ভাগাড়ের মাংস নিয়ে হইচই সংবাদমাধ্যমে, আমরা কি উদ্বিগ্ন?
খাবার নিয়ে বাঙালির ভাবনা বোঝা যায় সমুদ্রে গেলে
- Total Shares
রাস্তার ধারে যাঁদের খাওয়াদাওয়া করার অভ্যাস বা বদ-অভ্যাস রয়েছে, তাঁরা একটা শব্দবন্ধের সঙ্গে বেশ পরিচিত: কাউয়া বিরিয়ানি। মানেটা অতীব সরল, মুরগির দাম বেশি বলে কাকের মাংস পরিশুদ্ধ করে তার তেতোভাব দূর করে (কাকের মাংস কে খেয়ে দেখে তা তেতো বলে ঘোষণা করেছে তা জানা নেই) সেই মাংস দিয়ে তৈরি বিরিয়ানি, যা দামে বেশ সস্তা। রাস্তার ধারে সেই সব বিরিয়ানি বেশ ভালোই বিক্রি হয়।
কাউয়া বিরিয়ানিতে যে মাংস দেওয়া হয়, তা আসলে রোগে বা অন্য কোনও ভাবে মরা মুরগির মাংস। বড় পোলট্রি ফার্মগুলোতে অনেক মুরগিই বিক্রির আগে মরে যায় গরমে বা রোগে ভুগে বা অন্য কোনও কারণে। রোজই সকালে দেখা যায় বেশ কয়েকটি করে মুরগি মরে আছে। কখনও আবার একটি খাঁচার সবকটি মুরগিও মারা পড়ে। মালিকদের জানিয়ে বা তাঁদের অলক্ষ্যে সেই সব মুরগি জলের দরে বিক্রি করে দেন খামারের কর্মীরা। নির্দিষ্ট লোক এসে তাঁদের কাছ থেকে সেই সব মুরগি জলের দরে কিনে নিয়ে যান। তাঁরা সেগুলি বিক্রি করে দেন বিভিন্ন জেলাশহর ও কলকাতায়। শুধু বারাসতেই এই রকম ভাবে প্রতিদিন কয়েকশো কেজি মরা মুরগি বাজারের তুলনায় অর্ধেকেরও কম দামে বিকোয় কলকাতায়।
এতটা বিস্তারিত না জানলেও, কোনও জাদুবলে যে অত সস্তায় বিরিয়ানি দেওয়া সম্ভব নয়, সে কথা জানেন খাদ্যরসিকরা, তার পরেও তাঁরা তা খেয়ে থাকেন।
কাউয়া বিরিয়ানিতে যে মাংস দেওয়া হয়, তা আসলে রোগে বা অন্য কোনও ভাবে মরা মুরগির মাংস
মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য রাখা বরফ দিয়ে নিত্যদিন শহরের রাস্তায় বিক্রি হচ্ছে শরবৎ, লোকে জেনেশুনেই সেই বিষ পান করছেন। ১০ টাকা দিয়ে শরবৎ না খেয়ে বোতলবন্দি জলও তাঁরা পান করতে পারেন, কিন্তু করেন না।
কলকাতার কাছাকাছি যে সব সৈকতে বাঙালি সপ্তাহান্তে গিয়ে থাকেন সেখানে দেখুন, পচা মাছ কড়া করে ভেজে বিক্রি হচ্ছে, লোকে হামলে পড়ে খাচ্ছে একটু সস্তা হচ্ছে বলে। অনেকে আবার কামড় বসিয়ে চিবতে চিবতে বলেন, “এখানে এটাই নিয়ম, পচামাছ ভাজার স্বাদই আলাদা।” ফুচকারও নাকি স্বাদ ভালো হয় বিক্রেতার চর্মরোগ থাকলে। তাই পচা মাংস নিয়ে মধ্যবিত্ত মানসিকতার বাঙালির কতটা হেলদোল আছে বলা মুশকিল।
তবে এবার বিষয়টি নিয়ে একটু বেশিই নাড়াচাড়া শুরু হয়েছে। যাঁরা নামী-দামি রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া করেন, এখন তাঁদের মনেও প্রশ্ন জাগছে, তাঁরা বেশি দাম দিয়েও কি ভাগাড়ে ফেলে যাওয়া পশুর মাংস খেয়েছেন? বিভিন্ন খবরের কাগজ ও টিভি চ্যানেলের খবর অনুযায়ী, ভাগাড়ে ফেলে যাওয়া প্রাণীর মাংস ও রোগে ভোগা প্রাণীর মাংসের ক্রেতার তালিকায় নাকি নামি রেস্তোরাঁ ও ফুড-চেনও রয়েছে।
ভালো দোকানে খাচ্ছেন বলে যাঁরা নিশ্চিন্ত ছিলেন, এবার তাঁরাও ক’দিন ভাববেন, তারপরে খেতে বসে ওয়েটারদের দু’একটা প্রশ্নও করবেন, যেমন মিষ্টির দোকানে গিয়ে বলেন, “দাদা, টাটকা তো? বাচ্চা খাবে।” বাচ্চাও বড় না, মিষ্টির দোকানের মালিকও কোনও দিন বাসি মিষ্টি বিক্রি করেন না। স্বাস্থ্য নিয়ে বাঙালি উদ্বিগ্ন নয় কোনও দিনই, কিন্তু এখানে একটা প্রশাসনিক দিকও রয়েছে।
বেশিরভাগ ব্যবসায়ী কোনও দিনই ক্রেতাদের স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবিত নন
যে কোনও ভাগাড়ে গেলেই দেখা যায়, লোকজন কী সব খুঁজছেন। দুর্গন্ধের আখড়া থেকে তাঁরা তাঁদের প্রয়োজনীয় বোতল, ছিপি, ধাতুর খণ্ড এ সব খুঁজে নিতে থাকেন। তারপরে সেগুলো বিক্রি করেন। অনেকে মৃত পশুর চামড়াও ছাড়িয়ে নেন বিক্রির জন্য। কিন্তু সেখান থেকে যে মাংসও বিক্রি হয়, এমন খবর প্রকাশিত হওয়ার পরেই প্রশাসনের সম্বিৎ ফেরে, কয়েকজনকে জেরা করা শুরু হয়। তারপরে কেঁচো খুঁড়তে কেউটে! কলকাতায় এমন মাংস আসে শুনে যখন রাস্তার ধারে সস্তার রেস্তোরাঁয় অভিযানের কথা ভাবছে পুরনিগম, তখন আরও মোক্ষম খবর—পচা মাংসের ক্রেতাদের তালিকায় নাকি রয়েছে নামীরাও।
বেশিরভাগ ব্যবসায়ী কোনও দিনই ক্রেতাদের স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবিত নন, কোনটা টাটকা মাংস আর কোনটা পচা, তা সবসময় বোঝা সম্ভব হয় না ক্রেতাদেরও। তাই উপায় একটাই, স্থানীয় পুরসভাগুলোকে আরও বেশি করে আচমকা অভিযান করতে হবে। কঠোর পদক্ষেপ করতে হবে অভিযোগের প্রমাণ পেলে।

