কখনও টাকা কাটছে ইঁদুরে, কখনও বেরচ্ছে জালটাকা বা কাগজ, কেন এমন হয়?
টাকার বদলে হাতে ব্রাউনপেপার বা অন্যকিছু পেলে গ্রাহক কী করবেন
- Total Shares
কয়েকদিন ধরেই দেখছি এটিএমে স্কিমার যন্ত্র বসিয়ে গ্রাহকদের তথ্য চুরি করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। তা নিয়ে বেশ হইচই হচ্ছে। সেই রেশ কাটার আগেই নতুন বিপত্তি হল এটিএম থেকে টাকার বদলে বাদামি কাগজ বা ব্রাউনপেপার! একটু পিছিয়ে গেলে হয়তো মনে করতে পারবেন, রাজধানীর একটি এটিএম থেকে খেলনা নোট (যেখানে লেখা এন্টারটেনমেন্ট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া) বার হয়েছিল। আবার মাস খানেক মতো আগে অসমের তিনসুকিয়ায় একটি এটিএমে দেখা যায় ইঁদুরে টাকা কেটেছে। তাতে গ্রাহকের ক্ষতি হয়নি বলেই হইচই তেমন হয়নি। এখানে দু’টি সাধারণ প্রশ্ন আছে। কেন এমন হয় এবং গ্রাহকের কী করণীয়।
ব্যাঙ্কের এটিএমের সিস্টেম নিয়ে কাজ করার জন্য এক কথায় উত্তর দিতে পারি: রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের জন্যই এই ধরনের সমস্যা হয়ে থাকে। প্রথমে আসি ইঁদুরে টাকা কাটার কথায়।
এটিএমে ইঁদুর!
এটিএমের ভিতরে যেখানে টাকার ক্যাসেট থাকে, সেখানে একটি সার্কিট থাকে, যে সার্কিটের মাধ্যমে বিভিন্ন কম্যান্ড যায়। এখানে খুব কম ভোল্টেজ বিদ্যুৎ থাকে, তাই এই সার্কিট থেকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে না বললেই চলে।
এটিএমে টাকা কেটেছে ইঁদুর, অসমের তিনসুকিয়ায়
একবার একটি এটিএম যখন নানা ভাবে পরীক্ষা করার পরেও সফটওয়্যার সংক্রান্ত কোনও ত্রুটি খুঁজে পাচ্ছি না, তখন রক্ষণাবেক্ষণকারী সংস্থাকে তলব করা হয়। তাঁরা ওই সার্কিটের অংশ খোলার পরে দেখা যায় একটি ইঁদুর তার কেটেছে, তারপরে কোনও ভাবে এমন একটি জায়গায় দাঁত বসিয়েছে যে সে নিজে তো বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েইছে, টেলারিং যন্ত্রটিকেও বিকল করে দিয়েছে।
ইঁদুরে টাকা কাটতে পারে, কিন্তু একটি চালু এটিএমে ইঁদুর অতগুলি টাকা কেটে ফেলল, কেউ জানতে পারল না? এটা কার্যত অসম্ভব যদি না কোনও কারণে দীর্ঘদিন এটিএম-টি টাকা ভরা অবস্থায় বন্ধ হয়ে না পড়ে থাকে। তা হলে আরেকটি প্রশ্নও জাগে, ইঁদুরে কাটা টাকা ওই ভাবে আনা হয়নি তো? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া অবশ্য আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
টাকার বদলে কাগজ!
এটিএমে অন্য নানা ধরনের জালিয়াতি নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। এটিএম থেকে টাকার বদলে সাধারণ কাগজ বার হওয়ার খবরও দেখেছি। বিভিন্ন ব্যাঙ্কের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় (যেমন ই-লবি) দেখা যায়, যন্ত্রগুলি জাল টাকা গ্রহণ করে না। যদি তাই হয়, তা হলে জাল টাকা তো বটেই, কাগজ কী ভাবে বার হয়?
