গবেষণা বলছে নিয়ন্ত্রিত পরিমাণে কাজু শরীরের পক্ষে খুবই উপকারী, মোটা হওয়ার সম্ভাবনাও নেই
কাজু খেলে কোলেস্টরল বাড়ে না, বরং শরীর সুস্থ থাকে
- Total Shares
বলুন তো বাদামের মধ্যে কোন বাদামটি সবচেয়ে বেশি সমালোচিত? নিঃসন্দেহে কাজুবাদাম। চিরকাল কাজুবাদাম অনেক বদনাম কুড়িয়েছে। কাজুবাদাম খেতে খুবই সুস্বাদু তবে তা বেশি খেলে কোলেস্টরল হতে পারে -এই ভুল ধারণাটার জন্য কাজুবাদামের এতো বদনাম।
আর এমন একটা সুস্বাদু খাবার কী না শরীরের জন্য ক্ষতিকর? ভুল।
আমি নিজে যেমন প্রচুর কাজু খাই তেমনই অন্যদেরও খেতে বলি, তাই কোনও রকম দুশ্চিন্তা না করেই কাজুবাদাম খান। এমনকি আমি যখন খুব তাড়াহুড়োয় থাকি হাতের কাছে কোনও খাবার না থাকলে ব্যাগের মধ্যে কিছুটা কাজুবাদাম পুড়ে বেরিয়ে পরি। সম্প্রতি 'নিউট্রিশন' নামক জার্নালটিতে চিকিৎসক ভি মোহন ও চেন্নাইয়ের মাদ্রাজ ডায়াবিটিস রিসার্চ ফাউন্ডেশন (এমডিআরএফ)-এ তাঁর কয়েকজন সহকর্মী যৌথভাবে একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন যে কাজুবাদাম শরীরের ওজন বৃদ্ধি করে না বা কাজুবাদাম খেলে শরীরের কোনও ক্ষতি হয় না বা মানুষ তাড়াতাড়ি মরে যায় না। বরং কাজুবাদাম খেলে আমাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে।
একদল মানুষ যাঁদের বয়স, জীবনধারণ সহ অন্যান্য দিকে অনেকখানি মিল রয়েছে তাঁদের উপর গবেষকরা একটি গবেষণা চালায়। প্রায় ১২ সপ্তাহ ধরে এঁদের মোটামুটি ৩০ গ্রাম করে কাজুবাদাম খেতে দেওয়া হয়। ১২ সপ্তাহের পর দেখা যায় গেল যে তাঁদের সিস্টোলিক রক্তচাপ কমেছে, শরীরে পুষ্টিকর কোলেস্টরলের মাত্রা বেড়েছে, তাঁদের শরীরের ওজন বাড়েনি এবং গ্লুকোজ বা ক্ষতিকর কোলেস্টরলের মাত্রাও বাড়েনি।
এটা কীভাবে সম্ভব হল? কাজুবাদামের মধ্যে মোনো উনস্যাটুরেটেড ফ্যাটস (এমইউএফএ) রয়েছে। এর স্নেহপদার্থটি আমাদের শরীরের পক্ষে উপকারী। আমাদের রোজকার খাবারে অনেক কম পরিমাণে এমইউএফএ থাকে যার অভাবে হার্ট দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। অন্যান্য বাদামের তুলনায় কাজুবাদামে অনেক কম পরিমাণে স্নেহ পদার্থ থাকে। প্রতি ১ আউন্সে ১৩ গ্রাম স্নেহ পদার্থ থাকে।
কাজুতে একটি দারুন শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট জিয়াজানথিন রয়েছে
দ্বিতীয়ত, যদিও কাজুবাদামে প্রায় ২০ শতাংশ সম্পৃক্ত স্নেহপদার্থ (স্যাচুরেটেড ফ্যাট) থাকে তবে তার বেশিরভাগটাই হল স্টেরিক অ্যাসিড ধর্মী যা রক্তে থাকা লিপিডের সঙ্গে মিশে তেমন একটা প্রভাব ফেলে না।
তাই কাজুবাদাম খেলে কোলেস্টরল বেড়ে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। যাঁরা কাজুবাদামের গুনাগুন সম্বন্ধে তেমন কিছু জানেন না তাঁদের বলি কাজুবাদামে কোলেস্টরল নেই বললেই চলে বরং কাজুবাদাম শরীরে থাকা ক্ষতিকর কোলেস্টরলের মাত্রা কম হয়। এছাড়া কাজু খেলে শরীরে থাকা পুষ্টিকর কোলেস্টরোলের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।
এছাড়াও কাজুবাদামে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং উদ্ভিদজাত স্টেরল অ্যাসিড থাকে। এমনকি কাজুবাদামে প্রচুর পরিমাণে প্রোএনথোসাইনিডিন্স বা ফ্লাভানলস থাকে। প্রোএনথোসাইনিডিন্স বা ফ্লাভানলস ক্যান্সার আক্রান্ত কোষগুলোকে নতুন কোষে ভাগ করে না। কাজুতে ভিটামিন ই, কে ও বি-৬, তামা, ফসফরাস, দস্তা, ম্যাগনিসিয়াম, লোহা এবং সেলেনিয়াম আছে।
