একটি মন্দ উপাখ্যান: মহানগরীর অটো পরিবহণের কালো অধ্যায়

'বড় দাদা' ট্যাক্সির চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করে অটোর আধিপত্য এখন রাজ্য জুড়েই

 |  4-minute read |   06-07-2018
  • Total Shares

'গরিবের ট্যাক্সি' হিসেবে পথ চলা শুরু। এখন অবশ্য 'মহানগরীর দৈত্য' হিসেবেই পরিচিত। কালো ধোঁয়া, চরম বিশৃঙ্খলতা সর্বোপরি জোর জুলুম - কলকাতার সঙ্গে তিন চাকার এই 'ঘৃণা-ভালোবাসার' সম্পর্ক কিন্তু বেশ পুরোনো।

আশির দশকের শুরুতে কলকাতার রাস্তায় অটোর আগমন। তখন কিন্তু কেউই ঘুণাক্ষরে আন্দাজ করতে পারেনি যে এই তিন চাকার আপাত 'শান্ত' যানটি মাত্র তিন দশকের মধ্যেই শহরের পরিবহণ ইতিহাসের একটা কালো অধ্যায় রচনা করে ফেলবে। এই অধ্যায় এতটাই ধূসর হবে যে বাজারে পাওয়া সব চেয়ে দামি ডিটারজেন্ট দিয়েও এই কালি সহজে উঠবে না।

অথচ বিরাশির শেষের দিকে, শহরের পথে নামার প্রথম দিন থেকেই, অফিস যাত্রীদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই অটো। ট্যাক্সির মতো মিটারে চলে অথচ ভাড়া অনেক কম। ট্যাক্সির মতোই বাসস্ট্যান্ডে নামতে হয় না, অথচ সরু গলিটা ধরে একেবারে বাড়ির দরজার সামনে পৌঁছান যায়। খুব দ্রুতই বাসের ফুটবোর্ডে ঝুলে বাড়ি ফেরা ক্লান্ত অফিস কেরানি প্রথম পছন্দ হয়ে ওঠে এই তিন চাকার বাহন।

শুধু অফিস ফেরতা ক্লান্ত কেরানি নয়। রবিবার দুপুরে পরিবার নিয়ে সান্ধ্য ভ্রমণেও অটোর বিকল্প নেই। আইনানুযায়ী পিছনের সিটে মাত্র তিন জন যাত্রী উঠতে পারে। কিন্তু চালকের আসনে তো পাড়ার বছর কুড়ির তরুণ যুবক। আর, পাড়ার দস্যি ছেলেরা আবার কবে আইনের তোয়াক্কা করেছে? পরিবারে চারজন কী পাঁচজন সদস্য একসঙ্গে বেরিয়েছে। কুছ পরোয়া নেহি! আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সামনের আসনে আরও একজন দুজন যাত্রী উঠে পড়বে। ক্ষেত্র বিশেষে (বিশেষ করে যদি যাত্রা পথের দুরুত্ব কম হয়) তিনজন। মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে অটোর জনপ্রিয়তা তখন ছিয়াশির মারাদোনার থেকেও তুঙ্গে।

body1_070618082023.jpgঅটো মানেই অবাধ্য, অটো মানেই উশৃঙ্খল

কিন্তু এই জনপ্রিয়তাই কাল হল 'গরিবের ট্যাক্সির'। অভিজাতদের হলুদ বা কালো হলুদ (সেই সময় চলত) রঙের চার চাকার ট্যাক্সি এই তিন চাকা যানের ব্যাপক জনপ্রিয়তায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ল। আইনি পথে লড়বে বলে আদালতের দ্বারস্থ হল। আদালতও অভিজাতদের পক্ষ নিল। নতুন অটোর পারমিটের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হল।

আর, এখান থেকেই অটোর রাজনীতিকরণের সূত্রপাত। অটোর (পড়ুন পাড়ার বেকার যুবক তথা অটো চালকদের) 'ভাত কাপড়ের' দায়িত্ব চলে গেল সেই অঞ্চলের রাজনৈতিক 'দাদার' হাতে। শুরু হল আইনকে ফাঁকি দিয়ে 'বেআইনিকে' আইনসিদ্ধ করে তোলার খেলা। এই রাজনৈতিক 'দাদাদের' সৌজন্যে আগামী কয়ে বছরের মধ্যেই অটো হয়ে উঠল শহরের পরিবহণ ব্যবস্থার এক অবাধ্য, অদম্য লাগামহীন প্রতীক।

