আধারের বিষ দাঁত ভাঙলেও তা বিষ ঢেলে যাবে কারণ আমরা ভারতীয়
বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় আধারের অন্ধকারের দিকগুলোর দিকেও আলোকপাত করেন
- Total Shares
জানেন কি বুধবার সুপ্রিমকোর্টের রায় ঘোষণা হওয়ার অনেক আগে থেকেই বেশির ভাগ জায়গায় আধার নম্বর প্রদান করা বাদ্ধত্যমূলক ছিল না? ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ফোন নাম্বারের ক্ষেত্রেই হোক তা বাধ্যতামূলক ছিল না। এমনকি বাচ্চাদের বেসরকারি স্কুল বা কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রেও বাধ্যতামূলক ছিল না, অন্তত সরকার কখনও এই ধরণের কোনও নির্দেশ দেননি। বিমানবন্দরে বা বীমা সংস্থাগুলোতেও বাধ্যতামূলক ছিল না।
এমন কি জনস্বার্থমূলক পরিষেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে- যেমন সরকারি ভর্তুকি পাওয়ার সময় যদিও আধার নম্বরে প্রয়োজন পড়ে তবে কোর্ট এই সংস্থাগুলিকে নির্দেশ দিয়েছিল যে, যেসব ব্যক্তির ভর্তুকির প্রয়োজন তাঁদের যেন তা দিয়ে দেওয়া হয়। তথাপি প্রায় সর্বত্রই আধার নম্বর চাওয়া হতো এবং প্রায় সর্বত্রই সাধারণ মানুষ তাঁদের আধার নম্বর দিতেন।
আর যদি আপনি আপনার আধারের খুঁটিনাটি দিতে অনিচ্ছুক হন তাহলে হয়তো আপনাকে ভয়ানক হয়রানির মুখে পড়তে হবে। যদিও আধারের খুঁটিনাটি বিষয় না প্রদান করাটা কোনও দোষের নয়।
সম্ভবত এবারেও নিয়মের তেমন একটা পরিবর্তন ঘটবে না। আমাদের দেশে অনেক নিয়মকানুন আছে। আমাদের দেশ ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড ওয়েস্ট নয়। তবে ভারত এমন একটি দেশ যেখানে নিয়মকানুনকে ইচ্ছে মতো বদলানো সম্ভব আর কোনও ব্যক্তি যখন কোথাও এই নিয়মটি লাগু করতে চান তাহলে হয়তো বেশি দেড়ি হয়ে যেতে পারে। উপমা স্বরূপ: পুলিশের ইচ্ছে হলেই কী তাঁরা একজন ব্যক্তিকে মারধর করতে পারে?
না। যদিও পুলিশ এটা করেই থাকে। যাই হোক আবার আধারের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। সম্ভবত, এখনও এমনটাই হবে যে, যেসব ক্ষেত্রে আধার নম্বর প্রদান করাটা বাধ্যতামূলক নয় সেখানেও আধার নম্বর চাওয়া হবে। আর যদি আপনি আপনার আধার নম্বর না দেন তখন হয়তো আবার গত দু'বছরে যে হয়রানির সম্মুখীন হয়েছেন সেটা আবারও হতে হবে।
সুপ্রিমকোর্ট আধারের বৈধতা ও অস্তিত্ব বজায় রেখে আধারকে অপব্যবহার করার সুযোগ করে দিয়েছে। বহু ক্ষেত্রে আধারের আবশ্যিকতাকে কোর্ট নাকচ করে দিলেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্ষেত্রে এখনও এর আবশ্যিকতা বজায় রাখা হয়েছে।
বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আধারকে আবশ্যিক করা মানে হল এখন প্রত্যেক ভারতবাসীর আধার কার্ড থাকাটা বাধ্যতামূলক।সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ মঙ্গলবার এই রায়টি ঘোষণা করে। কোর্ট বলে যে সরকারি ভর্তুকি পাওয়ার ক্ষেত্রে আধার থাকা বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ যেকোনও সরকারি অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে যেমন রেশন নেওয়াই হোক বা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানোই হোক সর্বত্র আপনার থেকে আধার নাম্বার চাওয়া হবে।
আয়কর জমা দিতে হলে আধার নম্বর থাকাটা বাদ্ধত্যমূলক | (ছবি-পিটিআই)
আর যদি আপনি সরকারি ভর্তি না নেন? সেক্ষেত্রেও আয়করের ১৩৯এ ধারাটি অনুসারে ভারতীয় নাগরিককে প্যান কার্ড পেতে হলে বা আয়কর জমা দিতে হলে আধার নম্বর থাকাটা বাদ্ধত্যমূলক।
