ভাগ্য ফেরাতে লোকে যায় এই সব ভণ্ড সাধুদের কাছেই

বাবার পায়ে ভক্তরা ঢেলে দিচ্ছেন প্রণামীর নামে দামি সব উপঢৌকন

 |  3-minute read |   26-04-2018
  • Total Shares

আমাদের এই আধ্যাত্মিক দেশে ধর্মের নামে হানাহানি আর জোচ্চুরির যেমন শেষ নেই, তেমনই ভাঁটা পড়েনি স্বঘোষিত ও সুযোগসন্ধানী কিছু ‘মহাপুরুষ’ ও ‘ঈশ্বরপুরুষ’দের।

সত্যজিৎ রায়ের ছবি 'কাপুরুষ মহাপুরুষ' থেকে শুরু করে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের স্বামী ঘুটঘুটানন্দ হয়ে, হালে 'ওএমজি ও মাই গড' – বিভিন্ন ছায়াছবিতে এই সব গডম্যানদের লীলা উঠে এসেছে বহুবার। ওএমজি নামে হিন্দি ছবিটিতে লীলাধর স্বামী ও সিদ্ধেশ্বর মহারাজ সন্ন্যাসীর ভেকধারী বকধার্মিকের নামান্তর। কিন্তু ঠকতে অভস্ত ভারতীয় সমাজ এঁদের কাছে গিয়ে ঠকতে ও সর্বস্বান্ত হতেই যে অভ্যস্ত, সেটাই তুলে ধরা হয়েছে। ছবিটি জনপ্রিয় হয়েছে, কিন্তু আমাদের চৈতন্য হয়েছে কি?

এই সব গুরুগম্ভীর কথাগুলোর থেকে একটু বেরিয়ে অর্থনীতিতে আসা যাক। অর্থনীতির চাহিদা ও জোগানের নীতি মেনে চললে দেখা যাবে যে এই ধরণের কিছু ভুঁইফোঁড় বাবাদেরকে হয়ত তৈরি করেছে আমাদের সমাজই। ধর্মের ও ঈশ্বরের নামে এঁরা আমাদের অনেক কিছু বিশ্বাস করান আর আমরা এঁদের বাণী মন্ত্রমুগ্ধের মতো বিশ্বাস করে চলি। আসলে আফিমের নেশার মতো লাখ লাখ ভক্ত এই বাবাদের দিকে আকৃষ্ট হয়ে তাঁর জন্য প্রাণ দিতেও রাজি। আর যতক্ষণ প্রাণ দেওয়ার মতো কোনও পরিস্থিতি না তৈরি হচ্ছে, বাবার পায়ে ভক্তরা ঢেলে দিচ্ছেন প্রণামীর নামে দামি সব উপঢৌকন। এই ভাবেই তাঁরা কোটি কোটি টাকার ও শত শত বিঘা জমিজমার মালিক হয়ে উঠছেন। এঁদের আশ্রমগুলো পর্ণকুটীর নয়, বরং বেশ কয়েক বিঘা জমিতে গড়ে ওঠা এই আশ্রমে কী নেই সেটাই বলা মুশকিল।

body1_042618053156.jpgএঁরা আমাদের অনেক কিছু বিশ্বাস করান আর আমরা এঁদের বাণী মন্ত্রমুগ্ধের মতো বিশ্বাস করে চলি

আবার রাম রহিমের মতো একটু শিল্পী মনোভাবাপন্ন বাবাদের তো ব্যাপারই আলাদা। ভক্তরা এদের গানের অ্যালবাম থেকে শুরু করে কনসার্ট অবধি আয়োজন করে ফেলেন।

২৫ এপ্রিল রাজস্থানের জোধপুর শহরের একটি আদালত এক ১৬ বছরের মেয়েকে ধর্ষণের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছে আর এক পরমপুরুষ আসারাম বাপুকে। রায়টিতে খুশি হয়েছেন ধর্ষিতার বাবা। আমাদের সামনে হয়ত এই ধরণের কয়েকটা ঘটনা উঠে আসে কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি ঘটনা হয়ত চাপাই পড়ে থাকে।

কোনও মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না বা কোনও মহিলার সন্তান হচ্ছে না, তাঁকে গুরুর আশীর্বাদের জন্য আশ্রমে নিয়ে যাওয়া হল। ব্যস, খুব সহজেই সমস্যার সমাধান। একজন দুঃখিনীকে খুব সহজেই বিভিন্ন আশীর্বাদ বা ভগবানের প্রসাদ বলে তার শ্লীলতাহানি করা খুবই সহজ কাজ হয়ে যায়।

এবার আসা যাক এই সাধুবাবাদের চেলাচামুণ্ডার কথায়। বিলাসবহুল এই আশ্রমগুলোর একবার সদস্য হতে পারলে তো আর কোনও কথাই নেই। সারা জীবনের জন্য থাকা ও খাওয়া এক্কেবারে নিখরচায়।

omg_body2_042618053452.jpgভক্তরা এদের গানের অ্যালবাম থেকে শুরু করে কনসার্ট অবধি আয়োজন করে ফেলেন

আমার মনে হয়, ধর্মের আসল মানেটা বুঝতে হবে আমাদের আর অবশ্যই নিজেদের মনকে বস্তাপচা কুসংস্কার থেকে মুক্ত করতে হবে, না হলে এই ধরণের অনেক আসারাম বাপু, গুরমিত রাম রহিম, স্বামী প্রেমানন্দ ও শ্রী অমৃত চৈতন্যর মতো অসাধু লোকেদের অভাব হবে না কোনও দিন। তবে একটা কথা বলার প্রয়োজন রয়েছে সেটা হল, যেমন আফিমের নেশা একদিনে ছাড়া সম্ভব নয় তেমন ভাবেই মানুষ আবার এঁদেরই শরণাপন্ন হবে। সমস্যায় পড়লে বা দুর্ভাগ্যের থেকে রক্ষা পেতে যাঁরা আমাদের রেহাই দিতে পারে বলে দাবি করেন, কবে কী খবর বেরিয়েছে সে সবের তোয়াক্কা না করে লোকে আবার তাঁদের কাছেই ছোটেন।

'ও মাই গড'-এর যুক্তিবাদী এবং ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাসী কাঞ্জিভাইকে (পরেশ রাওয়াল) লীলাধর স্বামী (মিঠুন চক্রবর্তী) বলেছিলেন যে কাঞ্জিভাই সাধারণ মানুষের জন্য লড়াই করে ধর্মের এবং ধর্মের নামে যারা জোচ্চুরি করছে তাদের বিরুদ্ধে গেছে, এই সব মানুষই আবার কোনও মন্দিরের বাইরে দেব-দর্শনের জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঈশ্বরের আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য, কারণ 'দে আর গড ফিয়ারিং নট গড লাভিং পিপল'-- এঁরা ঈশ্বরকে ভালোবাসেন না, এঁরা ঈশ্বরকে ভয় পান।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

Comment