বাংলাদেশ: গণজাগরণের ইমরানকে আটকের পর ছেড়ে দিল র্যাব
মাদকবিরোধী অভিযানে ‘বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের’ প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করছিলেন তিনি
- Total Shares
বাংলাদেশের আলোচিত গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারকে শাহবাগ থেকে ধরে নেওয়ার সাড়ে ৬ ঘণ্টা পর ছেড়ে দিয়েছে র্যাব। বাংলাদেশের চলমান মাদকবিরোধী কর্মসূচি ঘিরে বুধবার বিকেল চারটের দিকে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে গণজাগরণ মঞ্চের একটি কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ইমরান এইচ সরকারকে ওই অনুষ্ঠান থেকেই আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়।
সোমবার রাত সোয়া ১১টার দিকে ইমরানকে ছেড়ে দেওয়ার কথা নিশ্চিত করেন র্যাব-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ এমরানুল হাসান। তিনি শুধু বলেন, “জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ১১টার দিকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।” বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে গণজাগরণ মঞ্চের একজন সংগঠক বলেন, ইমরান ভাই ছাড়া পেয়েছেন। তিনি এখন বাসার দিকে যাচ্ছেন।”
মাদকবিরোধী অভিযানে ‘বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের’ প্রতিবাদে শাহবাগে পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি পালন করতে উপস্থিত হলে ইমরানকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল র্যাব। তখন পেটানো হয় গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদেরও।
গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক রিয়াজুল আলম ভুঁইয়া বলেছিলেন, পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচিতে অংশ নিতে বিকাল সাড়ে ৪টায় ইমরান শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে আসেন। তিনি গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে র্যাব সদস্যরা জোর করে তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়।
ইমরানকে আটকের বিষয়টি স্বীকার করে র্যাব মুখপাত্র মুফতি মাহমুদ খান তখন বলেছিলেন, “সরকারি কাজে বাধা, বিনা অনুমতিতে জনসমাবেশ করা-সহ বেশ কয়েকটি কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন সে র্যাবের হেফাজতে আছে। তাকে কোথায় হস্তান্তর করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত পরে নেওয়া হবে।”
র্যাবেএর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এমরানুল হাসানও তখন বলেছিলেন, “ইমরানের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি।” তবে ছেড়ে দেওয়ার পর এ সব বিষয়ে আর কিছুই বলেননি র্যাব কর্মকর্তারা।
আটকের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক সঙ্গীতা ইমাম বলেন, বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ‘মাদক নির্মূলের নামে ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে’ জাদুঘরের সামনে ছাত্র ইউনিয়নের আরেকটি মানববন্ধন চলছিল। ওই সময় গণজাগরণ মঞ্চের কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে পাবলিক লাইব্রেরির ভিতর দিয়ে জাদুঘরের দিকে আসছিলেন ইমরান। তখন সাদা পোশাকের সাত-আটজন এসে তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। গণজাগরণ মঞ্চের কয়েকজন কর্মী এ সময় বাধা দিতে গিয়ে পোশাকধারী র্যাব সদস্যদের পিটুনির শিকার হন।
সঙ্গীতা ইমাম বলেন, “আমরা রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে প্রতিবাদ করতে চেয়েছি। কিন্তু তা পারিনি। যেখানে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে ক্রসফায়ারের মতো বিষয় নিয়ে জাতিসঙ্ঘের মতো সংস্থা কথা বলছে, সেটা আমরা রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে পারছি না। তা আমাদের জন্য লজ্জাজনক।”
২০১৩ সালে আন্দোলন শুরুর পর শাহবাগ ও গণজাগরণ মঞ্চ সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছিল
ইমরানকে ধরে নেওয়া এবং নেতা-কর্মীদের উপর হামলার প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক ভাবে বৃহস্পতিবার সকালে সংবাদ সম্মেলনও ডেকেছিল গণজাগরণ মঞ্চ। ছাত্র ইউনিয়নও এক বিবৃতিতে ইমরানের মুক্তির দাবি জানিয়েছিল।
যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ২০১৩ সালে আন্দোলন শুরুর পর শাহবাগ ও গণজাগরণ মঞ্চ সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে পরে এই আন্দোলন থেকে সরে যায় আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলো, ইমরানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগও তোলে তারা। অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন থেকে খুন-ধর্ষণসহ নানা ঘটনার প্রতিবাদেও সরব হন ইমরান। এর ধারাবাহিকতায় চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে মৃত্যুর ঘটনাগুলো নিয়ে গত রোববার প্রতিবাদ কর্মসূচি দেয় গণজাগরণ মঞ্চ। কিন্তু পুলিশের বাধার কারণে তা আর হয়নি। সেদিন বাধা পেয়ে ইমরান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “সরকারের আচরণে মনে হচ্ছে, দেশে একনায়কতান্ত্রিক শাসন চলছে। তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ নয়।”
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার শাহবাগে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখ শুরু হয় যুদ্ধাপরাধীদের সবোচ্চ শাস্তির দাবিতে গণ আন্দোলন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত আসামী আব্দুল কাদের মোল্লার বিচারের রায় ঘোষণা করে। কবি মেহেরুন্নেসাকে হত্যা, আলুব্দি গ্রামে ৩৪৪ জন মানুষ হত্যা সহ মোট ৬টি অপরাধের ৫টি প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। কিন্তু এতোগুলো হত্যা, ধর্ষণ, সর্বোপরী গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ মেনে নিতে পারেনি। রায়ের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিপুল সংখ্যক মানুষ ঢাকার শাহবাগে জড়ো হতে শুরু করে এবং এর অনুসরণে একসময় দেশটির অনেক স্থানেই সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ সমাবেশ শুরু হয়। যা পরবর্তীতে যা গণজাগরণ মঞ্চ নামে পরিচিত লাভ করে। প্রথম থেকেই ইমরান এইচ সরকার এই আন্দোলনের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

