ভাগ্যের জোর আর অনবদ্য সমন্বয়ের জন্য অ্যাসিড টেস্টে উত্তীর্ণ বিমানকর্মীরা
প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া সবসময় কঠিন, তবে সবচেয়ে জটিল অংশ বিমানে হৃদপিণ্ড পরিবহণের পর্ব
- Total Shares
সোমবারের বারবেলায় বাইপাস লাগোয়া এক বেসরকারি হাসপাতালে ঝাড়খণ্ডের শিক্ষক, বছর চল্লিশের দিলচাঁদ সিংহ নতুন হৃদযন্ত্র উপহার পেলেন। হৃদপিণ্ড এল বেঙ্গালুরু থেকে। সেখানে ২১ বছর বয়সি এক যুবক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন এবং রবিবার সকালে তাঁর ‘ব্রেন ডেথ’ ঘোষণা করা হয়। এক দল লোকের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বেঙ্গালুরুর ২১ বছরের যুবকের হৃদপিণ্ড সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হল ঝাড়খণ্ডের শিক্ষকের শরীরে। তাও আবার তৃতীয় একটি শহর কলকাতায়।
এখন প্রশ্ন হল, কতটা কঠিন ছিল এই প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া? বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, এই ধরণের অস্ত্রোপচার সবসময় ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু অস্ত্রোপচারের থেকে কোনও অংশে কম ছিল না এই এক শহর থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরের অন্য শহরে হৃদপিণ্ড নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি। বলতে গেলে গোটা হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার এই অংশটি ছিল অ্যাসিড টেস্ট। এবং কিছুটা ভাগ্যের জোরে আর বেশির ভাগটাই অনবদ্য সমন্বয়ের জন্য এই অ্যাসিড টেস্ট সফল ভাবে উত্তীর্ণ এর সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষই।
ঝাড়খণ্ডের শিক্ষক, বছর চল্লিশের দিলচাঁদ সিংহ নতুন হৃদযন্ত্র উপহার পেলেন
ভাগ্যের জোর, কারণ বেঙ্গালুরু থেকে বিমানে আনা হয়েছে এই হৃদপিণ্ড। এক বেসরকারি বিমান সংস্থার পাইলটের সঙ্গে এই বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছিল। তিনি কোনও রাখঢাক না রেখে বলেই দিলেন, "এই প্রক্রিয়ায় সমন্বয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিমান চলাচল অনেকটাই আবহাওয়ার উপর নির্ভরশীল। ঈশ্বরের অসীম কৃপা সোমবার আবহাওয়া অনুকূল ছিল। না ছিল কোনও নিম্নচাপ, না ছিল কালবৈশাখী। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকার দরুণ বিমান পরিষেবা কোনও ভাবে বিঘ্নিত হয়নি।"
বেশ কয়েকটি সংস্থার একত্রিত প্রচেষ্টায় এই প্রতিস্থাপন সম্ভব হয়েছে। যেমন দুই শহরের দুই হাসপাতাল কতৃর্পক্ষ, দুই রাজ্যের সরকার, দুই শহরের ট্রাফিক পুলিশ এবং সর্বোপরি বিমান সংস্থা (এক্ষেত্রে ইন্ডিগো)-সহ বিমানবন্দরের কর্মীরা ও বিমানবন্দরের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা সিআইএসএফের জওয়ানরা। এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়েছে বিমান সংস্থার কর্মীদের। কারণ, তাঁদের একদিকে ছিল কমার্সিয়াল বিমান সংক্রান্ত বিমান নিয়ামক সংস্থা ডিজিসিএর কঠোর আইন, অন্যদিকে বিমান বন্দরের সুরক্ষার নিয়ামক সংস্থা বিসিএএসের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিমানে নিয়ে যাওয়া সম্পর্কিত কঠোর নির্দেশাবলি। সব মিলিয়ে এক কঠোর নিয়ম-নীতির বেড়াজালে নিবদ্ধ থেকে বিমান সংস্থার কর্মীদের নিজ কর্তব্য পালন করতে হয়েছে।
জানিয়ে রাখা ভালো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার পরে বিশ্বের তৃতীয় দেশ হিসেবে ডিসেম্বর ২০১৬ তে অঙ্গ-প্রতঙ্গ বিমানে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে এসওপিএস (স্পেশাল অপারেটিং প্রসিডিউরস) প্রবর্তন করে ভারত। তাতে বলা হচ্ছে যে বিমানে করে প্রতিস্থাপনের অঙ্গ নিয়ে যাওয়া হবে, সেই বিমানটি আপৎকালীন কারণে নির্দিষ্ট সময়ের ২০ মিনিট পর্যন্ত আগে টেকঅফ করতে পারবে। এ ক্ষেত্রেও ইন্ডিগোর যে বিমানে এই হৃদপিণ্ড আনা হয়েছে তা নির্দিষ্ট টেকঅফের সময়ের ১০ মিনিট আগেই বেঙ্গালুরু বিমানবন্দর থেকে উড়েছিল।
প্রথম অ্যাসিড টেস্টে চূড়ান্ত ভাবে সফল বিমানকর্মীরা
