ফ্যাশনের নতুন নাম কাট আউট জিনস, কী ভাবে জগৎ মাতাকে দূষণ থেকে বাঁচাবে?
এই জিনসটি বানাতে অত্যন্ত কম কাপড় ব্যবহার করা হয়
- Total Shares
নতুন প্রজন্মের কাঁধে এক বিরাট দায়িত্ব। এমন একটি পৃথিবী আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি যা প্রায় পতনের দোর গোড়ায়। যা আমাদের পৃথিবীকে দূষিত করছে তার মধ্যে ফ্যাশন শিল্প চতুর্থ স্থানে রয়েছে। বিশেষ করে ডেনিম শিল্প 'জগৎ মাতাকে' অনেক বেশি মাত্রায় দূষিত করছে। গ্রিনপিস সংস্থাটির মতে আমরা যে রংচটা ও ছেঁড়াখোঁড়া জিনস পড়ি সেটা বিভিন্ন রাসায়ন যেমন ক্যাডমিয়াম, সীসা ও পারদ দিয়ে ধুয়ে তৈরি করা হয়।
কথাটা শুনে ভয়ে লাগছে? ভয় পাবেন না। লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি ব্র্যান্ড যার নাম কারমার ডেনিম হয়তো অজান্তেই এই ধরণের কেতাদুরস্ত 'এক্সট্রিম কাট আউট জিনস' বানিয়েছে। এই ধরণের জিনসগুলি বানাতে এতটাই কম কাপড় ব্যবহার করা হয়ে থাকে যে এগুলি বানাতে কাপড়ের সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে। বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে নিজেই দেখুন।
এই দেখুন
ফ্যাশন সর্বদাই খুব অদ্ভুত। আমার এখনও মনে আছে আমি একবার একটা জামা (শ্রাগ) পড়েছিলাম যেটা দেখে আমার বাবা আমার দিকে বিস্ময় তাকিয়ে ছিলেন। আমার মনে হয়েছিল আমি ঠিক কী পরে আছি সেটা বাবাকে বুঝিয়ে বলা দরকার। “বাবা এটাকে শ্রাগ বলে। এটা একধরণে ছোট গরম জামা।” আমার বাবা উত্তরে বলেছিল "কিছুটা গুটিয়ে যাওয়া কম্বলের মতো দেখতে বলেই কী জামাটার এমন নাম?"
বিশেষ করে দিদিমারা ছেঁড়াফাটা জিনস দেখলে একটু বেশি সমালোচনা করেন। তাঁরা এমন একটা সময় বড় হয়েছে যখন জামাকাপড়ে কোনও ছেড়াফাটা বা কোনও ফুটো থাকলে তা সেলাই করে ঠিক করে দেওয়া হতো। জামাকাপড়ে ইচ্ছে করে ফুটো করা হতো না। ২০০৮এর আর্থিক মন্দার জেরেই হয়তো ফ্যাশনের এই কায়দাটা শুরু হয়েছিল। যদি আপনাকে অনেক বেশি কাজ করতে হয়ে যার জন্য আপনি যোগ্য বেতনও বাচ্ছেন না, আপনার হাতে একটা পয়সাও নেই এবং মাথার উপর ছাদ টুকুও নেই তখন আপনার পোশাকসাকের ঠিক যেমন অবস্থা হতে পারে তার থেকে একটা ফ্যাশনের জন্ম নিয়েছিল। তখনই এই ধরণের ছেড়াফাটা জিন্স-এর প্রচলন শুরু হল। আশ্রয়হীন হওয়াটাই একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়ালো।
সম্প্রতি সেলিব্রিটিদের মধ্যে একটা নতুন ফ্যাশনের ঝোক উঠেছে। এই নতুন ফ্যাশনের জামাকে 'নগ্ন' জামা বলা হয়। ২০১৮র গ্র্যামি পুরস্কার অনুষ্ঠানে লেডি গাগার কথা মনে পরে কিংবা ২০১৬ সালের কানের অনুষ্ঠানে বেল্লা হাদিদের পোশাক কিংবা মেট গালা ও সেই মেট গালা অনুষ্ঠানের পরে ২০১৭ যে পার্টিটা হয়েছিল তার কথা। বেলা হাদিদ সব সময় এমন ধরণের পোশাক পড়েছেন যেটা পরনে থাকলে মনে হয় যেন উনি যেন কিছুই পরে নেই। এঁরা পারলে জেন একটি সাধারণ মেয়ে হয়ে কেন পারবে না? নিজেদের শরীরকে ভালো রাখতে এঁদের ব্যক্তিগত শিক্ষক আছে কিংবা ডায়েটিশিয়ান আছে যাঁরা সেলিব্রিটিদের খাবারের তালিকা ঠিক করে দেন অথবা লোক আছে যাঁরা এঁদের পোশাক বা সাজসজ্জার খেয়াল রাখেন। ভুলে যান যে আপনার কাছে এইধরণের কেউ নেই তবুও তাঁদের মতো পোশাক পরে আপনিও রূপকথার সেই রাজকন্যা হয়ে উঠতে পারেন যাকে দেখলে ছোটবেলায় আমাদের খুব হাসি পেত।
