কলকাতা ও সল্টলেকে অ্যাপক্যাবের নিয়ম আলাদা, তাতে সমস্যা যাত্রীদেরই

কলকাতা পুলিশ ও বিধাননগর কমিশনারেট দু'জায়গায় অ্যাপ ক্যাবের আইন কিন্তু ভিন্ন

 |  4-minute read |   25-04-2018
  • Total Shares

মনে করুন আপনি শহরের অন্যতম কেন্দ্রস্থল এক্সাইড থেকে অ্যাপ ক্যাব বুক করে বিমানবন্দর যাচ্ছেন এবং মাঝরাস্তায় ক্যাব চালক আপনাকে কোনও ভাবে হেনস্থা করল। সে ক্ষেত্রে ঘটনাটা ঠিক কোথায় ঘটেছে তার উপর নির্ভর করবে এই সংক্রান্ত মামলাটি কী ভাবে রুজু করা হবে। এক্সাইড থেকে বিমানবন্দর অবধি রাস্তার কিছুটা কলকাতা পুলিশের আওতায় বাকিটা বিধাননগর কমিশনারেটের অন্তর্গত। আর, এই দু'টি পুলিশ প্রশাসন দু'টি ভিন্ন অ্যাপ-ক্যাব সংক্রান্ত আইন মেনে চলে। ঠিক ভাবে বলতে গেলে কলকাতা পুলিশের আইন অনুযায়ী অ্যাপ ক্যাব নিয়ে ভিন্ন কোনও আইন নেই। লালবাজারের কর্তাদের চোখে অ্যাপ ক্যাব হচ্ছে রেন্ট-আ-ক্যাব বা রেডিও ক্যাব জাতীয় পরিষেবা। সহজ সরল বাংলায় ভাড়া গাড়ি। অর্থাৎ, অ্যাপ ক্যাব কর্তৃপক্ষ নিজেদের বা অন্যের গাড়ি যাত্রীদের ভাড়া দিচ্ছে। সে ক্ষেত্রে রাস্তায় কোনওরকম যাত্রী হেনস্তার মামলা রুজু হলে তার দায়িত্ব অ্যাপ-ক্যাব কর্তৃপক্ষকেও নিতে হবে।

অথচ অ্যাপ ক্যাব কর্তৃপক্ষ অনেকদিন ধরেই দাবি করে আসছেন যে তাঁরা যাত্রীদের গাড়ি ভাড়া দেন না। তাঁরা আদতে 'ট্রান্সপোর্টএগ্রিগেটর অর্থাৎ তাঁদের সংস্থা শুধুমাত্র গাড়ির মালিক বা চালকদের সঙ্গে যাত্রীদের সংযোগ ঘটায়। এবং সে ক্ষেত্রে গাড়ির চালকের সঙ্গে যাত্রীর যদি কোনও সমস্যার সৃষ্টি হয় (পরিষেবা সংক্রান্ত বাদে) তাহলে অ্যাপ-ক্যাব কর্তৃপক্ষ কোনওরকম দায়িত্ব নেবেন না। ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে অ্যাপ ক্যাব কর্তৃপক্ষের এই দাবি স্বীকৃতি দিয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করে বিধাননগর কমিশনারেট।

এখন আপনার এক্সাইড থেকে বিমানবন্দর যাত্রাপথে আপনি যদি কলকাতা পুলিশের এলাকায় হেনস্তার শিকার হন, তাহলে আপনার দায়ের করা মামলার দায়ে অ্যাপ-ক্যাব ক৪তৃপক্ষের ঘাড়ে পড়বে। কিন্তু একই ঘটনা যদি বিধাননগর কমিশনারেটের এলাকায় ঘটে তাহলে তাঁর দায়ে কোনও ভাবেই অ্যাপ ক্যাব কর্তৃপক্ষের ঘাড়ে বর্তাবে না।

এই ধরণের হাজারো সমস্যা নিয়েই মহানগরের রাজপথ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অ্যাপ ক্যাবগুলো।

body_042518101649.jpgঅভূতপূর্ব সমস্যা নিয়েই মহানগরের রাজপথ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অ্যাপ ক্যাবগুলো

