উল্টোডাঙার বিক্ষোভের প্রভাব কিন্তু অন্য রুটেও পড়তে পারে
অটো চালকদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে, কিন্তু যাত্রীরা প্রতিবাদ জানাতে ভয় পান
- Total Shares
কয়েক সপ্তাহ আগের ঘটনা। যাদবপুরের এক গৃহবধূ তাঁর ছেলেকে অটোতে করে স্কুলে পৌছিয়ে দিতে যাচ্ছিলেন। দুজনেই যাদবপুরের ৮-বি বাসস্ট্যান্ডের সামনে থেকে অটোতে চড়েছিলেন। কিন্তু পাঁচজন না হলে চালক অটো চালাবেন না। এদিকে ছেলের স্কুলে পরীক্ষা রয়েছে। হাতে সময় কম। ক্রমেই ধৈর্যহীন হয়ে পড়ছিলেন সেই মহিলা।
ঠিক সেই সময় একটি বেসরকারি বাস এসে অটো স্ট্যান্ড লাগোয়া বাসস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়িয়েছিল। উপায় না দেখে মহিলা অটো থেকে নেমে বাস ধরতে ছুটলেন। কিন্তু বিধি বাম। স্ট্যান্ডে পৌঁছানোর আগেই বাস বেরিয়ে গেল। অগত্যা আর কোনও উপায় না দেখে আবার ছেলেকে নিয়ে অটোতে ফিরে এলেন তিনি।
এ বার বাঁধ সাধলেন অটো চালক। অটো ছেড়ে বসে উঠবার চেষ্টা করেছিলেন, সেই অভিযোগ তিনি মহিলা ও তাঁর ছেলেকে অটোতে তুলতে চাইলেন না। এখানেই ক্ষ্যান্ত হলেন না চালক। লাইনে দাঁড়ান অন্য অটোগুলোতেও যাতে মহিলা আর তাঁর ছেলে উঠতে না পারেন সে বিষয় সচেষ্ট হলেন।
এবার শুরু হল বচসা। তারপর হাতাহাতি। কোনও সহযাত্রীই নাকি মহিলাকে সেদিন বাঁচাতে আসেননি। দুপুরের দিকে মহিলা প্রথমে যাদবপুর থানায় চালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানালেন। থানা থেকে কোনও ব্যবস্থা না নেওয়ায় মহিলা বিকেলের দিকে বিভাগীয় ডিসির দ্বারস্থ হলেন। ডিসির উদ্যোগে শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হলেন অভিযুক্ত চালক।
অটোকে কেন্দ্র করে এই ধরণের ঘটনা নতুন নয়। অটোকে চালকদের বিরুদ্ধে এ ধরণের অভিযোগ কদাচিৎ ঘটে এমনটাও নয়। নিত্যদিনই এই ধরণের অভিযোগ ওঠে চালকদের বিরুদ্ধে। তার মধ্যে কিছু খবর সংবাদমাধ্যমের পাতায় ফলাও করে প্রকাশ হয়। বেশিরভাগ ঘটনার কথাই অবশ্য প্রকাশ্যে আসে না। এখন প্রশ্ন হল কী এমন কারণ রয়েছে যে শহরের অটো চালকদের আইন শৃঙ্খলা ভঙ্গ করতে সাহস যোগায়। দিনের পর দিন আইন ভঙ্গ করতে কেন তাঁরা পিছপা হননা।
উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই শহরের অটোর ইতিহাসটা একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। আশির দশকের প্রথম দিকে এই শহরে অটোর আবির্ভাব। আর, জন্মলগ্ন থেকেই অটোর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। তৎকালীন ট্যাক্সি ইউনিয়নের নেতারা অটোর এই বাড়বাড়ন্ত ভালো ভাবে নেননি। তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হন। আদালতের নির্দেশের শহরে অটো চলাচলের উপরে বিধিনিষেধ চালু হয়।

আর, এখান থেকেই শুরু শহরের অটো রাজের।
ভোটব্যাঙ্ক সুস্থ রাখতে সেই সময় অটোর মালিক ও চালকদের পাশে এসে দাঁড়ালেন স্থানীয় সিটু নেতারা। রুট ভিত্তিক (অঞ্চলের মধ্যে) বেআইনি ভাবে অটো চালাবার 'পাসপোর্ট' দিলেন তাঁরা। ভবিষ্যতে এই বেআইনি পরিবহন ব্যবস্থাই তাঁদের হাত ধরে অর্গানাইজেড হল। কিন্তু গোটা ব্যবস্থাটাই বেআইনি রয়ে গেল। পশ্চিমবঙ্গের পালা বদলের পরে এখন সেই অটো ইউনিয়নগুলোর ব্যাটন স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের হাতে, যাঁরা নিজেদের আইএনটিটিইউসির সদস্য বলতে পছন্দ করেন। দাদাদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে অটো চালকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবেন এমন বুকের অভিজ্ঞতা ক'জনের রয়েছে?
