বিমানবন্দরে কেন মোটা সুদের বিনিময় টাকা ধার দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে?

এই ব্যবসায়ীদের প্রভাব অপরিসীম, তাই কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না

 |  3-minute read |   17-08-2018
  • Total Shares

বিমানবন্দরে আজও সেই ব্যবসাটা বিদ্যমান। মোটা সুদে টাকা ধার দেওয়ার। এক শ্রেণীর যাত্রীদের দিন প্রতি ৭ থেকে ১০ শতাংশ সুদে টাকা ধার দেওয়া হয়। এখন প্রশ্ন হল, বিমান যাত্রীদের হঠাৎ মোটা সুদের বিনিময় ধারে টাকা নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে কেন?

কলকাতা বিমানবন্দরে এক শ্রেণীর যাত্রীর নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে, যাদের পোশাকি নাম ক্যারিয়ার প্যাসেঞ্জার (দেশের আরও কয়েকটি বিমানবন্দরে এই শ্রেণীর যাত্রীদের দেখতে পাওয়া যায়, তবে তারা সংখ্যায় নেহাতই কম)। দক্ষিণ পূর্ব এশীয় দেশগুলো, বিশেষ করে থাইল্যান্ড, থেকে সস্তার হোলসেল দরে জামাকাপড় ও ইলেক্ট্রনিক্স সরঞ্জাম কিনে নিয়ে আসে তারা, যা পূর্ব ভারতের কয়েকটি বাজারে বিক্রি হয়।

বিদেশ থেকে মাল কিনে তারা যখন কলকাতা বিমানবন্দরে নামে তখন শুল্ক দপ্তরের আধিকারিকরা তাদের 'আমদানি' করা মালের মূল্যর উপর শুল্ক ধার্য করে। অনেক সময়তেই এই শুল্ক মূল্য যা দাঁড়ায় সেই পরিমাণ টাকা তাদের পকেটে থাকে না। নিয়মানুযায়ী, শুল্ক কর না মেটাতে পারলে সেই মাল তখন শুল্ক দপ্তরের কাছে জমা রাখতে হয়। কিন্তু সরকারি নিয়মে মাল একবার বাজেয়াপ্ত হয়ে গেলে, পরবর্তীকালে সেই শুল্ক কর মিটিয়ে দিলেও, মাল ফেরত পাওয়ার পদ্ধতি অনেকটাই জটিল। ঝামেলাও বিস্তর। আর, তখনই ফেঁসে যাওয়া ক্যারিয়ার প্যাসেঞ্জাররকে উদ্ধার করতে চলে আসেন এই ঋণ প্রদানকারীরা।

এই টাকা ধার দেওয়ার ব্যবসা যে বেআইনি তা বলাইবাহুল্য। তাই এখানে লিখিত পড়িত কিছুই হয় না। লেনদেন যা হয় তা পুরোটাই বিশ্বাসের উপর। শুল্ক দপ্তরের আধিকারিকরা যখন শুল্ক কর দিতে না পারার জন্য মাল বাজেয়াপ্ত করতে উদ্যত হন তখন তারা এসে সংশ্লিষ্ট ক্যারিয়ার প্যাসেঞ্জারকে টাকা ধার দেন। সেই ধারের টাকায় শুল্ক কর শোধ করে শুল্ক দপ্তরের হাত থেকে রেহাই পান সেই সংশ্লিষ্ট ক্যারিয়ার প্যাসেঞ্জার। এরপর যিনি ধার দিচ্ছেন তিনি মাল জমা রেখে দেন। পরবর্তীকালে সেই সংশ্লিষ্ট কেরিয়ার প্যাসেঞ্জার সুদ সমেদ ধারের টাকা ফেরত দিয়ে মাল নিয়ে যান।

এই ব্যবস্থায়, একদিন বা দু'দিনের সুদের টাকা দিয়ে মাল উদ্ধার করা যায়। যেহেতু এই ব্যবস্থায় জটিল সরকারি প্রক্রিয়ার বালাই নেই তাই অতিরিক্ত সুদ দেওয়ায় সত্ত্বেও এই ব্যবস্থাকেই পছন্দ করেন ক্যারিয়ার ব্যবসায়ীরা।

