রিভিয়ু করতে শুধু নম্বরই বাড়েনি, মেধা তালিকাতেও বদল! উচ্চমাধ্যমিকের খাতা কী ভাবে দেখা হয়েছে?
যে অনুপাতে পরীক্ষার্থী বাড়ছে সেই অনুপাতে পরীক্ষক বাড়ছে না, অভাব পরিকাঠামোর
- Total Shares
এবারে উচ্চ মাধ্যমিকের ফল প্রকাশ হওয়ার পর রিভিয়ু ও স্ক্রুটিনি করে প্রায় ছ'হাজার পরীক্ষার্থীর নম্বর বেড়েছে। শুধু তাই নয় নম্বর বাড়ার ফলে আরও চারজন পড়ুয়া মেধা তালিকায় ঢুকে পড়েছে। যে বিষয়টা উঠে আসছে সেটা হল, গত দশ বছরে এ ধরণের ঘটনা অভূতপূর্ব। জানা গেছে যে রিভিয়ু করে বহু ছাত্রছাত্রীর মোটামুটি ১০ থেকে ১৫ নম্বর করে বেড়েছে। আশানুরূপ ফল হয়নি দেখে ৪৫ হাজারের মতো পরীক্ষার্থী তাদের উত্তরপত্রের স্ক্রুটিনি ও রিভিউর আবেদন করেছিল।
রিভিউ ও স্ক্রুটিনির পরে ছাত্রছাত্রীদের নম্বর বাড়াটা কোনও নতুন কথা নয়। তবে সেই সংখ্যাটা কখনও এতো বিরাট ছিল না। তাহলে এ বছর কী এমন ঘটল যে রিভিয়ুর পর নম্বরে এতটা ফারাক দেখা গেল।
অনেকেই মনে করছেন পরীক্ষকরা যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে উত্তরপত্র দেখেননি। তাঁদের আরও অনেক বেশি সচেতন ও মনোযোগী হওয়া উচিৎ ছিল এবং আরও দায়িত্ব নিয়ে উত্তর পত্র দেখা উচিৎ ছিল। কারণ উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফলের উপর ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা জীবন নির্ভর করে। উচ্চ মাধ্যমিকের ফলের ভিত্তিতে ছাত্রছাত্রীর ভবিষৎ যেমন অনেক পথ খুলে যায় তেমন অনেক পথ বন্ধও হয়ে যায়। কাজেই বিষয়টা খুব স্পর্শকাতর এবং বিষয়টির দিকে নজর দিতে হবে।
নম্বর বাড়ার ফলে আরও চারজন পড়ুয়া মেধা তালিকায় ঢুকে পড়েছে
এই যুক্তিগুলো যেমন ঠিক পাশাপাশি পরিকাঠামোগত কয়েকটা বিষয়েও মাথায় রাখতে হবে। যাদবপুর বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক পরিমল ভট্টাচার্য বলেন, "উত্তরপত্র দেখা ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষিকার আরও বেশি মনোযোগী যেমন হওয়া উচিৎ ছিল তেমনই আর একটা বিষয় একদম চড়িয়ে দিলে চলবে না সেটা হল বছর নির্বাচন ছিল বলে শিক্ষকশিক্ষিকারা উত্তরপত্র দেখার জন্য খুব অল্প সময় পেয়েছিলেন। মুষ্টিমেয় পরীক্ষকরা যখন মাধ্যমিক পরীক্ষার খাতা দেখেন তখন তাঁদের মাধ্যমিকের নিয়ম অনুসারে খাতা দেখতে হয় আবার তাঁরাই যখন উচ্চমাধ্যমিকের খাতা দেখেন তখন তাঁদের উচ্চ মাধ্যমিকের নিয়ম অনুসারে খাতা দেখতে হয়। এর ফলে পরীক্ষকরা অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন। পাশাপাশি প্রত্যেক বছর খাতা দেখার নিয়মের কিছু না কিছু রদবদল হতেই থাকে।"
যে অনুপাতে প্রত্যেকবছর পরীক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়ছে সেই অনুপাতে পরীক্ষকের সংখ্যা বাড়ছে না। তাই বছরের যে সময়টিতে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা হয় ঠিক তার ঘাড়ে ঘাড়েই মাধ্যমিক পরীক্ষাও হয় এবং মোটামুটি সব স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষাও তখন চলে।
