বাঙালির রসনা তৃপ্ত করতে কী ভাবে বিদেশি কুইজিন আসছে কলকাতায়
বিদেশে গিয়ে সে দেশের খাবার খেতে খরচা অনেক, সেই খাবার কলকাতায় খেলে একটু দাম তো দিতেই হবে
- Total Shares
ভূতের রাজার কাছে গুপী-বাঘা বর চেয়েছিল, 'যা খুশী খাইতে পারি/ যেখানে খুশী যাইতে পারি'। খাওয়া ও ঘোরা বাঙালির জীবনে অপরিহার্য। বছরে এক বার ঘুরতে তো যেতেই হবে, শিমুলতলা হলেও। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি কলকাতায় রেস্তোরাঁ মানে হচ্ছে কয়েকটি চিনে রেস্তোরাঁ, বিরিয়ানি ও মোগলাই, খানিকটা উত্তর ভারতীয় (বিশেষত পঞ্জাবি) এবং বাঙালি রেস্তোরাঁ। এর মধ্যে বিদেশি বলতে চিনে রেস্তোরাঁ।
কলকাতায় চিনেদের আগমন ধরা যায় ১৯ শতকের শেষদিকে। তাদের একচেটিয়া ছিল দাঁতের চিকিৎসা, কাঠের কাজ ও জুতোর ব্যবসা। চিনে জুতোর ব্যবসা আজও টিমটিম করে চলে বৌবাজার অঞ্চলের জুতোর দোকানগুলোতে। গ্লোবালাইজেশনের সামনে আর কিছু টিকতে না পারলেও, চিনে খাবার আজও স্বমহিমায় বিদ্যমান, যদিও রান্নাটা কখনওই তাদের প্রাথমিক পেশা ছিল না।
টেরিটি বাজারে চায়না টাউন তৈরি হয় যার পরবর্তী এক্সটেনশন ট্যাংরা। টেরিটি আজও কলকাতার সবচেয়ে অথেনটিক চিনে খাবার হলেও, গ্লোবালাইজেশন ছুঁয়েছে আরও অনেক কিছু। বাঙালির রসনা ডালপালা মেলেছে দেশ থেকে দেশান্তরে।
থাইল্যান্ডের খাবার বাঙালি খাবারের খুব কাছাকাছি। ভাত দু'ক্ষেত্রেই কমন। থাই ফুডও মশলাদার। [সৌজন্য: বান থাই]
বিগত পাঁচ-সাত বছর ধরে দেখছি বিভিন্ন দেশের খাবার কলকাতায় পাওয়া যাচ্ছে। রসনাতৃপ্তির জন্য এখন পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে যেতে হয় না। কলকাতায় পাওয়া যায় কিউবান, ক্যারিবিয়ান, ইথিওপিয়ান, ফিলিপিনো থেকে পেরুভিয়ান কুইজিন। তার সঙ্গে আছে মঙ্গোলিয়ান, ভিয়েতনামিজ, লেবানিজ ও আফগানি খাবারও।
আমার মতে তার প্রথম কারণ বাঙালি অত্যন্ত খাদ্যরসিক। যেমন কলকাতার মারোয়াড়িদের সঙ্গে দেশের অন্যান্য শহরের মারোয়াড়িদের আকাশ-পাতাল তফাত। এখানকার মারোয়াড়িরা গতানুগতিক গোঁড়ামি কাটিয়ে অনায়াসে নন-ভেজ খান। কলকাতায় এলেই বোধহয় জল-হাওয়ায় সবার স্বাদটা বদলে যায়। বছরের পর বছর সেই একই চাইনিজ বা নর্থ ইন্ডিয়ান খেয়ে খেয়ে সকলের মুখ পচে গেছে। আমাদের এবার নতুন স্বাদ চাই।
কী সেই স্বাদ, সেটা আগে খুঁজে পাওয়াটা কঠিন হলেও, ইন্টারনেটের জমানায় পৃথিবী হাতের মুঠোয়। এক পলকে পাওয়া যায় জাপানি বা লেবানিজ রেসিপি। আমরা অনেক বেশি জানতে পারছি। জাপানি খাবার কী দুর্দান্ত সুস্বাদু। কিন্তু সুশি বা সাশিমি যে কলকাতায় বিক্রি হতে পারে এবং জনপ্রিয় হতে পারে, এটা কিন্তু ইন্টারনেট ছাড়া আমরা জানতে পারতাম না। কলকাতায় 'ফিজি' নামে একটি রেস্তোরাঁ আছে। এ ছাড়া আছে প্যান এশিয়া সোনার বাংলা। ওদের একটা অত্যন্ত বিলাসবহুল জাপানি বিভাগ আছে।