টাকার বদলে কাগজ, হাওড়ার একটি এটিএমে (নিজস্ব চিত্র)
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। এটিএমের দায়িত্বে থাকে একটি সংস্থা, সফটওয়্যার দেখভালের দায়িত্বে থাকে অন্য কোনও সংস্থা যদিও তা আপডেট করে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ। ব্যাঙ্কের তত্ত্বাবধানে এটিএমে টাকা ভরার দায়িত্ব থাকে অন্য সংস্থার।
কোথাও যদি টাকা ছাড়া অন্য কোনও কাগজ ভরা হয়, তা হলে ব্যাঙ্কের কোনও ব্যক্তি ও তৃতীয় ওই সংস্থার কোনও ব্যক্তির মধ্যে হয় যোগসাজস ছিল, না হয় তাদের মধ্যে কোনও এক জনের গাফিলতি বা অন্যের উপরে অগাধ বিশ্বাস ছিল। না হলে টাকার বদলে অন্যকিছু বার হওয়া সম্ভব নয়। কোনও ব্যক্তি যদি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে টাকা ভারতে যান, তা হলে ওই যন্ত্র সেটি আসল কিনা পরীক্ষা করে। টাকাটি নকল হলে যন্ত্র সেটি গ্রহণ করে না।
যেখানে ব্যাঙ্ক নিজে টাকা ভরছে বা ভরাচ্ছে, অর্থাৎ টাকাটি সরাসরি ব্যাঙ্ক থেকে আসছে, সেখানে টাকা বার হওয়ার সময় টাকাটি আসল কি নকল তা পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয় না। তাই কোনও ভাবে নির্দিষ্ট টাকার মাপের কাগজ দেওয়া থাকলে এটিএম যন্ত্র সেটিকে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বাতিল করতে বা আটকে দিতে পারে না। বিপত্তি এখানেই।
কী করবেন গ্রাহক
আদর্শগত ভাবে বলা যায়, তখনই নিরাপত্তাকর্মীকে বিষয়টি জানানো, ট্রানজাকশন স্লিপ নিয়ে, ট্রানজাকশন আইডি দিয়ে সেই অভিযোগ নির্দিষ্ট খাতায় নথিভুক্ত করানো। তারপরে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কে জানানো। আপনার কাছে ট্রানজাকশন স্লিপ ও সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
বাস্তবে অবশ্য পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। অনেক এটিএমে নিরাপত্তাকর্মী থাকেন না, অভিযোগ করার খাতাও খুঁজে পাওয়া যায় না। সিসি ক্যামেরা কাজ করছে কিনা বলা মুশকিল। আবার স্লিপও বার হয় না। দেখা যায় সমস্যা হয় এই ধরনের এটিএমগুলিতেই। এটিএম অ্যালার্ট থাকলে তা থেকে ট্রানজাকশন আইডি নিয়ে অভিযোগ জানাতে হবে যত দ্রুত সম্ভব। এ জন্য এসএমএস পরিষেবা চালু রাখা অত্যন্ত জরুরি। না হলে গ্রাহককে সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
ব্যাঙ্কগুলিক কী করণীয়
পেশাদার কাজে পুরোটা বিশ্বাসের উপরে ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়। এই ধরনের সমস্যা হয় একাধিক স্তরে গাফিলতি ও যোগসাজসের কোনও একটি থাকলে। তাই পেশাদারদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত।
এই ধরনের কোনও ঘটনা ঘটলে ব্যাঙ্কেরও উচিত যত দ্রুত সম্ভব অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষণ বা ইন্টারন্যাল অডিট করানো। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের দিকেও নজর দিতে হবে। নিয়মিত ভাবে ব্যাঙ্কগুলি এই কাজ করতে থাকলে টাকা ইঁদুরে কাটা ও এটিএম থেকে জালনোট, খেলনা নোট ও কাগজ বার হওয়া আটকানো সম্ভব।