ভাড়া সমস্যা

খুব সম্ভত এটি একমাত্র পরিবহণ পরিষেবা যার ভাড়া জ্বালানির দামের উপর নির্ভর করে না, চাহিদার উপর করে। আপনি হয়ত লক্ষ করে থাকবেন যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ইডেনে বা যুবভারতীতে খেলার শেষে এই অ্যাপ ক্যাবগুলোর ভাড়া আকাশ ছুঁয়ে ফেলে। কিন্তু জ্বালানির দাম বাড়লেও মালিক চালকদের দাবি মেনে কর্তৃপক্ষ ভাড়া বাড়ান না। মালিকরা বিভিন্ন ধরণের স্কিমের মাধ্যমে কতৃপক্ষের কাছ থেকে পারিশ্রমিক পান, যা মোটামুটি ভাড়ার ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ আপনি যদি ১০০ টাকা ভাড়া দেন তাহলে ৭৫ টাকা মালিক পাবেন বাকি ২৫ টাকা অ্যাপ কর্তৃপক্ষের।

পশ্চিমবঙ্গের সমস্যা হচ্ছে এখানে অ্যাপ ক্যাবের সারচার্জের (চাহিদা বাড়লে যে বর্ধিত ভাড়া নেওয়া হয়) উপর কোনও বিধিনিষেধ নেই। দিল্লি বা কর্নাটকে কিন্তু আদালতের নির্দেশে সরকার বর্ধিত ভাড়া বেঁধে দিয়েছে। অর্থাৎ, কিলোমিটার প্রতি সর্বোচ্চ ভাড়া ঠিক করা দিয়েছে। রাজ্যের পরিবহণ দপ্তর থেকে একটা সময় এই রাজ্যেও এই নিয়ম কার্যকর করা হবে বলে জানান হয়েছিল। কিন্তু এখন অবধি হয়নি। কবে হবে তারও কোনও নিশ্চয়তা নেই।

অ্যাপ ক্যাব তাও জনপ্রিয়

এত সমস্যার পরেও এই পরিষেবাকে আপন করে নিয়েছে কলকাতা। এর পিছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে।

প্রথমত, শহরের আবহাওয়া। গরমে তাপমাত্রার পারদ এতটাই চড়ে যায় যে সকলেই শীততাপ নিয়ন্ত্রিত যানবাহনের খোঁজ করেন। কলকাতার নিজস্ব মিটার ট্যাক্সি পরিষেবায় শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ট্যাক্সির সংখ্যা হাতেগোনা। তার উপর কলকাতার ট্যাক্সি ভাড়া বহুদিন বাড়েনি। এই পরিস্থিতিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্যাক্সি চালকরা অধিকাংশ সময় এসি চালিয়ে যেতে রাজি থাকেন না। যদিও, শীতাতপ পরিষেবার জন্য মিটারে যা ভাড়া হবে তার চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি দিতে হয় যাত্রীদের। দুই, শহরের ট্যাক্সি প্রত্যাখ্যান সমস্যা। চালকদের যাত্রী প্রত্যাখ্যানের জ্বালায় যখন শহরবাসীরা জর্জরিত তখনই এই ধরণের অ্যাপ ক্যাবের আগমন। মোবাইল থেকে ক্যাব বুক করা যায়, বর্তমানের গাড়ির অবস্থা কোথায় তাও জেনে নেওয়া যায় এবং সর্বোপরি প্রত্যাখানের সুযোগ কম, একেবারে দরজা থেকে দরজা অবধি পরিষেবা - শহরবাসীরা এই সুযোগ লুফে নিলেন।

আরও একটি অর্থনৈতিক সুবিধাও রয়েছে। সরকারি ভাবে হলুদ ট্যাক্সি শেয়ার যাত্রী তুলতে পারে না। অ্যাপ ক্যাবগুলোর শেয়ার পরিষেবাও রয়েছে। অর্থাৎ, আপনি এখন ট্যাক্সির চেয়ে কম ভাড়ায় নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে যাবেন, তাও আবার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে। শুধু হাতে একটু বাড়তি সময় রাখতে হবে।

body2_042518101714.jpgঅ্যাপ ক্যাব শহরে আসার পরে প্রায় হাজার সাতেক মিটার ট্যাক্সি কমে গেছে

মিটার ট্যাক্সি কি উঠে যাবে?