কাজটা কিন্তু নেহাত সহজ নয়। শুধুমাত্র বিমান সংস্থার ফ্লাইট ডেসপ্যাচ সেকশন (এফডিএস) ও ইন্টিগ্রেটেড অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টার (আইওসিসি) অফিসারদের নিখুঁত সমন্বয়ের ফলে নির্দিষ্ট সময়ের ১০ মিনিট আগে টেকঅফ এগিয়ে আনা সম্ভব।
২০১৮ সালের এসওপিএসের নির্দেশ মেনে এফডিএস আধিকারিকরা বিমাবন্দরে ট্রাফিক কন্ট্রোলার ও অ্যাপ্রন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে বিমান টেকফের সময় রদবদল করবেন। ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের কাছে সবুজ সঙ্কেত পেলে তাঁরা পরিবর্তিত টেকঅফ টাইম আইওসিসি কর্তাদের কাছে পৌঁছে দেন। আইওসিসি কর্মীরা প্রথমেই বিভিন্ন মাধ্যমে পরবর্তিত সময় যাত্রীদের জানাবেন। একই সঙ্গে, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বিভাগের কর্মচারী, পাইলট ও বিমানসেবিকাদেরও বার্তা পাঠাবেন। সোমবারের ইন্ডিগো বিমানে মোট ১৬৩ জন যাত্রী ছিলেন। জনে জনে প্রতিটি যাত্রীকে বিভিন্ন মাধ্যমে বার্তা পাঠানোর কাজটা মোটেও সহজ নয়। একজন যাত্রীও যদি ডিজিসিএর কাছে অভিযোগ জানাতেন যে তিনি এই বার্তা পাননি এবং অভিযোগ প্রমাণ করতে পারতেন তাহলে কিন্তু ইন্ডিগোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হত।
পরবর্তী ধাপে, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বিভাগ বিমানবন্দরের অ্যাপ্রন বিভাগের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবেন। এরোব্রিজ সহ আর যে যে পরিষেবা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিমান সংস্থা নেয় সেই সব পরিষেবা যাতে পরিবর্তিত সময়ে পাওয়া যায় তার ব্যবস্থা করতে হয়। এক আধিকারিকের বক্তব্য, "বিষয়টি সহজ নয়। আমরা গিয়ে বললাম আর পেয়েও গেলাম তা কিন্তু সব সময় হয় না। মনে রাখতে হবে অন্য বিমান সংস্থাগুলোও এই পরিষেবা নিয়ে থাকে এবং তাঁরা কখনোই চাইবেন না যে তাদের পরিষেবা ব্যাহত হোক। তবে এ ক্ষেত্রে সোমবার ইন্ডিগোর রক্ষাকর্তা হতে পারত সেই এসওপিসি। কারণ সেখানে বলা আছে যে বিমানে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যাবে সেই বিমানটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।"
যে বিমানবন্দরে বিমানটি অবতরণ করবে সেখানকার কর্মীদেরও একই কাজ করতে হবে। কারণ সেখানেও বিমানটি পরিবর্তিত সময় নামবে। সুতরাং, নতুন করে সমস্ত ব্যবস্থাপনা করতে হবে।
এর পরে আসছে নিরাপত্তা। অতিরিক্ত আসন বুক করা হয়েছিল এই হৃদপিন্ড পাঠানোর জন্য। সাধারণত, দেশের কূটনীতিকরা যখন সরকারি কাজে বিমানে চলাচল করেন তখন এই বিশেষ আসন বুক করা হয় তাঁদের সঙ্গে গুরত্বপূর্ন নথিপত্র সহ ব্যাগটি রাখবার জন্য। অত্যন্ত গোপন সেই নথিপত্র। তা দেখার অধিকার নেই সিআইএসএফ জওয়ানদের। সুতারং, এই ব্যাগ কোনওরকম নিরাপত্তা তল্লাশি ছাড়াই বিমানে উঠবে। এসওপিএসের সৌজন্যে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভরা বাক্সর জন্য একই বন্দোবস্ত থাকবে। অর্থাৎ, কোনওরকম তল্লাশি ছাড়াই তা একেবারে বিমানের ভিতরে এক্সট্রা আসনটিতে চড়ে পড়বে। সোমবার এইট-ই আসনটি নির্দিষ্ট করা হয়েছিল হৃদপিণ্ড-সমেত বাক্সটির জন্য। সাধারণত এই আসনটির জন্য একজন যাত্রীর ভাড়া নেওয়া হয়।
পরিশেষে যে বিমানবন্দরে বিমান অবতরণ করবে সেখানকার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের (এটিসি) বার্তা পাঠাতে হবে। সেই বার্তা পাঠানোর দায়িত্ব যে বিমানবন্দর থেকে বিমানটি টেকঅফ করবে সেই বিমানবন্দরের এটিসি কর্তাদের উপর। এসওপিএস অনুযায়ী সেই বিমানবন্দরেও অবতরণের সময় এক বিমানটি অগ্রাধিকার পাবে। সোমবার সকালে ইন্ডিগোর বেঙ্গালুরু কলকাতা বিমান যখন কলকাতায় অবতরণ করল, তখন একটি আন্তর্জাতিক বিমান সহ আরও তিনটে বিমান কলকাতার আকাশে অপেক্ষা করছে। কিন্তু অগ্রাধিকার দিয়ে ইন্ডিগোর বিমানটিকেই আগে অবতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
বুঝতেই পারছেন যে এই পুরো প্রক্রিয়াটা মোটেই সহজ নয়। বরঞ্চ বেশ জটিল। নির্দেশাবলির প্রণয়নের দেড় বছরের পর এই প্রথম বিমানে কোনও 'অঙ্গ' এল কলকাতায়। বলা যেতেই পারে প্রথম অ্যাসিড টেস্টে চূড়ান্ত ভাবে সফল বিমানকর্মীরা।

