দুধওয়া ব্যাঘ্রপ্রকল্প: অবহেলা, জবরদখল ও রাজনৈতিক অনীহায় নষ্ট হচ্ছে আদিম অরণ্য

অরণ্য সংরক্ষক বিলি অর্জন সিংয়ের প্রচেষ্টা হৃতগৌরব অনেকটাই ফিরেছে এই অভয়ারণ্যে

 |  5-minute read |   29-12-2018
  • Total Shares

যে বনে বাঘ রয়েছে সেই বন কেটে ফেল না আর বন থেকে বাঘ মুছে ফেল না; বাঘ না থাকলে বন নষ্ট হয়ে যাবে আর বন না থাকলে বাঘ শেষ হয়ে যাবে।

-- ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে লেখা মহাভারতে (উদ্যোগপর্ব) এ কথা বলা রয়েছে।

দুধওয়া – মূলত শাল ও সেগুন কাঠেন অরণ্য – যা ভারতের সবচেয়ে সুন্দর, যাকে বলে ছবির মতো সুন্দর অরণ্য, উত্তরপ্রদেশের তরাই অঞ্চলে ৫০০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে রয়েছে এই অরণ্য।

এই অত্যন্ত মনোরম বনভূমিতে ঢুকলে মনে হবে যেন স্বর্গের একটা টুকরো এখানে খসে পড়েছে, এখানে প্রকৃতি যেন সব সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে। সাধারণ ভাবে অরণ্য যখন বন্ধ থাকে তখন এই জায়গা ভরে যায় লান্টানা ও মেক্সিকান ডেভিলের মতো গাছে যা এই অরণ্যের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকর, তবে এই ধরনের ক্ষতিকর আগাছা থেকে দুধওয়া এখনও মুক্ত। তাই এখানে নানা ধরনের গাছগাছালির বাড়বাড়ন্ত দেখা যায়।

1forest-inside_122918065755.jpgভারতের সবচেয়ে সুন্দর অরণ্যের অন্যতম হল দুধওয়া (ছবি সৌজন্য: লেখক)

আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান যে উত্তরাখণ্ডের এই ধরনের অরণ্যের কাছাকাছি আমি বেড়ে উঠেছি এবং বন্যপ্রাণের সন্ধানে এখন ভীষণ ভাবে ভারতের বিভিন্ন অরণ্যে আমি ঘুরে বেড়াই। আমি যখনই কোনও অরণ্য দেখি তখনই আমার মনে হয় যে প্রতিটি অরণ্যের নিজস্ব সৌন্দর্য ও অনন্যতা রয়েছে, তা সত্ত্বেও বলছি যে, দুধওয়া হল আমাদের দেশের সবচেয়ে আদিম এক অরণ্য।

যখন কেউ এই অরণ্যে প্রবেশ করেন তখন তাঁর মনে হয় তিনি যেন তাঁর নিজের একটি বাড়িতেই প্রবেশ করছেন, যে বাড়িটি অরণ্যের মধ্যে। আমাদের সৌভাগ্য যে আমরা কিছুটা হলেও তাঁদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি – একবার এই আরণ্যকের মাঝে সামান্য কোনও নড়াচড়ার আঁচ পেলেই আমাদের সমস্ত অনুভূতিগুলো যেন সজাগ হয়ে ওঠে – সেই মুহূর্তটিকে ক্যামেরাবন্দি করে ফেলার জন্য। অনেকেই মনে করেন যে দুধওয়া অরণ্যে বন্যপ্রাণী যেন উপছে পড়ছে, অন্তত দু-চারটের দেখা তো মিলবেই!