দাঁত ও মজ্জার জন্য ফসফরাস অতন্ত্য উপকারী। সেলেনিয়াম ক্যান্সারের আশঙ্কা কম করে। দস্তা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং থাইরয়েড গ্রন্থিটিকে ঠিকঠাক কাজ করতে সাহায্য করে। আমরা যেসব খাবারদাবার খাই তার থেকে শরীরের প্রচুর ফ্রি রেডিক্যালের সৃষ্টি হয় যা শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর। তামা শরীরকে এসব ফ্রি রেডিক্যাল থেকে মুক্ত করে। এছাড়াও শরীরে লোহার আত্তীকরণ হতে সাহায্য করে যার অভাব হলে মজ্জার অসুখ যেমন অস্টিওপরোসিস হতে পারে, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন হতে পারে এবং রক্তাল্পতা (অ্যানেমিয়া) দেখা দিতে পারে।
তামা নতুন ত্বক তৈরি হতে সহায়তা করে এবং আমাদের চুলে যে মেলানিন থাকে তাকে ঠিকঠাক ক্ষরণ হতে সাহায্য করে, এতে চুলের জেল্লা বাড়ে। পাশাপাশি ম্যাগনেসিয়াম শরীরে রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে, শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, স্নায়ু ভালো রাখে এবং অস্তিকে আরও শক্তিশালী বানায়। মস্তিস্ক সুস্থ রাখতে এবং শরীরে কোথাও কেটে গেলে যাতে দ্রুত রক্ত জমাট বাঁধতে পারে সে সাহায্য করে কাজু। আমরা খাবার থেকে যে ভিটামিন এ, ডি, ই ও কে পাই কাজু খেলে শরীরে তা আত্মীকরণ হতে সহায়তা করে। কাজুতে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টিকর স্নেহ পদার্থ থাকে যা আমাদের শরীরে গিয়ে প্রয়োজনীয় ফ্যটি অ্যাসিড তৈরি করে যা আমাদের মস্তিস্ক ভালো রাখে এবং রক্ত জমাট বাঁধতে সহায়তা করে।
এখানেই শেষ নয়। কাজুতে একটি দারুন শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট জিয়াজানথিন রয়েছে যা আমাদের চোখের রেটিনার উপর একটি সুরক্ষা স্তর তৈরি করে যা আমাদের চোখকে ক্ষতিকর আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি থেকে সুরুক্ষিত রাখে। বার্ধক্যের কারণে আমাদের পেশির ক্ষয় হয় এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্টটি পেশির ক্ষয় রোধ করে ও আমাদের সুস্থ রাখে।
অন্যান্য বাদামের তুলনায় কাজুতে যদিও খুব অল্প পরিমাণে ফাইবার থাকে কিন্তু তাও কাজু আমাদের পেটকে দীর্ঘ সময় ধরে ভরিয়ে রাখে এবং এর ফলে বাড়ে বাড়ে খিদে পায় না। তাই অতিরিক্ত খাবার খেলে আমাদের শরীরে যে কার্বোহাইড্রেড যায় এখন যার ফলে মোটা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে সেটাই রোধ হয় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে।
কাজুর এই গুনের কারণেই গবেষণাটিতে দেখা গেছে যে এই বাদামটি উচ্চ ক্যালোরি যুক্ত হলেও এটি খেলে ওজন বাড়ে না। এক আউন্স কাজুতে থেকে আমরা ১৬০ ক্যালোরি এবং পাঁচ গ্রাম মতো প্রোটিন পাই।
তাই কাজু খেলে শরীরে ওজনের উপর কোনও রকম খারাপ প্রভাব পড়ে না। নিয়ন্ত্রিত পরিমাণে কাজু খাওয়া শরীরের পক্ষে ভালো। তবে যে কাজু তেল বা ঘি-য়ে ভাজা নয় এবং নুন ছাড়া কাজুই খাওয়া উচিত।
তাই নিশ্চিন্তে কাজু খান।
লেখাটি ইংরেজিতে পড়ুন