জাপানি কিচেন শেফদের ডিজাইনার বলে
আমরা যেমন বাইরে যাচ্ছি, বিদেশি পর্যটকরাও আসছেন। তাঁরা এখানে এসে নিজেদের দেশের মতো বা তার কাছাকাছি স্বাদ খুঁজছেন। ফলত, একটা চাহিদা তৈরি হচ্ছে। যেটা এ ধরণের রেস্তোরাঁ করবার একটা রাস্তা খুলে দিচ্ছে।
আগে বিলেত বলতে আমরা বুঝতাম ইংল্যান্ড। মাসের পর মাস জাহাজে কাটিয়ে কেউ বিলেত যাবে মানে এলাহি ব্যাপার। স্বাধীনতার পর আমার জেঠু যখন প্রথমবার বিলেত গিয়েছিলেন, সারা পাড়ার লোক এসেছিল তাঁকে বিদায় জানাতে। প্লেনে ওঠাও আগে ছিল অ্যাচিভমেন্ট। এখন প্লেনে চড়াটা প্রায় দৈনন্দিন ঘটনা, বিদেশে যাওয়াটা জলভাত।
খরচ কমেছে অনেক। পৃথিবী অনেক ছোট, অনেক কাছে হয়ে গেছে। আমি নিজের কোথাই বলছি, আমি প্রায় সারা পৃথিবী ঘুরেছি। আমি যেখানে গেছি, সেখানকার খাবার খাবার খেয়ে দেখেছি। ইউরোপিয়ান কুইজিন মানে কিন্তু শুধু পিৎজা বা পাস্তা নয়। আরও অনেক কিছু আছে। সেগুলো আমার ভাল লেগেছে।
আমার মতো অনেকেই আছে, যারা বাইরে যাচ্ছে এবং নতুন ধরণের খাবার খেতে চাইছে - মঙ্গোলিয়ান ফুড, কোরিয়ান ফুড....। আমরা যত বিদেশে যাচ্ছি, সেই খাবারটা খেতে চাইছি। চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এই ডিম্যান্ড-সাপ্লাইয়ের সেতু বাঁধার কাজটা করছেন রেস্তোরাঁ মালিকরা।
ধরা যাক থাই ফুড। থাইল্যান্ড কলকাতা থেকে দু'ঘণ্টার উড়ান। সুতরাং দিল্লি বা মুম্বাইয়ের চেয়ে আমাদের যাওয়া-আসা অনেক বেশি সোজা। থাইল্যান্ডের খাবারও বাঙালি খাবারের খুব কাছাকাছি। ভাত দু'ক্ষেত্রেই কমন। বাঙালিরা একটু মশলাদার খাবার খায়। থাই ফুডও সেরকমই। নানারকম গ্রেভি, গ্রিন কারি, রেড কারি - যেটা বাঙালিরা পছন্দ করেন। কলকাতার প্রথম অথেন্টিক থাই রেস্তোরাঁ ওবেরয় গ্র্যান্ডের বান থাই। ছোটবেলায় যখন বাবার সঙ্গে গেছি, মনে হয়েছে একটা অদ্ভুত স্বাদ পেয়েছি, যেটা রোজ পাই না। থাই খাবার এতটা জনপ্রিয় হয়ে গেছে, যে কোনও চিনে রেস্তোরাঁ চেষ্টা করে মেনুতে একটা দুটো থাই আইটেম রাখার। আমরাও রেখেছি।
লোকে বাইরে যাচ্ছে, সে খাবারটা এখানে এসেও চাইছে। কতবার মানুষ বিরিয়ানি আর চিলি চিকেন খাবে? মাঝেমধ্যে তো পার্সি খাবার ইচ্ছে করবে। যেটা কাছাকাছি, কিন্তু একদম নয়। কিংবা পাকিস্তানি বিরিয়ানি। ভারতীয় বিরিয়ানির থেকে আলাদা কিন্তু কাছাকাছি। চাইনিজ খেতে খেতে জাপানিজ খেতে ইচ্ছে হতেই পারে। খাবার কিন্তু একই, যেমন নুডলস। জাপানিরা নুডুলসকে সোবা বলে। একটু মোটা হয়, স্বাদ একটু আলাদা কিন্তু কাছাকাছি।
সুশি বানানো কিন্তু সহজ নয় [সৌজন্য: জাস্ট এশিয়ান]
