গয়নায় মজুরি ছাড়: চরম সঙ্কটে স্বর্ণশিল্পীরা

যে টাকা মজুরি ধরে তার উপরে ছাড় দেওয়া হচ্ছে, কারিগর কি সেই মজুরি পাচ্ছেন?

 |  3-minute read |   06-11-2018
  • Total Shares

যে কোনও উৎপাদন ক্ষেত্রে কাঁচামাল কেনা ও সব ধরনের খরচ-খরচার পরে তার দাম হিসাব করে তার উপরে মজুরি চাপিয়ে জিনিষটির বিক্রয়মূল্য স্থির করা হয়। তবে স্বর্ণশিল্পের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিতে কাজ হয় না।

আমাদের শিল্পক্ষেত্রে এ ভাবে কাজ হয় না। যাঁদের বড় বড় শোরুম আছে, তাঁরাই দাম ধার্য করে দেন। সেই রেট মেনে আমাদের কারখানায় কাজ করতে হয়।

halder_body_110618043530.jpgগয়নার দামের উপরে ছাড় দেওয়া হয় মজুরিতে (উপস্থাপনামূলক ছবি: সুবীর হালদার)

দ্বিতীয় কথা হল উৎপাদনের মূল্য (মেকিং চার্জ) কিসের উপরে নির্ভর করে? একজন কারিগরের যে খরচ-খরচা হয় সেই উৎপাদন খরচের উপরে। সর্বত্র সেটাই হওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের শিল্পেরর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে বাজারে কারিগরদের হায়তে সে ভাবে কাজ নেই। আমাদের পুরোনো কোটা সিস্টেম অনুযায়ী যে মজুরি পাচ্ছে তার হিসাব কষলে দেখা যাচ্ছে যে কারিগর প্রায় কিছুই পাচ্ছেন না।

আমাদের কাজ হল অ্যাসেম্বল করা। বিভিন্ন জায়গা ঘুরে এসে একটি জায়গায় শেষ বা ফিনিশ হয়।

এখন প্রশ্ন হল মজুরি কার, কে ছাড় দিচ্ছে? মজুরি পাওয়ার অধিকারী হলেন কারিগর। যিনি ওই শিল্পকাজটি সৃষ্টি করছেন মজুরি তাঁরই প্রাপ্য। প্রশ্ন হল যে টাকা মজুরি ধরে তার উপরে ছাড় দেওয়া হচ্ছে, কারিগর কি সেই মজুরি পাচ্ছেন?

হিসাব অনুযায়ী, ছাড় দেওয়ার পরেও যে টাকা মজুরি হিসাবে ক্রেতাকে দিতে হচ্ছে, সেই টাকাটুকুও মজুরি হিসাবে পাচ্ছেন না কারিগর। তা হলে কার মজুরি কে ছাড় দিচ্ছে? কারিগরের প্রাপ্য না দিয়ে যাঁদের শোরুম আছে তাঁরা ক্রেতাদের থেকে বাহবা কুড়চ্ছেন।

আমি প্রশ্ন করেছিলাম, যদি আমার ব্যবসা থেকে আমি গ্রাহককে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা বা পরিষেবা দিতে চাই তা হলে আমি সোনার উপরে ছাড় দিচ্ছি না কেন? তা হলে তো ক্রেতা অনেক কমে জিনিসটি পাবে।

যাঁরা ছাড় দেওয়ার কথা বলছেন তাঁদের কথা হল মজুরি ছাড় দিলে কারিগর আরও কাজ পাবেন। আমার কথা হল কারিগরকে তাঁর প্রাপ্য দিলে তিনি তো সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন। তাঁর সন্তানদের ভালো স্কুলে পড়াতে পারেন। কেউ অসুস্থ হলে উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেন। সোনার কারিগররা ঠিক মতো খাবার পায় কিনা সেই খবর কি কেউ রাখেন?

halder1_110618043634.jpgশোরুম ঝলমল করছে, অন্ধকার স্বর্ণশিল্পীদের বাড়িতে (উপস্থাপনামূলক ছবি: সুবীর হালদার)

মজুরি কারিগরের প্রাপ্য, তাতে ছাড় দেওয়ার অধিকার কার আছে? যে দোকানি মজুরিতে ছাড় দিচ্ছেন তিনি কি সেই কারিগরের দায়বদ্ধতা গ্রহণ করেন? অথচ তাঁদের অনেকের নিজস্ব প্রডাকশন ইউনিটই নেই।

মজুরি হওয়ার কথা প্রতিগ্রাম সোনায় ৪৫০টাকা থেকে ৫০০ টাকা। অনেকে ৩০০ টাকা মজুরিতেও কাজ করেন।

আমরা আগে দাবি করেছিলাম সব দোকানেই হলমার্ক গয়নার ক্ষেত্রে ৯১৬ ব্যবহার করা হোক (২২ ক্যারেট) কারণ ৯১৬ না হওয়া সত্ত্বেও গ্রাহককে হলমার্কের চিহ্ন দেখিয়ে গয়না বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। তাতে গ্রাহক উপযুক্ত জিনিস পাচ্ছেন না এবং স্বর্ণশিল্প মুখ থুবড়ে পড়ছে।

একশ্রেণীর ব্যবসায়ী সঠিক ভাবে ব্যবসা করছেন কিন্তু অধিকাংশই সেই ভাবে ব্যবসা করছেন না। আমরা বংশানুক্রমে স্বর্ণব্যবসায়ী। আমার ঠাকুর্দাও এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আমার বাবাও যুক্ত ছিলেন, তাঁদের থেকেই কাজ শিখে আমি এখন ব্যবসা চালাচ্ছি। আগামী দিনে হয়তো আমার পরবর্তী প্রজন্ম এই কাজ করবে। তবে সরকারি ভাবেই আমাদের কোনও সুযোগ-সুবিধা নেই। সরকার হয়তো সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু মাঝে একশ্রেণীর লোক ঢুকে পড়ে রটিয়ে বেড়াচ্ছে যে তারাই স্বর্ণশিল্পীদের ভালোর জন্য সবকিছু করছে, তবে বাস্তবে আমরা কিছু পাচ্ছি না।

তারা যখন সরকারের কাজে নথিপত্র জমা করছে তখন দেখা যাচ্ছে যে প্রতিগ্রাম সোনার যা দাম তার ১৮-১৯ শতাংশ মজুরি হিসাবে দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এই হারে মজুরি তো কারিগররা কেউ পান না। তাঁরা যা পান সে কথা বলার মতো নয়।

আগে আমরা ওয়েস্টেজ ও টাকা দুই পেতাম, এখন শুধু ওয়েসেটজ পাই। কাজ করতে গিয়ে যে সোনা ক্ষয়ে যায় সেটাই ওয়েস্টেজ। এখন মেকিং চার্জ উঠে গেছে, ওয়েস্টেজটাই সম্বল। ভালো কাজের জন্য বাড়তি মজুরি নেই।

আমাদের মতো ছোট দোকানি ও ছোট কারিগরদের অবস্থা এখন খুবই খারাপ।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

PRABIR ROY PRABIR ROY

Goldsmith | Member, Bangiya Swarna Shilpi Samity

Comment