কোনও অরণ্যে গিয়ে আপনি কোনও পশুপাখির দেখা নাও পান, তা হলেও তাদের উপস্থিতি অনুভব করতে পারবেন নানা রকম শব্দের মাধ্যমে। পাখিদের কলকাকলি, মিলনের জন্য বিভিন্ন প্রজাতির হরিণের ডাক, বাঘের পায়ের ছাপ, হাতির মল, শিকার হওয়া পাখিদের আর্তনাদ, ঝোপঝাড়ে ঝটপটানির শব্দ এবং এই ধরনের আরও অনেক কিছু।

তবে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে দুধওয়া হল বণ্যপ্রাণের এই ধরনের লক্ষণবিহীন এক অরণ্য। দুধওয়া অরণ্যের একদিকে রয়েছে নেপালের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমান্ত – যার মূল্য চোকাতে হচ্ছে এই অরণ্যের বাঘের সংখ্যা দিয়ে। যদিও আধিকারিকরা মনে করেন যে কিষাণপুর, পিলিভিট ও কাতারনিয়াঘাট-সংলগ্ন দুধওয়া অঞ্চলে বাঘের সংখ্যা মোটামুটি ২০০ মতো তবে এই অরণ্যে বিভিন্ন প্রাণীর চলাফেরা দেখে মনে হয় প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে অনেক কম।

2one-more-inside_122918065825.jpg রাজকীয় চালচলন: দুধওয়া অরণ্যে বাঘ, প্রশ্ন হল এরা এখন কতটা নিরাপদ? (ছবি সৌজন্য: লেখক)

আমরা যখন বনের ভিতরে যাই তখন বিভিন্ন সঙ্কেত থেকে বুঝতে পারি প্রকৃতপক্ষে এই অরণ্যের সীমার মধ্যে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কত। এই ব্যাঘ্র প্রকল্পের কাছাকাছি বা অরণ্যাঞ্চলের ভিতরের গ্রামে যাঁরা বসবাস করেন তাঁদের যথেচ্ছ প্রাণী হত্যার ছাড় দিয়ে রেখেছে কর্তৃপক্ষ – তাঁরা সহজেই প্রচুর সংখ্যায় বন্যবরাহ ও হরিণ শিকার করেন – এই দুই প্রাণীই হল বাঘের প্রধান খাদ্য। বনে বাঘ বাঁচানোর একমাত্র উপায়টি হল বাঘের শিকারের সংখ্যা যথেষ্ট পরিমাণে থাকা এবং শিকার ও চোরাশিকার বন্ধ করা।

সম্প্রতি দুধওয়া ব্যাঘ্রপ্রকল্পের অন্তর্গত কিষাণপুর অভয়ারণ্যে এক বছর পঞ্চাশের লোক প্রবেশ করলে তাঁকে বাঘ আক্রমণ করে, প্রতিশোধ নিতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটি ট্রাক এনে সেই ট্রাকে পিষে ওই বাঘিনীটিকে মেরে ফেলা হয়। ওই বাঘিনীর ‘অপরাধ’ ছিল সে অভয়ারণ্যের মধ্যে খাবারের খোঁজ করছিল – তাদের স্বাভাবিক খাদ্যভাণ্ডার সাফ করে ফেলেছে লোভী মানুষের দল। যারা সেই বাঘিনীকে হত্যা করেছে এখনও তাদের গ্রেফতার করা যায়নি।

3railway-track-insid_122918065852.jpg বনের ভিতর দিয়ে রেললাইন পাতায় প্রতি বছর অসংখ্য প্রাণীর মৃত্যু হয় ট্রেনে কাটা পড়ে (ছবি সৌজন্য: লেখক)

যখন আপনি ওখানে যাবেন তখন প্রথমেই যে দৃশ্য দেখে একেবারে চমকে উঠবেন তা হল অভয়ারণ্যের মধ্যে ব্যাপক ভাবে চাষাবাদ করা হচ্ছে। দেশের অন্য কোথাও বন্যআইন এই ভাবে আমি লঙ্ঘিত হতে দেখিনি --  এবং এখানে ব্যাঘ্রপ্রকল্পের কোর এরিয়ায় যে ভয়ানক ভাবে অবৈধ দখলদারি চলছে সেটিও আমি অন্য কোথাও দেখিনি। কিষাণপুরের কাছে অরণ্যের কোর এরিয়া বলে চিহ্নিত অংশে স্থানীয় বাসিন্দা অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছেন নিজেদের গাড়ি নিয়ে, সেই গাড়িতে উচ্চগ্রামে মিউজিক বাজছে এবং অরণ্যের পবিত্রতা নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে দুধওয়ায়।

