বাস বা ট্যাক্সি ভাড়া বাড়াতে নারাজ তৃণমূল, কিন্তু এই আমলেই বেড়েছে সরকারি বাস ভাড়া
বেসরকারি বাস মালিকদের ধর্মঘট সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম
- Total Shares
বালিগঞ্জ স্টেশন লাগোয়া সরকরি বাসস্ট্যান্ডে প্রতিদিন সকালবেলা সবজি বিক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকে। এরা শহরতলীর বিভিন্ন জায়গা থেকে ট্রেনে করে এসে বালিগঞ্জ স্টেশনে নেমে সেখান থেকে সরকারি বাস ধরে কলকাতার বাজারগুলোতে যান।
২০১৩ সালে এরকম এক সকালে বালিগঞ্জ বাস স্ট্যান্ডে পৌছিয়ে তাদের চোখে পড়ল ঝকঝকে একটি নতুন সরকারি বাস। ১০ নম্বরের রুটের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে সেই বাসটিকে। এই রুটের তারা ডেইলি প্যাসেঞ্জার। সাত পাঁচ না ভেবেই তারা চড়ে পড়লেন বাসটিতে। সমস্যার সূত্রপাত বাস চালু হওয়ার পরে ভাড়া দেওয়ার সময়। কন্ডাক্টর জানিয়ে দিলেন বাসের রুট নম্বর এস-১০। অর্থাৎ, এটা স্পেশাল বাস। এই বাসে চাপলে ১ টাকা করে বেশি ভাড়া দিতে হবে। এর পর থেকে তাঁদের রোজই এস-১০ বাসেই চাপতে হয়। ১০ নম্বর রুটের সেই বাস এখন অবলুপ্ত।
সহজ সরল বাংলায়, নতুন বাস নামিয়ে ১০ নম্বর রুটের ভাড়া বাড়িয়ে নিল সরকার। বাসের নম্বর বদলে এস ১০ করল। কিন্তু সে ক্ষেত্রে পুরোনো ১০ নম্বর রুটের বাসগুলো (যার ভাড়া কম ছিল) আর পথে নামল না। শুধুমাত্র ১০ নম্বর রুটই নয়। কলকাতার প্রতিটি রুটেই নতুন বাস নামিয়ে বাসের নম্বর বদল করে সরকার প্রতি স্টেজে ১ টাকা করে বাস ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে।
শেষ সাত বছরে তিন বার বেড়েছে সরকারি বাসের ভাড়া
২০১১ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছিল তৃণমূল সরকার। পরের সাত বছরে বেসরকারি বাস ও ট্যাক্সির ভাড়া বেড়েছে মাত্র একবার। জনদরদী সরকার জনগণের কথা ভেবে গাড়ি ভাড়া বাড়াতে নারাজ। কিন্তু সেই সরকারই তাহলে কী ভাবে গত সাত বছরে তিন তিন বার সরকারি বাসের ভাড়া বাড়িয়ে দিল।
একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে যে এই তিনবারের মধ্যে সোজা পথে সরকারি বাস ভাড়া বেড়েছে মাত্র একবারই - ২০১২ সালের ৩১ অক্টোবর যখন বেসরকারি বাস ও ট্যাক্সির ভাড়াও বেড়েছিল। বাকি দু'বার বাড়িয়েছে ঘুর পথে। একবার সরকারি বাসের ভাড়া বাড়ানো হল খুচরো সমস্যার সমাধানের কথা বলে। সেই সময় সরকারি বাসে ভাড়ার বেশ কিছু স্টেজে ৫০ পয়সার চল ছিল। যেমন সাড়ে সাত টাকা বা সাড়ে আট টাকা এবং সেগুলোকে বাড়িয়ে আট এবং ন’টাকা করে দেওয়া হল। এর পর নতুন লো-ফ্লোর বাস নামিয়ে বাসের নম্বর পরিবর্তন করে আবার বাড়িয়ে দেওয়া হল বাস ভাড়া। পুরোনো বাসগুলো বা পুরোনো নম্বরের বাসগুলো আর পথে নামল না।
একই অবস্থা অটোর ক্ষেত্রেও। ২০১১ সালে তৃণমূল সরকারে আসার কয়েক মাসের মধ্যেই প্রথমবার অটো ভাড়া বেড়েছিল। পয়লা আগস্ট কলকাতা পুলিশের এলাকা বিস্তৃত হয়। আর সেদিন থেকেই প্রথমবার অটো ভাড়া বাড়ে। কলকাতা পুলিশ এলাকায় চারজনের বেশি যাত্রী অটোতে তুলতে পারা যায় না। রাজ্য পুলিশের অধীনে এলাকাগুলোতে সেধরণের কোনও বিধিনিষেধ নেই। তাই কলকাতা পুলিশের এলাকা বিস্তৃত হলে যাত্রী সংখ্যা কমে যাবে - এই অজুহাতে ভাড়া বাড়ায় অটো ইউনিয়নগুলো। এর পর প্রতি বছরই অটো ভাড়া বৃদ্ধি হয়ে চলেছে।
বেসরকারি বাস মালিকদের ডাকা ধর্মঘট সফল হবে না
অটো ভাড়া সরকার নয় সংশ্লিষ্ঠ রুটের ইউনিয়নগুলো ঠিক করে। কিন্তু সরকার তৃণমূলের। আবার প্রতিটি অটো রুটের ইউনিয়ন এখন তৃণমূলেরই দখলে। তৃণমূল যদি বেসরকারি বাস বা ট্যাক্সির ক্ষেত্রে জনদরদী হয়ে উঠতে পারে তাহলে তৃণমূলের অটো ইউনিয়নগুলো জনদরদী হয়ে উঠতে পাচ্ছে না কেন?
ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ৭২ টাকা হওয়ার পরে এবার ধর্মঘট ডাকতে বাধ্য হয়েছেন বেসরকারি বাস ও মিনিবাস সংগঠনগুলো। ২০১২ সালে যখন শেষ বার বাস ভাড়া বৃদ্ধি করা হয় তখন ডিজেলের দাম ছিল লিটার প্রতি ৫২ টাকা মতো। এখন ৭২ টাকা। মধ্যবর্তী সময়তে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়ে লাভের অঙ্ক বৃদ্ধির চেষ্টা করছিলেন বাস মালিকেরা। কিন্তু গত কয়েকমাসে ডিজেলের দাম উত্তরোত্তর বৃদ্ধি হওয়ার পরে এই পদক্ষেপগুলো আর কাজে আসছে না।
ধর্মঘট ডেকেছেন বেসরকারি বাস ও মিনিবাস মালিকরা। কিন্তু তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। কলকাতার অধিকাংশ বাসই রাতের বেলা রাস্তায় পার্ক করা থাকে। ইতিমধ্যেই, পুলিশ হুমকি দিতে শুরু করে দিয়েছে যে সারাদিন ধরে রাস্তায় বাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেওয়া যাবে না। দাঁড়িয়ে থাকলে মামলা রুজু করা হবে। এমনকি প্রয়োজনে বাস তুলেও নেওয়া হবে। এই ভাবে বাস মালিকদের বাধ্য করা হচ্ছে তাঁরা যেন নির্দিষ্ট বনধের দিনও বাস নামান।
এই পরিস্থিতিতে থেকে সমাধান সূত্র কী? সূত্র একটাই, বাস ভাড়া বাড়াতে খোদ মুখ্যমন্ত্রীকে রাজি করাতে হবে।
বিড়ালের গলায় ঘণ্টাটা বাঁধবে কে?

