অবসরের ক্ষেত্রে বয়স কি শুধুই সংখ্যা ভিন্ন আর কিছুই নয়

এ বিষয় সব চেয়ে বেশি ভুক্তভোগী খেলোয়াড় ও সংগীতকাররা

 |  4-minute read |   28-08-2018
  • Total Shares

বিনিয়োগ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এমন কেউ যদি হটাৎ করে মাত্র ৪০ বছর বয়সেই অবসর গ্রহণ ফেলেন তাহলে তিনি তাঁর বাকি জীবনটা কাটাবেন কী করে? তাঁর সামনে তখন অঢেল সময়। হয়ত, সময় কাটাতে তিনি সমুদ্রের ধারে একটি বাড়ি কিনবেন।আর, সেই বাড়ির বারান্দায় বসে সমুদ্র উপভোগ করতে করতে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে তিনি তাঁর বাকি জীবনটা কাটিয়ে ফেলবেন। এবার ধরুন, সেই ব্যক্তি যদি কুস্তিবিদ হন। তাহলে চল্লিশোর্ধ বয়সেও তাঁর সামনে পুলিশ বা রেলের চাকরির পথ খোলা থাকবে।

কিছুদিন আগেই বিরাট কোহলি বলছিলেন যে ক্রীড়াবিদদের জীবন কতটা ক্ষণস্থায়ী হয়। হাতে সময় বেশি নেই, আর তাই তিনি সর্বদাই ভালো খেলার জন্যে মুখিয়ে থাকেন। মূলত গান বাজনার সঙ্গে যুক্ত পেশাদাররা বা ক্রীড়াবিদরা এই সমস্যায় ভোগেন। অভিনেতা অভিনেত্রীরাও বয়স হলেও কোনও বুড়ো হাবড়ার চরিত্রে কাজ জুটিয়ে ফেলতে পারেন। হয়ত, বয়স হলে কাজের সংখ্যা কমে যায়। তাই বলে একদমই কাজ পাওয়া যায় না, এমনটা কিন্তু নয়।

খেয়াল করে দেখবেন গান বাজনার পেশায়, বিশেষ করে ডিজেরা, এখন খুব অল্প বয়স থেকেই পেশাদার হয়ে উঠছেন। আফটার দ্য রেভস বলে নেটফ্লিক্সের একটি তথ্যচিত্রে হল্যান্ডের একটি ছোট্ট শহরতলির ১৫ বছরের বালকের জীবন তুলে ধরা হয়েছে। এত অল্প বয়সেও ডিজে হিসেবে সে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে ছিল। সবচেয়ে মজার বিষয়, বয়স কম হওয়ার জন্যে এই ক্ষুদেদের শুধুমাত্র বাবা,মা বা অভিভাবকদের সঙ্গে তাদের কর্মস্থল, মানে নাইট ক্লাবগুলোতে, প্রবেশের অনুমুতি মেলে।

body_082818030938.jpgএকজন ক্রীড়াবিদের জীবন সত্যিই ক্ষণস্থায়ী [ছবি: ইন্ডিয়া টুডে]

অন্যান্য পেশায় অবশ্য নিজের পায়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে একজনের বয়স তিরিশ পেরিয়ে যায়। আর সেই বয়সের ক্রীড়াবিদ মানে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, আপনি বৃদ্ধ। কিছু ব্যতিক্রম অবশ্য আছে। এ ক্ষেত্রে, তিনজন অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটারের কথা আমার মনে পড়ছে। এদের একজন বব হল্যান্ড। গত বছর প্রয়াত হওয়া এই ক্রিকেটারের প্রথম শ্রেণী ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল ৩২ বছর বয়সে। আর, দেশের হয়ে তিনি প্রথম খেলতে নামেন ৩৮ বছর বয়সে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাইক হাসির অভিষেক হয়ে ছিল ৩০ বছর বয়সে। আর এক অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার অ্যাডাম ভোগস ৩৭ বছর বয়সে অবসর নিয়ে ছিলেন। তাঁর টেস্ট রানের অধিকাংশটাই কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ ২০টি টেস্টে এসে ছিল।

সেদিক থেকে সাহিত্যিক ও কবিরা কিন্তু ভাগ্যবান। তাঁরা অল্পবয়স থেকে লেখা শুরু করতে পারেন এবং জীবনের শেষ দিন অবধিও লিখে যেতে পারেন। কবি ডম মরিস মাত্র ২০ বছর বয়সে হাওথর্নডেন পুরস্কার পেয়ে ছিলেন। জিন রিসও ২০ বছর বয়সে লেখা শুরু করেন এবং সেই সময় তাঁর তিনটে ছোট উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল। এর পর ২৭ বছরের নিরাবতা। এবং, অবশেষে ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত হল তাঁর কালজয়ী 'ওয়াইড সার্গাসো সি'। এর ১৩ বছরের মধ্যে লেখিকা মারা গেলেও তাঁর এই বই এখনো প্রতিবছর হাজারেরও উপর বিশ্বজুড়ে বিক্রি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলোতে এই উপন্যাস এখনও অবশ্য পাঠ্য হিসেবে স্বীকৃত।

