আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো কেন আগে মেটান প্রয়োজন?
ভালো কর্পোরেট পরিষেবার অঙ্গ হিসেবে অভ্যন্তরীণ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে
- Total Shares
আইসিআইসিআই ব্যাঙ্ক যদি মনে করে যে তড়িঘড়ি বোর্ডের বৈঠক ডেকে একটা বিবৃতি দিয়ে দিলেই ব্যাঙ্কের ম্যানেজিং ডিরেক্টর-সিইও চন্দা কোছারের যে স্বার্থের সঙ্ঘাত রয়েছে তা ধামাচাপা দিয়ে দেওয়া যাবে, তা হলে ব্যাঙ্ক কিন্তু ভুল করবে।
ব্যাঙ্কের বোর্ড যে এই ঋণটি পাইয়ে দেওয়া ব্যাপারে যে খুব তদারকি করেছে এমন নয়। কিন্তু গণমাধ্যমে তাদের বিবৃতিটি প্রকাশিত হওয়ার পর অনেকগুলো বিষয় উঠে এসেছে। আর্থিক অসঙ্গতি যে হয়েছিল সেটা পরিষ্কার। ভিডিয়োকনের বেণুগোপাল ধূতকে আইসিআইসিআই ব্যাঙ্ক যে ৩,২৫০ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছিল। আবার বেণুগোপাল ধূতের সঙ্গে ব্যাঙ্কের এমডি-সিইও চন্দা কোছারের স্বামী দীপক কোছারের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল।
বিবৃতিতে এটাও পরিষ্কার যে দীপক কোছারের বায়ুশক্তি উৎপাদনকারী সংস্থা নিউপাওয়ার (নুপাওয়ারের) সঙ্গে ভিডিয়োকনের বিভিন্ন পর্যায়ে লেনদেন চলেছিল। যদিও উদ্যোগপতি হিসেবে দীপক কোছার মুম্বইয়ের ব্যবসায়িক জগতে তেমন একটা পরিচিত নাম নয়। তা সত্ত্বেও তাঁর সংস্থাটিতে এই ধরনের লেনদেন সবাইকে অবাকই করেছে। ২০০৮ সালে দীপক কোছার ও বেণুগোপাল ধূত যৌথ ভাবে যে সংস্থাটি তৈরি করেন, তাতে উভয়ের ৫০ শতাংশ করে অংশীদারিত্ব ছিল।
নিউপাওয়ারের নির্দেশক পদ ২০০৯ সালে কেন ছাড়লেন বেণুগোপাল ধূত এবং কেন তিনি দীপক কোছারের সংস্থাকে তাঁর ২৪,৯৯৯টি শেয়ার ২.৫ লক্ষ টাকায় দিয়ে দিলেন?সুপ্রিম এনার্জি প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি সংস্থা, যেখানে বেণুগোপাল ধূতের ৯৯.৯ শতাংশ মালিকানা রয়েছে, সেই সংস্থা থেকে ২০১০ সালে দীপক কোছারের নিউপাওয়ার নামে সংস্থাকে ৬৪ কোটি টাকা ঋণ (পুরোপুরি শেয়ারে পরিবর্তনযোগ্য ঋণপত্র বা fully convertible debenture)দিল?
পিনাকেল এনার্জি নামে ট্রাস্টি তৈরি করা, যার ম্যানেজিং ট্রাস্টি হলেন দীপক কোছার, এবং সেই সঙ্গে অন্যান্য লেনদেনের ব্যাখ্যাই বা কী?

আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কের তরফে জানান হয়েছে যে, "চন্দা কোছারের উপর আমাদের সম্পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস আছে।" যদিও ফোনে একটি সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় বেণুগোপাল ধূত বলেন, "আমি নিউপাওয়ার সংস্থায় কোনও টাকা বিনিয়োগ করিনি।” তিনি জানান, যখন তিনি ও দীপক কোছার যৌথ ভাবে ব্যবসা করবেন বলে ঠিক করেন তখন তাঁরা এই এক লক্ষ টাকা পুঁজি নিয়ে এই সংস্থাটি শুরু করেন। এ ছাড়া দীপকের সঙ্গে শক্তি উৎপাদন সংস্থাটির অন্য কোনওরকম আর্থিক লেনদেন হয়নি। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে ভালো কর্পোরেট পরিষেবার যা মান হওয়া উচিৎ তা থেকে কতটা বিচ্যুতি ঘটেছে।
আর একটি বিবৃতি অনুযায়ী চন্দা কোছারের দেবর তথা দীপকের ভাই রাজীব কোছারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিবৃতি অনুযায়ী যারা আইসিআইসিআই ব্যাঙ্ক থেকে বিদেশে ব্যবসার জন্য ঋণ নিয়েছিলেন তাদের রাজীব কোছার পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং বিদেশি মুদ্রায় নেওয়া ১৭০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি অঙ্কের ঋণ ৬ বছরের জন্য পুনর্গঠনে সহায়তা করেন।
২০১২ সালে আইসিআইসিআই ব্যাঙ্ক থেকে ৬৫০ কোটি টাকা ঋণ নেয় ভিডিয়োকন গোষ্ঠীর অধীনে থাকা পাঁচটি সংস্থার মধ্যে একটি সংস্থা, ২০১১ সালে যে সংস্থাটির মোট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৭৫ কোটি টাকা এবং নিট মুনাফা ছিল ৯৪ লক্ষ টাকা। প্রশ্ন উঠছে, একটি কোম্পানি কী ভাবে তার মোট বিক্রির অঙ্কের ন’গুণ টাকা পেল। আরও বড় ব্যাপার হল যে, ওই গোষ্ঠীর অধীনে থাকা পাঁচটি সংস্থার প্রত্যেকটিই ঠিক ৬৫০ কোটি টাকা করে পেয়েছে, যা দেখে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।
রাজীব কোছারের পরামর্শদাতা সংস্থা অভিস্তা অ্যাডভাইজারির মাধ্যমে আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কে ঋণ নেওয়ার যে পরামর্শ দেওয়া হত, তাতে স্বার্থের সংঘাত নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে সে ব্যাপারে ব্যাঙ্কের বক্তব্য, “কোম্পানি আইন ১৯৫৬ এবং ২০১৩ এবং ওই আইনের অন্তর্গত কোনও নিয়মে ‘আত্মীয়’ শব্দের সংজ্ঞার মধ্যে স্বামীর ভাই পড়ে না, তাই এই ধরনের সম্পর্কের কথা ব্যাঙ্ককে জানানোর কোনও প্রয়োজন হয় না কোনও ব্যাঙ্ক আধিকারিকের।”
ভাষার মারপ্যাঁচে প্রমাণ করেই দেওয়া যায় যে কেউ সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়নি, কিন্তু নৈতিকতার বিচার কোনও কর্পোরেট সংস্থাকে আরও উদার হতে হয় এবং স্বচ্ছতা অবলম্বন করতে হয়। অর্থাৎ শব্দ ও পরিভাষার মারপ্যাঁচের ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃত সত্য প্রকাশ করার প্রয়োজন হয়।
ভিডিয়োকোনকে ঋণ মঞ্জুর করার জন্য যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল, সেখানে তাঁর স্বামীর সঙ্গে বেণুগোপাল ধূতের ব্যবসায়িক সম্পর্কের কথা প্রকাশ করে চন্দা কোছার কেন নিজেকে সরিয়ে নিলেন না?
আইসিআইসিআই ব্যাঙ্ক কী রাজীব কোছারের ব্যবসায়িক লেনদেন সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিল না, আর যদি ব্যাঙ্ক ওয়াকিবহাল হয়েই থাকে, তাহলে তারা কেন প্রথম থেকে এ দিকে নজর দিল না? তারা কী বুঝতে পারেনি যে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে, বিশেষ করে যখন ভিডিয়োকনকে দেওয়া প্রায় ২,৮১০ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রদত্ত ঋণের প্রায় ৮৬ শতাংশের মতো অর্থ ২০১৭ -তে অনাদায়ী ঋণ বলে ঘোষণা করা হয়?
আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কের কিন্তু চন্দা কোছারের উপর পূর্ণ আস্থা আছে, তাই তারা ওঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তেমন একটা আমল দিচ্ছে না। তারা জানিয়েছেন যে, "ব্যাঙ্ক এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে, যে সব কথা উঠছে বা অভিযোগ সামনে আসছে সেটা ঠিক নয়। এখানে স্বজনপোষণের কোনও প্রশ্নই নেই।"
এখন অনেক তথ্যই যখন প্রকাশ্যে আসছে, তখন বোর্ডের কী ব্যাপারটাকে আরও একবার খতিয়ে দেখা উচিৎ নয়? যে ব্যাপারগুলো আগে প্রকাশ করা হয়নি, সেগুলোই এখন বিরাট হয়ে জনসমক্ষে আসছে, এই প্রশ্নের উত্তর কী ব্যাঙ্কের সিইওর কাছে আছে?
কোনও রকম অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও তার ফলাফল প্রকাশ্যে আনার কী কোনও প্রয়োজন নেই? আর যদি ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাঙ্কে কোনও রকম অসঙ্গতি ও স্বার্থের সংঘাত ধরা পড়ে তাহলে কী স্বচ্ছতা বজায় রাখা জন্য ব্যাঙ্কের সিইও পদ থেকে তিনি সরে যাবেন?