এর ফলে যেটা আমরা পাচ্ছি, সেটা হল প্যান এশিয়ান রেস্তোরাঁ। মেনল্যান্ড চায়না এশিয়া কিচেন, যেটা অঞ্জনদা (অঞ্জন চট্টপাধ্যায়) করেছেন। আইটিসি সোনার-এ আছে প্যান এশিয়া। আমি সেদিন খেতে গেলাম পাপায়্যা বলে একটা রেস্তোরাঁয়। সেখানে চাইনিজ আছে, থাই আছে, জাপানি ও কোরিয়ান ফুডও আছে। এখন বেশিরভাগই সেই পথে হাঁটছে।
এই সমস্ত বিদেশি রান্নার রেসিপি আলাদা, উপকরণও আলাদা। সেগুলো আমদানি করতে হয়। কোরিয়ান সসগুলো কলকাতায় পাওয়া যায় না। চাইনিজ কুইজিন পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় কুইজিন। সুতরাং তাদের সসগুলো এখানে তৈরি হয়। এ দেশে উৎপাদনের জন্য একটা মিনিমাম ক্যাপাসিটি দরকার, অন্তত এতটা বিক্রি হবে। বাকিগুলোর ক্ষেত্রে এখনও এতটা বাজার তৈরি হয়নি যে তারা এখানে সব উৎপাদন করবে। সুতারং বেশিরভাগ আমদানি করতে হয়। তার জন্য দাম একটু বাড়ে, কিন্তু ভালো জিনিস জিনিস তো দাম দিয়েই খেতে হয়। এখন কোরিয়ায় গিয়ে কোরিয়ান খাবার খেতে হলে একরকম খরচা। কিন্তু সেই খাবরটাই কলকাতায় বসে খেতে গেলে তার জন্য একটা খরচ লাগবেই। যেটা আর পাঁচটা সাধারণ ভারতীয় জনপ্রিয় খাবারের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হওয়াটা আমি বলব একদম ন্যায়সঙ্গত।
জাপানি কিচেন শেফদের ডিজাইনার বলে, সুশি যারা বানান তাঁরা শুধু সুশিই বানান। দেখে মনে হয় বানানোটা খুব সহজ। সুশিতে যে ভাতটা ব্যবহার হয়, সেটা আলাদা - স্টিকি রাইস। প্রথমে সব আলাদা আলাদা করে রান্না করা হয়। তারপর একটার পর একটা লেয়ার করে রোল করে একটা সি উইড দিয়ে র্যা লোপিং করা হয়। এবার এর একটা ধাপেও যদি কোনও ভুল হয়, তাহলে কিন্তু সুশিটা নষ্ট হয়ে যায়। একটা সুশি প্লেট মানে কখনোই ৫০টা দেওয়া হয়না ,খুব বেশি হলে তিনটে কী চারটেই হয়। প্রথমত, তাতেই পেট ভরে যায়। দ্বিতীয়ত, এটা বানানো বেশ কঠিন। পুরোটাই হাতের কাজ, একটা শিল্প। এর জন্যে দাম দিতেই হবে।
এর পর হচ্ছে শেফ। এবার আফ্রিকান ফুডের জন্য আফ্রিকা থেকে তো কেউ শেফ আনতে পারবে না! এখানেই তৈরি করতে হবে। আমি কি ভাবে করি - আমার যদি কোনও বিদেশি ডিশ করতে হয়, আমি প্রথমে সে দেশে গিয়ে খাবারটা খাই। এরপর রেসিপিটা ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করি। আমার শেফকে প্রশিক্ষিত করা হয় সেই রেসিপিটা বানাবার জন্য। প্রথমবার কখনোই একদম নিখুঁত হয় না। নানারকম পারমুটেশন-কম্বিনেশন করে খাবারটায় একটা নৈপুণ্য ও স্বাদ আনা হয়।
ওসাকাতে আমি যে খাবারটা খাচ্ছি, হুবুহু সেটাই আমি কলকাতার কোনও জাপানি রেস্তোরাঁয় খাব এমনটা আসা করা উচিত নয়। সবই এক থাকবে, কিন্তু চিনের চাইনিজ আর এখানকার চাইনিজের মধ্যে যেমন ফারাক আছে, সেই ফারাকটা থেকেই যাবে। সেটা ফাইনাল টাচটার জন্য।
আগামী বছরে আরও অনেক কুইজিন কলকাতায় ঢুকবে, আর সেটা ভালই হবে। লোকের খাবারের স্বাদটা পাল্টাচ্ছে। হয়তো, চাওম্যানকেও ভবিষ্যতে প্যান এশিয়ান কুইজিন নিয়ে ভাবতে হবে।