একই ভাবে, ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত 'কল ইট স্লিপ' লেখার পরে কোথায় যেন উধাও হয়ে যান হেনরি রোথ। এর ৬০ বছর পরে চারটি খণ্ড প্রকাশিত হয় 'মার্সি অফ এ রুড স্ট্রিম'।

পেশাদার সংগীতকারদের অবস্থা অবশ্য খেলোয়াড়দের চাইতে সামান্য ভালো। বিখ্যাত পাল্প ব্যান্ডের রাসেল সিনিয়র যেমন ৪০ বছর বয়সে অবসর নিয়ে বলে ছিলেন যে টিনেজারদের সামনে স্টেজে দাঁড়িয়ে পারফর্ম করতে তিনি অস্বস্তিবোধ করেন। এখন তিনি শেফিল্ডে অ্যান্টিক আসবাবের একটি দোকান চালান।

body1_082818031133.jpgর‌্যাপ গায়কদের জীবন খুব একটা ক্ষণস্থায়ী নয় [ছবি: টুইটার]

আগে র‌্যাপ গায়কদের গায়কদের জীবন জীবন খুব ক্ষণস্থায়ী ছিল। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়েছে। জে-যের বয়স এখন ৪৮, এমিনেমের বয়স এখন ৪৫, কানিয়ের ব্যস এখন ৪০, পুসা টির বয়স ৪১। র‌্যাপ গায়কদের এই বয়স অবধি পারফর্ম করে যাওয়ার ধারাটাকে পপ সংস্কৃতি স্বাগত জানিয়েছে। বিভিন্ন সাখ্যাৎকারে এমিনেম স্বীকার করেছেন যে র‌্যাপ আদতে তরুনদের জন্যে, কিন্তু যতদিন তিন পারবেন ততদিন তিনি র্যাযপের মাধ্যমে তাঁর বার্তা দিয়ে যাবেন।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী খেলোয়াড়রা। কিন্তু বিষয়টিকে খুব বেশি পাত্তা দেওয়া হয় না কারণ আমাদের বদ্ধমূল ধারণা যে খেলোয়াড়রা যতদিন খেলেন ততদিন যা কামিয়ে নেন তা দিয়ে তাঁদের পরবর্তী কয়েক প্রজন্মের চলে যাবে। অবসরের পর পরই নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন মারাদোনা। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটাররা সচরাচর এই পথ ধরনে না। কারণ অবসরের আগেই তাঁদের একটি সুখের ঘর সংসার তৈরি হয়ে যায়।

নেশা ছেড়ে প্ৰশিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ন হয়ে ছিলেন মারাদোনা। প্রশিক্ষক বা ধারাভাষ্যকরের চাকরি কিংবা গল্ফ খেলা - অবসরোত্তর জীবনে খেলোয়াড়দের কাজের সুযোগ নেহাতই কম। তাই বেশিরভাগ অবসর নেওয়া খেলোয়াড়রা একটি কথাই বলে থাকেন, "আমি আমার পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে চাই।"

কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠও রয়েছে। ভুলে গেলে চলবে না যে আমরা এখন এমন একটা সময় বাস করি যেখানে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। এবছরেই তো দুই নবতিপরকে নিয়ে বিশ্ব জুড়ে আলোড়নসৃষ্টি হয়ে ছিল।

গত সপ্তাহে ৯৫ বছর বয়স্ক এক প্রাক্তন নাৎজি কারারক্ষককে নিউইয়র্কে থেকে গ্রেপ্তার করে স্ট্রেচারে করে জার্মানিতে নিয়ে আশা হয়ে ছিল। জাকিও পালিজ হয়ত স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি যে জীবনের শেষ সময় এসে তাঁর জন্যে এমন একটা কিছু অপেক্ষা করে রয়েছে। কারারক্ষক হিসেবে তাঁর জীবন খুব ক্ষণস্থায়ী ছিল। অথচ ২১ শতকে এসেও এর জের তাঁকে পোহাতে হচ্ছে।

এ বছর মে মাসে ৯২ বছরের মহাথির মোহাম্মদকে আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করে হয়। তিনি ২০০৩ সালে অবসর গ্রহণ করে ছিলেন। সত্যি, কিছু লোকের ক্ষেত্রে বয়স শুধুই সংখ্যা ভিন্ন আর কিছুই নয়। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট একটি প্রতিবেদনে লিখেছে, "সাধারণ কিছু রোজনামচা মেনে চলে সুস্থ রয়েছেন মহাথির - ধূমপান, মদ্যপান ও মাত্রাতিরিক্ত খাবারের থেকে বিরত থাকেন তিনি। এর সামান্য কিছু ব্যায়াম ও বই পড়া তাঁকে সুস্থ থাকতে সাহায্য করে।"

(সৌজন্যে: মেল টুডে)

লেখাটি পড়ুন ইংরেজিতে

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

PALAS KRISHNA MEHROTRA
Comment