যে পরীক্ষকরা উচ্চ মাধ্যমিকের উত্তর পত্র দেখছেন আবার তাঁরাই অন্যান্য খাতাও দেখছেন
যে পরীক্ষকরা উচ্চ মাধ্যমিকের উত্তর পত্র দেখছেন আবার তাঁরাই অন্যান্য খাতাও দেখছেন এর ফলে পরীক্ষকদের একটা অমানবিক চাপের মুখে পড়তে হয়। আবার তাঁদের একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাতা জমা দিতে হয়। এই তাড়াহুড়োর ফলেই ভুলভ্রান্তি হওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই পরীক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া যায় তাহলে হয়তো যেই পরীক্ষকরা মাধ্যমিকের খাতা দেখেছেন তাঁদের উচ্চ মাধ্যমিকের খাতা দেখার চাপের থেকে অব্যাহতি দেওয়া সম্ভব হবে।
এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো যে মাধ্যমিক বোর্ডের কোনও স্কুলের শিক্ষক কিংবা শিক্ষিকার উচ্চ মাধ্যমিকের খাতা দেখার অনুমতি নেই। তাই স্বাভাবিকভাবেই যাঁরা উচ্চ মাধ্যমিকের উত্তরপত্র দেখছেন তাঁদের উপর বাড়তি চাপ পড়ছে। ধরা যাক একটি স্কুলে কোনও একটি বিষয়ের জন্য একজন শিক্ষক কিংবা শিক্ষিকা নিযুক্ত রয়েছেন তাহলে দেখা যাচ্ছে যে সেই একজন পরীক্ষককে তাঁর স্কুলের পরীক্ষার্থীদের খাতায় দেখতে হচ্ছে পাশাপাশি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের খাতাও দেখতে হচ্ছে এবং সেখানে বরাদ্দ সময়সীমা থাকি এক থেকে দু'সপ্তাহ।
বছরের যে সময়টিতে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা হয় ঠিক তার ঘাড়ে ঘাড়েই মাধ্যমিক পরীক্ষাও হয়
যদিও বালিগঞ্জ শিক্ষা সদনের অধ্যক্ষা সুনীতা সেন মনে করেন যে এ পরিমাণে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বাড়ছে তার ফলে কাউন্সিলের পক্ষে অনেক সময় পুরো ব্যাপারটার উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব হয় না যদিও কাউন্সিল সম্পূর্ণ বিষয়টার উপর নজরদারি চালান।
যদিও এই বিষয় অনেককেই কাউন্সিলকে দোষ দিচ্ছে কারণ খাতা দেখার যে পরিকাঠামোটা রয়েছে সেখানে প্রচুর ঘাটতি আছে যেই দিকে কাউন্সিলের অনেক বেশি যত্নবান হওয়া উচিৎ। অন্যান্য বোর্ডের তুলনায় খাতা দেখার জন্য পরীক্ষকদের যৎসামান্য পারিশ্রমিক দেওয়া হয় যদিও বলা হয়ে থাকে যে পরীক্ষকদের কাছে আর্থিক দিকটা বড় নয় ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ তাঁদের কাছে অনেক বেশি মূল্যবান।
যে অনুপাতে পরীক্ষার্থী বাড়ছে সেই অনুপাতে পরীক্ষকের বাড়ছে না
তাই বিশেষজ্ঞদের মতে কোনও পক্ষকে দোষারোপ না করে একটা সুচিন্তিত পরিকল্পনার প্রয়োজন। তবে সমস্যা যাই হোক না কেন যে হারে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা প্রত্যেকবছর বেড়ে চলেছে সেই বিষয়টিকে মাথায় রেখে আরও বেশি পরীক্ষক নিয়োগের কথা কাউন্সিলকে ভাবতে হবে পাশাপাশি সুচিন্তিত পরিকল্পনা ও পরিকাঠামোর উন্নতির দিকেও জোর দিতে হবে না হলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বোর্ডের উপর থেকে পড়ুয়াদের হয়তো অচিরেই আস্থা চলে যাবে।