অ্যাপ ক্যাব শহরে আসার পরে প্রায় হাজার সাতেক মিটার ট্যাক্সি কমে গেছে।

মিটার ট্যাক্সির দুর্দশার অন্যতম কারণ মিটার ট্যাক্সির চালকদের প্রত্যাখ্যানের স্বভাব। তবে কারণটা অন্যতম হলেও কোনও মতেই একমাত্র কারণ নয়।

হলুদ ট্যাক্সি কমে যাওয়ার পিছনে সরকারি নীতিও দায়ী। বেশ কয়েক বছর মিটার ট্যাক্সির ভাড়া বাড়ানো হয়নি। অথচ এই সময় ডিজেলের দাম অনেকটাই বেড়েছে। বর্তমান ব্যবস্থায়, ট্যাক্সির মালিকরা চালকদের ট্যাক্সি ভাড়ায় দিয়ে থাকেন। চালকরা সারাদিন যা ভাড়া পান তার থেকে ডিজেলের দাম ও মালিকদের ভাড়া মিটিয়ে বাকি টাকাটা আয় করেন। তাই যাত্রী প্রত্যাখ্যান করে বা বাড়তি ভাড়া চেয়েও চালকদের আয় অনেকটাই কমে গেছে। যার ফলে অনেক চালকই এখন ট্যাক্সি চালাতে নারাজ। উল্টোদিকে, তাঁরা যদি অ্যাপ ক্যাব চালান, তা হলে তাঁরা মালিকদের কাছে রোজ নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক পান। ডিজেল বা অন্যান্য খরচ নিয়ে তাঁদের মাথা ঘামাতে হয়না। এ সবের দায়িত্ব মালিকদের।

ট্যাক্সি কমার আরও একটি বড় কারণ, হিন্দুস্তান মোটরস বন্ধ হয়ে যাওয়া। কলকাতার অধিকাংশ মিটার ট্যাক্সি আম্বাসাডর। কিন্তু ১৫ বছরের পুরোনো ট্যাক্সি বন্ধ হয়ে গেলে এখন আর অ্যাম্বাসাডর কেনা যাচ্ছে না। অন্যান্য অটোমোবাইল সংস্থার গাড়ি কিনতে হচ্ছে। এই সংস্থাগুলোর সঙ্গে জোট বেঁধে গতিধারা প্রকল্প চালু করেছে সরকার। যেখানে সরকারের তরফ থেকে এক লক্ষ টাকা আর সহজ কিস্তির বন্দোবস্ত করে দেওয়া হয়। তাই মালিকরা এখন নতুন গাড়ি কিনতে চাইলে এই প্রকল্পের মাধ্যমে কিনছেন। কিন্তু এই প্রকল্প মিটার ট্যাক্সির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

সব মিলিয়ে কলকাতার ঐতিহ্যশালী নীল হলুদ ট্যাক্সির উপর এখন কালো মেঘের ঘনঘটা।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

ARPIT BASU ARPIT BASU @virusfound007

Arpit Basu is the Special Correspondent with the India Today Group’s fact check team. With more than one-and-a-half decade's experience in print and digital media, he has reported on aviation, transport, crime, civic and human interests issues. His sting operation on how precious Aviation Turbine Fuel, meant for Kolkata airport, was pilfered and sold in local market as ‘white kerosene’ received widespread acclaim. Arpit has worked with reputed media houses like The Times of India and Hindustan Times and had received letter of appreciation for reporting during the Phalin cyclone in Odisha in 2013.

Comment