আমার আপনার তো নেই, পুলিশেরও যে নেই তা তো ওই ভদ্রমহিলার ঘটনার থেকেই বোঝা গেল। বিভাগীয় ডিসির নির্দেশ এলেই থানার অফিসাররা অটো চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন, নচেৎ নয়। থানার অফিসারদের বাদ দিন আইএনটিটিইউসির রাজ্য বা জেলার নেতারাও কোনও ব্যবস্থা নিতে দু'বার চিন্তা করবেন।
দু-একটি রুটে নিত্যদিন কিছু অটো চালকদের অনিয়ম করতে দেখে আইএনটিটিইউসির রাজ্য নেতাকে বার দুয়েক ফোন করে অভিযোগ জানিয়ে ছিলাম। ফোনে প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল যে এ জিনিস বরদাস্ত করা যাবে না। কিন্তু তাঁরা কিছুই করতে পারেননি। চালকরা নিজেদের মতো অনিয়ম করে গিয়েছেন (এখনও যাচ্ছেন) স্থানীয় নেতাদের সুরক্ষিত হাতের আড়ালে।
কিন্তু দিন দুয়েক আগে উল্টোডাঙায় এক অন্য রকম ঘটনার সাক্ষী থাকল এই শহর। যাত্রীরা এক জোট হয়ে প্রতিবাদ করলেন। এ জিনিস শহর কিন্তু অনেকদিন দেখেনি। দেখার কথাও নয়। কারণ বর্তমান যুগে প্রতিবাদ করার মতো সময় নেই কারুর হাতে। খোঁজ খবর নিয়ে দেখলাম এই প্রতিবাদ কিন্তু একদিনে হটাৎ করে হওয়া প্রতিক্রিয়া নয়। বহু দিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। একজন সেদিন সলতেটা পাকিয়েছিলেন। বাকিরা আগুন লাগাবার জন্যে তৈরি ছিলেন।
সংবাদমাধ্যমের সৌজন্যে এই খবর কিন্তু ছড়িয়ে পড়েছে। ছোট হোক, কিংবা বড় হোক, এর প্রভাব কিন্তু অন্য রুটগুলোতেও পড়বে। কারণ, প্রতিটি রুটেই অটো চালকদের দৌরাত্ম্যে জর্জরিত মানুষ। প্রতিবাদ করতে চান, কিন্তু ভয় পান। যদি পাশে কাউকে না পাওয়া যায়। কিন্তু উল্টোডাঙার বিক্ষোভের পর লোকে কিন্তু প্রতিবাদের সাহস পাচ্ছেন।
বছর ছয়েক আগে কলকাতায় বেশ কিছু রুটে যাত্রীরা প্রতিবাদের সাহস দেখিয়েছিলেন। সেখানেও সূত্রপাতটা হয়েছিল উল্টোডাঙা থেকেই। সেদিন অটো চালকদের বিরুদ্ধে পথে নামতে দেখা গিয়েছিল তৃণমূল বিধায়ক পরেশ পালকে। ২০১২ সালের এপ্রিল মাসের তিন তারিখে এলপিজি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন অটো চালকেরা। যাত্রীদের হাজার আকুতি মিনুতি সত্ত্বেও তাঁরা অটো চালাতে নারাজ ছিলেন। যাত্রীদের অসুবিধার খবর পেয়ে এলাকায় পৌঁছান বিধায়ক পরেশ পাল। এর পর টিভি ক্যামারের সামনে, সকলকে অবাক করেই, দু'তিন জন অটো চালককে থাপ্পড় মারতে দেখা যায় পরেশ পালকে। ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই এলাকায় অটো চলাচল স্বাভাবিক হয়ে পড়েছিল।
কারুর গায়ে হাত তোলা কখনই সমর্থন যোগ্য নয়। কিন্তু তাই বলে প্রতিবাদ তো করা যেতেই পারে। আর অটো চালকদের দৌরাত্ম্য যে পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে তার প্রতিবাদ করাটাই স্বাভাবিক।

