তু করলা যেমন শরীরের অতিরিক্ত তাপ দূর করে তেমনই অন্যান্য কোনও খাবার থেকে যে তাপ সৃষ্টি হয় সেটাও করলা খেলে দূর হয়।

তাই সপ্তাহে দুই থেকে তিনদিন করলা খান অথবা প্রত্যেকদিন এক চামচ করে করলার রস খান।

৫.বটেল গর্ড (অনেকটা বোতলের মতো দেখতে বলে এই লাউকে ইংরেজিতে বটেল গর্ড বলা হয়)
এই লাউয়ে জলের পরিমাণ প্রায় ৯৬ শতাংশ থাকে বলে এই আনাজটি শরীর ঠান্ডা করে। লাউয়ে প্রচুর মাত্রায় পটাসিয়াম আছে যা শরীরের রক্ত চাপ কম রাখতে সাহায্য করে ও শরীরের ইলেক্ট্রোলাইটের মাত্রাকেও ঠিক রাখে। গরমে লাউ খেলে ক্লান্তি দূর হয়, শরীর সতেজ ও তরতাজা থাকে।

৬.তরমুজ
তরমুজ একটি মিষ্টি ফল। এই ফলটি খেলে শরীরের ওজন বাড়ে না। এতে প্রয়োজনীয় কয়েকটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও রয়েছে। তরমুজ থেকে ভিটামিন সি, বিটাক্যারোটিন ও ভিটামিন বি, ম্যাগনেসিয়াম ও পটাসিয়াম পাওয়া যায়। ভিটামিন বি শরীরে শক্তি উৎপাদনে সহায়তা করে।
অন্যান্য ফলের চেয়ে তরমুজে ক্যালোরির তুলনায় জলের পরিমাণ অনেক বেশি (এক কাপ তরমুজে ৪৮ ক্যালোরি পাওয়া যায়)।
৭. গুলকন্দ
গোলাপ ফুলের পাপড়ি দিয়ে গুলকন্দ তৈরি করা হয়, যা শরীরকে খুব ঠান্ডা করে। গরমের জন্য যে বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে গুলকন্দ খেলে সেগুলো থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, যেমন ক্লান্তি, ঝিমুনি ভাব, চুলকানি বা ব্যথা। গুলকন্দ হজম শক্তি বাড়ায় ও পেট ঠান্ডা রাখে এবং গ্যাস-অম্বল দূর করে।

গুলকন্দ রক্ত পরিশুদ্ধ করে ও শরীরের ক্ষতিকর পদার্থগুলো বের করে দেয়। গরমকালে শরীরের অতিরিক্ত ঘাম হয় এর ফলে যে দুর্গন্ধ হয় তাও গুলকন্দে দূর হয়।
এই পদটি বাড়িতে বানাতে পারেন: গুলকন্দ ও কলার শরবত - শরবতটি বানাতে একটা গোটা কলা চটকে নিন সঙ্গে এক টেবিলচামচ গুলকন্দ, এক চাচামচ চিনি ও দু'কাপ দুধ যোগ করে শরবত তৈরি করে নিন। এবার এতে কয়েক কুঁচি বরফ দিয়ে অল্প অল্প করে খান।
৮. বার্লি
গরমের মাসগুলোতে বার্লি খান। বার্লির ময়দা, বার্লি দানা কিংবা বার্লির জল, যে কোনও ভাবেই বার্লি খেতে পারেন। বার্লি শরীরের সমস্ত ক্ষতিকর পদার্থ প্রস্রাবের মধ্য দিয়ে শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে। বিশেষ করে অন্ত্র থেকে ক্ষতিকর পদার্থ সরাতে কার্যকরী। বার্লি আমাদের শরীর ঠান্ডা রাখে।

বার্লির জল বানাতে হলে জলের সঙ্গে বার্লি মিশিয়ে ২০ থেকে ২৫ মিনিট ফুটিয়ে নিন। তারপর জলটা ছেঁকে নিয়ে ঠান্ডা করে একটু লেবুর রস মিশিয়ে খান।
৯.আনারস
আনারসে যে প্রচুর পরিমাণে জল থাকে তাই নয়, এই ফলটিতে প্রচুর পুষ্টিকর উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও রয়েছে, যা শরীর সুস্থ রাখে ও আমাদের শরীরের ফ্রি রাডিক্যালের জন্য যে সব ক্ষতিগুলো হয় সেগুলোর সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতাও প্রদান করে। গরমকালে আমাদের শরীরের অনেক অংশ ফুলে যায়, এই ফলটিতে ব্রোমেলেইন নামে একটি উৎসেচক রয়েছে যা শরীরের ফোলা ভাব দূর করে।

আনারসে থাকা পটাসিয়াম ও উৎসেচকগুলো যেমন শরীরের অবাঞ্ছিত ফোলা কম করে ঠিক তেমনই শরীরের খারাপ উপাদানগুলো বের করে দিতে সাহায্য করে।
আমার লেখা বই 'ডোন্ট ডায়েট! ৫০ হ্যাবিটস অফ থিন পিপল' থেকে সহজে তৈরি হয়ে যাবে এমন একটি আনারসের শরবত বানাবার প্রণালী এখানে লিখলাম। আধ কাপ ছোট টুকরো করা আনারস, আধ কাপ ছোট টুকরো করা পাকা পেঁপে, একটা গোটা ঠান্ডা কলা, এক চতুর্থাংশ খোসা সমেত ছোট টুকরো করা শশা এবং এর সঙ্গে এক কাপ ডাবের বা নারকেলের ঠান্ডা জল মিশিয়ে একটা শরবত বানিয়ে একটু একটু করে খান।

১০. যেসব মসলা শরীরকে ঠান্ডা করে
এই সময় তাজা আদা, মারজোরাম (একধরণের ঔষধি) লেমন বাম (lemon balm একধরণের ঔষধি), পুদিনাপাতা ও সাদা গোলমরিচ খেতে পারেন, এগুলো আমাদের শরীর ঠান্ডা করে। গরমকালে যতটা সম্ভব দারচিনি ও শুকনো আদার থেকে দূরে থাকুন কারণ এই জাতীয় মসলাগুলো শরীরকে গরম করে।