আদালত নতুন পারমিটের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তো কী হয়েছে? টি নম্বর প্লেটে অটো বের করতে তো আর কোনও বাঁধা নেই। পাড়ার রাজনৈতিক 'দাদার' সস্নেহে মহানগরীর বুকে টিসি নম্বর প্লেট লাগানো অটো দাপিয়ে বেড়ালো। ২০০৮ সাল নাগাদ আদালতের নির্দেশে টু স্ট্রোক অটো বদলে ফোর স্ট্রোক (পরিবেশ বান্ধব) অটো নামানোর প্রক্রিয়া চলাকালীন সরকারি প্রকিয়ায় বিভিন্ন রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাঙ্কগুলোর তরফ থেকে ঋণের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিল। বহু অটো মালিকদের ঋণের আবেদন মঞ্জুর হয়নি মালিকদের পুরোনো অটোর বৈধ কাগজপত্র না থাকায়। সেই সময়, দক্ষিণ কলকাতার বেশ কিছু সিটু সমর্থক অটো মালিকেরা নিজেদের দোষ স্বীকার করে বলেছিলেন, "এত বছর ধরে করে আসা ভুলগুলোর মাশুল গুনতে হচ্ছে এখন।"

যদি পাড়ার দাদারা প্রথম ভুলটি করে থাকেন তাহলে পরবর্তী কালে এই অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়েছে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার। সেই প্রশ্রয় সমানে চলছে তৃণমূল জমানাতে। ১৯৯৬ সালে এই পাড়ার 'দাদারা' এক জোট হয়ে একই ছাতার তলায় এসে রাজ্য সরকারের দ্বারস্থ হন। ১৯৯৮ সালে তৎকালীন পরিবহণ মন্ত্রী তথা সিটু নেতা শ্যামল চক্রবর্তী 'সরকারিভাবে' অটোকে নির্দিষ্ট রুটে চলার বৈধতা দেন। একই সঙ্গে প্রায় ২০,০০০ হাজার মতো বেআইনি অটোকে সরকারি খাতায় 'আইনি' করে দেওয়া হয়। এর ফলে অটো বাসের মতো রুট ভিত্তিক চলতে লাগল। উল্টোদিকে ট্যাক্সি মালিকদেরও আতঙ্কিত হওয়ার আর কিছুই থাকল না।

কিন্তু অন্য জায়গায় সমস্যার সৃষ্টি হল। আইনানুযায়ী অটো মিটার ক্যারেজ। অর্থাৎ অটোকে মিটারে চলতে হবে। বাসের মতো স্টেজ ভিত্তিক ভাড়া ঠিক করে অটো নির্দিষ্ট রুটে চলতে পারবে না। যার ফলে অটোর ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আর সরকারের হাতে রইল না। এই ব্যবস্থা আজও এই তৃণমূল আমলে বহাল আছে। এতে অবশ্য অটোওয়ালাদের পোয়া বারো। নিজেদের খেয়াল খুশিমতো, নিজেদের ইচ্ছে মতো, নিজেদের সময় মতো ভাড়া বাড়িয়ে নিচ্ছেন। ২০০৯ সাল অবধি ভাড়ার তালিকার নিচে সিটুর স্ট্যাম্প মারা থাকত। ২০১৮ সালে প্রতিটি রুটের অটো ভাড়ার তালিকার তলায় আইএনটিটিইউসির স্ট্যাম্প।

body_070618082102.jpgঅটোকে চ্যালেঞ্জ করেও পরাজিত হলুদ ট্যাক্সি

এই ব্যবস্থা আর কোনও পরিবহণ মাধ্যমে নেই। যার ফলে ফুলেফেঁপে উঠছে অটো পরিষেবা। শুধু শহর বা শহরতলিতে নয় গোটা রাজ্যেই। বছর খানেক আগে শুধুমাত্র অটো রুট পরিবর্তন করে কলকাতার বড়বাজার থেকে নদীয়া-মুর্শিদাবাদ সীমান্তে পলাশীতে পৌছিয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। সময় হয়ত ঢের বেশি লেগেছিল। কিন্তু ৩৫ টি অটো বদল করে গন্তব্যে পৌঁছান সম্ভব হয়েছিল।

জন্ম লগ্নেই বড় দাদা ট্যাক্সির চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। কিন্তু কালের পরিহাস। অটো যেখানে গোটা রাজ্য জুড়েই নিজের আধিপত্য কায়েম করে ফেলেছে, তখন ওলা উবের আর সরকারের ভাড়া না বাড়ানো ইচ্ছের মাঝে হাসপাশ করছে ট্যাক্সি।

আসলে, খরগোশ কচ্ছপের দৌড়ে বোধহয় সবসময় কচ্ছপই জেতে। আর সেই কচ্ছপ যদি উশৃঙ্খল, অবাধ্য হয় তাহলে তো কথাই নেই।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

ARPIT BASU ARPIT BASU @virusfound007

Arpit Basu is the Special Correspondent with the India Today Group’s fact check team. With more than one-and-a-half decade's experience in print and digital media, he has reported on aviation, transport, crime, civic and human interests issues. His sting operation on how precious Aviation Turbine Fuel, meant for Kolkata airport, was pilfered and sold in local market as ‘white kerosene’ received widespread acclaim. Arpit has worked with reputed media houses like The Times of India and Hindustan Times and had received letter of appreciation for reporting during the Phalin cyclone in Odisha in 2013.

Comment