বিমানবন্দরের শুল্ক দপ্তরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা মুখে যতই বলুন এই ব্যবস্থা বেআইনি, সত্যি কথা বলতে উদ্যোগ নেওয়াটাও অসম্ভব। আইন অনুযায়ী শুল্ক দপ্তরের আধিকারিকরা নিতেও পারেন না। তাঁদের কাজ শুল্ক কর ধার্য করে তা আদায় করা। যার উপর কর ধার্য হল সে কী ভাবে করের টাকা জোগাড় করল তা দেখার দায়িত্ব শুল্ক দপ্তরের নয়।

body_081718123702.jpgবিমানবন্দরের প্রবেশ পথ (পিটিআই)

বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বে যে সংস্থা সেই সিআইএসএফের ভূমিকা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কী ভাবে একজন অযাচিত লোক একবারের বিমানবন্দরের অ্যারাইভ্যাল লাউঞ্জ অবধি পৌঁছিয়ে গিয়ে সুদের ব্যবসা করতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তরে সিআইএসএফের কাছে অবশ্য একটি যুৎসই 'বাহানা' রয়েছে। তাদের বক্তব্য, চেষ্টা করেও তারা এই ব্যবসা বন্ধ করতে সফল হয়নি। এ ক্ষেত্রে উপায় এই সব অনাহুতদের বিমানবন্দরের ভিতরে প্রবেশ করতে না দেওয়া। সিআইএসফের বক্তব্য আটকে দিয়েও কোনও লাভ নেই। বিমানবন্দরে যে সমস্ত কর্মচারী কাজ করেন তাদের কাজে লাগিয়ে এই ব্যবসা দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছেন ঋণ প্রদানকারীরা।

সম্প্রতি বিমানবন্দর অঞ্চলের একটি বাড়িতে গুলি চলেছে। এই ঘটনায় নিহত হয়েছেন একজন। তদন্তে উঠে এসেছে যে এই খুনের কারণ এই ব্যবস্থায় টাকা ধার দিয়ে ফেরত না পাওয়া।

যিনি খুন হয়েছেন তিনি একটি দোকানদারের হয়ে বিদেশ থেকে মাল এনেছিলেন। বিমানবন্দরে শুল্ক কর মেটানোর জন্যে তিনি টাকা ধার নেন কিন্তু ঋণ প্রদানকারীকে নাকি সেই টাকা ফেরত দেননি। টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি কেন সে বিষয় এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি তদন্তকারী অফিসাররা। যে দোকানদারের হয়ে মাল আনা হচ্ছিল তিনি অবশ্য জানিয়েছেন যে সুদ সমেত ধারের টাকা ফেরত দিয়েও তিনি এখনও মাল পাননি। তদন্তকারীদের কাছে এখনও ছবিটা স্পষ্ট হয়নি।

এই ঘটনার তদন্তে কিন্তু আরও একটি জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে দোকানদাররা নিজেরা ক্যারিয়ার প্যাসেঞ্জারের ভূমিকা পালন না করে বিমানবন্দর লাগোয়া অঞ্চলের লোকেদের এই কাজের জন্যে নিয়োগ করেন।

সামান্য কিছু টাকা দিলেই এই কাজ করতে রাজি হয়ে যায় স্থানীয় লোকেরা। কারণ উপার্জনের থেকেও বাড়তি পাওনা বিনা পয়সায় দু'দিনের কী তিনদিনের বিদেশ ভ্রমণ। দোকানদারেরও সুবিধা। কারণ, স্থানীয় হওয়ার কারণে এ হেন ক্যারিয়ার প্যাসেঞ্জারদের ঠাটবাট নেহাতই কম নয়। এরা প্রত্যেকেই পাড়ায় রাজনীতি করে। এদের অধিকাংশই সেই সংস্থাগুলোতে কর্মরত যাদের বিমান সংস্থাগুলো বিভিন্ন কাজের জন্য নিয়োগ করে। সুতারং বিমানবন্দরের ভিতরেও এদের প্রভাব অপরিসীম।

কিন্তু এর পরেও কী ঘুম ভাঙবে বিমানবন্দর কর্তাদের? মনে তো হয় না।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

ARPIT BASU ARPIT BASU @virusfound007

Arpit Basu is the Special Correspondent with the India Today Group’s fact check team. With more than one-and-a-half decade's experience in print and digital media, he has reported on aviation, transport, crime, civic and human interests issues. His sting operation on how precious Aviation Turbine Fuel, meant for Kolkata airport, was pilfered and sold in local market as ‘white kerosene’ received widespread acclaim. Arpit has worked with reputed media houses like The Times of India and Hindustan Times and had received letter of appreciation for reporting during the Phalin cyclone in Odisha in 2013.

Comment