তাই ভারতীয় নাগরিক হিসেবে আধার কার্ড থাকলে সরকার আমাদের জীবনে তার ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলো ক্রমশ সরকার বাড়াতেই থাকবে এবং এমন একদিন আসবে যখন হয়তো প্রায় সব ধরণের পরিষেবা পেতে হলে প্রতিবার আধার নাম্বার দেখতে হবে।
সুপ্রিমকোর্ট আধার আইনের ৫৭ ধারাটিকে বাতিল করে দেওয়ার পরেও হয়তো বহু বেসরকারি সংস্থা আধার চাইবে।
আধার ছিল এবং এবার সুপ্রিমকোর্ট এই আধারকে কোথায় কোথায় ব্যবহার করতে হবে তার একটা শংসাপত্র দিল। এবার সম্ভবত বিভিন্ন সরকারি সংস্থা অনেকরকম নির্দেশিকা জারি করবে যার ফলে নানান পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে আবার নতুন করে আধারকে বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হবে।
সুপ্রিমকোর্ট পিএমএলএ সম্পর্কিত নিয়মগুলিকে বাতিল করেছে। নিয়ম অনুসারে এখন থেকে আধার নম্বরের সঙ্গে ব্যাঙ্ক অক্কোউন্টকে যোগ করতে হবে না বা টেলি যোগাযোগ মন্ত্রক আমাদের টেলিফোন নম্বরের সঙ্গে আধার নম্বরকে যুক্ত করতে নির্দেশ দিতে পারবে না। তবে সরকার যদি এই বিষয় জোর দেয়ে তাহলে অর্থ মন্ত্রক বা ডওট হয়তো আবার কয়েকটি নির্দেশিকা বা নিয়ম জারি করবে যার ফলে একটি ব্যাঙ্ক একাউন্ট খুলতে হলে বা একটি নতুন সিম নিতে হলে আধার নম্বর দেওয়াটা বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হবে।
যদিও এইধরণের পদক্ষেপ নিতে হলে সরকারকে বেশ সাহসিকতার পরিচয় দিতে হবে এবং বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে সরকার ব্যর্থ হলেও সরকারি সংস্থাগুলি যথা সম্ভব চেষ্টা করবে যাতে আধারকে বাধ্যতামূলক করা যায়।
সুপ্রিমকোর্ট পিএমএলএ সম্পর্কিত নিয়মগুলিকে বাতিল করেছে (ছবি-পিটিআই)
এয়ারটেল ও পেটিএমের মতো বেসরকারি সংস্থাগুলি পরিচয়পত্র হিসেবে আধারকেই অনেক বেশি প্রাধান্য দেবে। এইসব সংস্থা আধারকে বাধ্যতামূলক না করলেও তারা যে পদ্ধতি চালু করবে তার ফলে আধার ছাড়া আর অন্য কোনও পরিচয় পত্র দেখলে কাজ হবে না। উপমা স্বরূপ নতুন পাসপোর্ট করাবার ক্ষেত্রে আধারের প্রয়োজন পড়েনা। তবে যদি কেউ আধার নম্বর দেয় তাহলে নতুন পারপোর্ট পাওয়ার পুরো পদ্ধতিটি অনেক বেশি সহজভাবে সম্পূর্ণ হয়।
এটা ইচ্ছাকৃতভাবেই করা হয়েছে। যদি যে সংস্থাটিকে আধারের দ্বায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেই ইউআইডিএআই বারে বারে বলেছে যে আধারকে যেন পরিচয় পত্র হিসেবে ব্যবহার না করা হয়।
ভারতে নিয়মকানুনকে যথাযত ভাবে পালন করাটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও আমাদের দেশে 'গণশাসন' চলে না তবে জনগণ এখানে গণপিটুনির দ্বারা মানুষকে খুন করে। আমাদের দেশে মানুষের মত প্রকাশের পূর্ণ অধিকার থাকলেও বাস্তবে ভারতের গ্রামাঞ্চলে ও শহরতলিতে নিজের মত প্রকাশ করলে হয়তো সেই ব্যক্তির ভাগ্যে প্রহার জুটবে।
আধারের ব্যবহার এবং তার সাংবিধানিক বৈধতা দিয়ে সুপ্রিমকোর্ট আধারের স্বৈরশাসনকে কিন্তু একইভাবে বজায় রেখেছে।
যদিও রায় ঘোষণার সময় বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় আধারের অন্ধকারের দিকগুলোর দিকেও আলোকপাত করেন। ওনার মতে এটা সংবিধান বিরোধী এবং এর মাধ্যমে জনসাধারণের উপর নজরদারি চালানো সম্ভব। তাই তিনি এটিকে বাতিল করার পরামর্শ দিয়েছেন।
দুর্ভাগ্যবশত বেঞ্চের বাকি বিচারপতিরা তাঁর সঙ্গে একমত হননি।
লেখাটি ইংরেজিতে পড়ুন