তাই ছোটবেলায় আমরা 'দা এম্পেরর'স নিউ ক্লোডস' নাম যে রূপকথার গল্পটা পড়েছিলাম সেটা এযুগে সত্যি হয়েছে। রূপকথার গল্পটিতে রাজা এমন একটা দামি পোশাক পড়তে চেয়েছিলেন যেটা পড়লে মনে হবে যে আসলে সে কিছুই পরে নেই।
দু'পাশে দুটো বড় পকেট আছে
মার্কিন ডলারের হিসেবে কারমার ডেনিমের কাট আউট জিনসের দাম হয় ১৬৮ অর্থাৎ ভারতীয় টাকার হিসেব করলে যার মূল্য হয় ১১,০০০ একটু বেশি।
সোশ্যাল মিডিয়ার পক্ষে সেটা একটা খুব ভালো দিন ছিল যেদিন ইনস্টাগ্রামে একজন লিখেছিলেন যে, “যাঁদের কোনও বাসস্থান নেই সেই সব মানুষের থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে ফ্যাশন চুরি করে পোশাক বানানো হয়েছে দেখে আমার ভীষণ হাসি পাচ্ছে।"
একজন টুইটারে লিখেছিলেন, “দয়া করে আমাকে কেউ বলুন যে যা কিছু হচ্ছে সেটা একটা হাসির খোরাক নয় কারণ একজন মানুষ খুব নির্বোধ হলেই একটা এই ধরণের একটা পোশাক কিনতে ১৬৮ ডলার খরচ করবেন।"
একজন মজা করে লেখেন যে, "এই ধরণের ছেড়াফাটা পোশাক বানাতে সেই সংস্থার হয়তো ৩০ সেন্টও খরচ পরে না।
পোশাকের সংস্থাটি বোধহয় 'কাটআউট' কথাটিতে খুব গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছে। 'কাটআউট' করতে গিয়ে সংস্থাটি পোশাকটিরতে শুধু জোড়ার সেলাইটি ও পশ্চাৎ আবরণ ছাড়া আর কিছুই রাখেনি।এমনকি পোশাকটি যেই মডেল পরে আছেন তিনিও জিনেস নিচে একটি অন্তর্বাস পরে আছেন।
তবে পোশাকটি পরিকল্পনার সময় জিনসের দুদিকে পকেটের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রাখতে ভোলেনি সংস্থাটি। কারণ যে সব সংস্থা খুব দামি জিন্স তৈরি করে না তাঁরা মহিলাদের জিন্স-এ পকেট রাখে না অথচ পুরুষদের জিন্স-এ পকেট থাকে। বাস্তবে মহিলারাও এই পোশাকটা কেনও পড়েন সেই দিকটা পুরুষ্ট ভেবেই দেখেন না। তবে এই জিন্স-এ মহিলাদের জন্যেও বড় দুটো পকেট রয়েছে। পোশাকটির বড় দুটো পকেট প্রথমেই চোখে পড়ে তার জন্য এক্সরে চোখ লাগে না।
তাই কখনও যদি পোশাক কেনার প্রয়োজন পড়ে অথচ হাত খালি পাশাপাশি জগৎ মাতার দূষণ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন তাহলে আমি বলবো একদম চিন্তা করবেন না। ব্যাঙ্ক-এ যত টাকা জমিয়েছেন সেসব তুলে ফেলুন ও এই জিন্সটা কিনে ফেলুন। আর যদি এই নতুন পোশাকটা পড়ে অসম্ভব উৎসাহিত হয়ে পড়েন তাহলে একবার নিজের দিদিমার বাড়ি থেকে ঘুরে আসুন।
শুধু এটুকুই আশা করি যে তিনি যেন প্রচণ্ড মানসিক ধাক্কা পেয়ে আপনার পশ্চাৎ-তে সজোরে তাঁর পা না চালিয়ে দেন।
লেখাটা ইংরেজিতে পড়ুন

