এজেন্টদের কাছ থেকে প্যাকেজের দর ডলারে পান, দিনের মূল্য ধরে টাকা দিন ভারতীয় মুদ্রায়
ডলারের মূল্যবৃদ্ধিতে অসুবিধায় পর্যটকরা, লোকসান শহরের ট্রাভেল এজেন্টদেরও
- Total Shares
কিছুদিন আগে এক বন্ধুর সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা মারছিলাম। কথায় কথায় উঠে এল তার সাম্প্রতিকতম বিদেশ সফরের প্রসঙ্গ আর সেই সফরের করুন অভিজ্ঞতার কথা। তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলার সময় বন্ধুটি জানিয়েছিল তাঁর নাম যেন কোথাও প্রকাশ্যে না আসে। নাম লিখতে বাধা থাকলেও অভিজ্ঞতার বিবরণ দিতে তো নিষেধাজ্ঞা নেই। তাই লোভ সামলাতে না পেরে বন্ধুটির বিদেশ সফরের গল্প লিখেই ফেলছি। হাজার হোক, এই ধরণের অভিজ্ঞতা কিন্তু আমার আপনার জীবনে খুব বেশি আসে না।
মাস চারেক আগে মালয়েশিয়া সফরের জন্য একটি প্যাকেজ বুক করিয়েছিলেন তিনি। বুকিংয়ের সময় ট্রাভেল এজেন্টকে কিছু টাকা অগ্রিমও দিয়েছিলেন। তার (অগ্রিমের) বদলে, যথাসময়ে, তার মেল বক্সে ঢুকে পড়েছিল বিমান টিকিট ও হোটেল বুকিংয়ের কাগজপত্রও। কিন্তু সমস্যা শুরু হল যাওয়ার দিন তিনেক আগে।
বকেয়া টাকা মেটাতে গেলে ট্রাভেল এজেন্ট বেঁকে বসলেন। এজেন্টের সাফ বক্তব্য হোটেল ও বিমান সংস্থা ডলারের হিসেবে দর দিয়েছিল। তবে ক্রেতার সুবিধার্থে তিনি বন্ধুটিকে সেই দরকে ভারতীয় মুদ্রায় পরিবর্তিত করে দিয়েছিলেন। কিন্তু মধ্যবর্তী সময় ডলারের দাম এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে যে এখন তিনি আর সেই দামে তিনি বন্ধুটিকে প্যাকেজ বিক্রি করতে পারবেন না।
আইনানুযায়ী এক্ষেত্রে ট্রাভেল এজেন্টর বিরুদ্ধে মামলা করা যেতেই পারে। কারণ, দর দেওয়ার সময় এই ধরণের কোনও লিখিত শর্ত ছিল না। সমস্যটা, অন্য জায়গায়।হাতে সময় বেশি নেই। মামলা করতে গেলে অন্তত এই যাত্রায় তাঁর আর মালয়েশিয়া সফর হবে না। উল্টে, মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া অবধি তাঁর বকেয়া টাকাটাও আটকে থাকবে।
ডলারের মূল্যবৃদ্ধিতে ফাঁপরে পর্যটন পরিষেবা [ছবি: রয়টার্স]
শেষ পর্যন্ত বিস্তর আলোচনার পর মধ্যবর্তী একটি দরে সেই 'প্যাকেজ'ছাড়তে রাজি হলেন ট্রাভেল এজেন্ট। এখানেই সমস্যার শেষ নয়। একে তো ট্রাভেল এজেন্টের চাপে পড়ে প্যাকেজের বাজেট বেড়ে গেল। তার উপর ডলারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার প্যাসেজ মানির বাজেটও বেশ বৃদ্ধি পেল। সব মিলিয়ে, বিমানের তারিখ পরিবর্তন করে বিদেশ সফরের সময়টা দু'রাত কম করতে হল। তবে এই দু'রাতের টাকা কিন্তু হোটেল কতৃপক্ষ বা ট্রাভেল এজেন্ট ফেরত দেয়নি।
এতো গেল পর্যটকদের কথা। এবার আসা যাক ট্রাভেল এজেন্টেদের কথায়।সাধারণত হোটেল বা বিদেশের ট্রাভেল এজেন্টদের সঙ্গে সারাবছর বাকিতে কাজ করেন শহরের প্রথম শ্রেণীর ট্রাভেল এজেন্টরা। অর্থাৎ, ক্রেতাদের কাছে পুরো পয়সা পেয়ে গেলেও শহরের ট্রাভেল এজেন্টরা নিজেদের সময়মত সেই টাকা হোটেল কতৃপক্ষ বা বিদেশের ট্রাভেল এজেন্টদের (যাঁদের কাছ থেকে গাড়ি বা অন্যান্য পরিষেবা বুক করা হয়) পাঠান।
ডলারের দাম বাড়ায় তাঁদেরও মোটা টাকা লোকসান গিয়েছে। ক্রেতারা ভারতীয় মুদ্রায় যখন টাকা দিয়েছিলেন তখন ডলারের দাম কম ছিল। কিন্তু মাস দুয়েক পর হটাৎ করেই ডলারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন তাদেরকে হোটেল কতৃপক্ষ বা বিদেশের ট্রাভেল এজেন্টকে বর্ধিত মূল্যে ডলার পাঠাতে হচ্ছে। এর ফলে 'অতিরিক্ত' টাকা তাঁদের পকেট থেকে গড়চা যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে এক অদ্ভুতুড়ে পরিস্থিতি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় কী?
মূলত দুটি উপায় আছে। দুটি উপায় চালুও করে দিয়েছেন শহরের বেশ কিছু নামিদামি ট্রাভেল এজেন্ট।
এক, ভারতীয় মুদ্রায় নয়, ক্রেতাদের কাছে সরাসরি ডলারে দরপত্র পাঠাচ্ছেন ট্রাভেল এজেন্টরা। এর মানে এই নয় যে ক্রেতাদের ডলারে পেমেন্ট করতে হবে। ক্রেতারা ভারতীয় মুদ্রায় টাকা দিতে পারবেন। কিন্তু যেদিন দেবেন সেদিনের ডলারের মূল্য হিসেবে সেই টাকার অঙ্ক ঠিক হবে। এর ফলে, ডলারের সঠিক মূল্যটাই এজেন্টদের পকেটে ঢুকবে।
দ্বিতীয়, বাকি রাখা বন্ধ। ক্রেতাদের কাছ থেকে ভারতীয় মুদ্রায় পেমেন্ট পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশে সঘেই টাকা ডলারে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে, ডলারের দাম উঠলেও তার খেসারত ট্রাভেল এজেন্টদের দিতে হচ্ছে না। দুই, ক্রেতাদেরও কোনও ঝুটঝামেলা পোয়াতে হচ্ছে। দিনের হিসাবে যে পরিমাণ টাকা দিয়ে প্যাকেজ বুক করা উচিত সেই পরিমাণ টাকা দিয়েই তাঁরা প্যাকেজ বুক করছেন।
বছর চার-পাঁচেক আগে ডলার ও পাউন্ডের দাম এভাবে অনেকটা বেড়ে যাওয়ার ফলে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। কিন্তু সাময়িক ছিল এই ব্যবস্থা।পরিবেশ, স্বাভাবিক হতে আবার পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যান এজেন্টরা (ভারতীয় মুদ্রায় ক্রেতাদের দর পাঠানো)। তবে এবার এজেন্টরা নিশ্চিত। নতুন ব্যবস্থা পাকাপাকিভাবে বলবৎ রাখা হবে।
নেড়া তো বেলতলায় একবারই যায়!