দুধওয়া অরণ্যের একেবারে অন্তঃস্থল দিয়ে গিয়েছে রেললাইন, যার ফলে তীব্র গতিতে ছুটে চলা টের্নের ধাক্কায় প্রতি বছর অসংখ্য প্রাণীর মৃত্যু হয়। দুধওয়া অরণ্যের একেবারে ভিতরে থারু নামে এক উপজাতির বাস, এখান থেকে রাস্তা বেঁকে গিয়েছে নেপালের দিকে। দুঃখের কথা হল দক্ষিণ এশিয়ায় যে অবৈধ ভাবে বন্যপ্রাণীর দেহাংশের ব্যবসা চলে তার অন্যতম বৃহত্তম কেন্দ্র হল নেপাল।

এখন অরণ্য রক্ষা করার একটিই মাত্র উপায় রয়েছে, তা হল অরণ্যের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করা। যদি অরণ্য রক্ষিত হয় তা হলে সেটি স্থানীয় বাসিন্দাদের কর্মসংস্থানও করে দেবে। একমাত্র সেটি করা সম্ভব হলেই তাঁদের মধ্যে এই বোধ আসবে যে এই অরণ্য তাঁদের, একে যে ভাবেই হোক রক্ষা করতে হবে।

ভারতীয় উপমহাদেশে দুধওয়া অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম এবং সৌন্দর্য ও ব্যাঘ্রপ্রকল্পের জন্য এই অরণ্যের পরিচিতি রয়েছে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও। এটা এমন এক অরণ্য যেখানে ইকো-ট্যুরিজম চালু করাই যায়।

4deer-and-birds-insi_122918065921.jpg শিকারও নেই, শিকারীও নেই: কোনও অরণ্যে বাঘের উপস্থিতির প্রধান শর্তই হল সেখানে তৃণভোজী প্রাণীদের উপস্থিতি, যেমন দুধওয়ায় এই ধরনের হরিণ। (ছবি সৌজন্য: লেখক)

যাই হোক, সবচেয়ে প্রাথমিক যে প্রয়োজন সেই অভিজ্ঞ এমন গাইড ও গাড়িরচালকের অভাব এখানে রয়েছে। পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারেন এই গাইডরাই, কিনিতু বারে বারে এই জঙ্গল ঘোরার সময় আমি যতজন গাইডকে পেয়েছি তাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যিনি এই অরণ্য সম্বন্ধে কিছু জানেন বা এই অরণ্যকে ভালোবাসেন বা যাঁর মধ্যে উৎসাহ আছে।

এই দেশের একজন নাগরিক এবং অরণ্যপ্রেমী হিসাবে এই বিষয়গুলি আমাকে ভাবিয়ে তোলে তা হলে কেন সরকার ও বনদফতরের কারও নজরে এই সব বিষয় পড়ছে না বা তাঁরা এ ব্যাপারে কেন কোনও পদক্ষেপ করছেন না?

জলবায়ু পরিবর্তের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমাদের সর্বশেষ অস্ত্র হল আমাদের অরণ্যানী। আমরা যদি এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ি তা হলে আমরা নিজেকে ধ্বংসের দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাব, তাই আমাদের সকলের উচিত বন ও বন্যপ্রাণ রক্ষা করা।

কারণ বহুকাল আগে আমাদের পূর্বজরাও উপলব্ধি করেছিলেন যে বন্যপ্রাণ না থাকলে বন টিঁকে থাকা সম্ভব নয়।

লেখাটি পড়ুন ইংরেজিতে

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000
Comment