ভেঙে পড়ল ব্রিজ: সমস্যা কোথায়, সমস্যাগুলোর সমাধানই বা কী?
কোন সেতু রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার, তা স্বচ্ছ্বতার সঙ্গে প্রকাশ করা হোক
- Total Shares
২০১৬ সালের ৩১শে মার্চ বিবেকানন্দ রোড ফ্লাইওভার ভেঙে পড়ায় ২৭ জনের প্রাণহানি হয়েছিল। সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার স্মৃতি যখন ক্রমেই ভুলতে বসেছিল মহানগরী ঠিক তখনই শহরের দক্ষিণপশ্চিমে ভেঙে পড়ল আরও একটি সেতু। মঙ্গলবার দুপুরে ভেঙে পড়ল প্রায় চার দশক পুরোনো মাঝেরহাট সেতু। সরকারি হিসেবে অনুযায়ী এই দুর্ঘটনায় এখনও পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা এক। তবে এই দুর্ঘটনা আমাদের এক রাশ প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
প্রথমেই আমাদের বুঝতে হবে যে সৌভাগ্যক্রমে এই ঘটনার মৃতের সংখ্যা মাত্র এক। বিবেকানন্দ রোড ফ্লাইওভারের মতোই এই ঘটনার হতাহতের সংখ্যা যদি বিপুল হত তা হলেও অবাক হওয়ার মতো কিছু থাকত না। কলকাতা পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে দিনে প্রায় দেড় লক্ষ মতো লোক এই মাঝেরহাট ব্রিজের উপর দিয়ে যাতায়াত করে। এর অধিকাংশই অবশ্য সকাল বেলা ও সন্ধ্যাবেলার অফিস টাইমে। ব্যস্ত সময়ে যদি এই দুর্ঘটনা ঘটত তাহলে এর পরিণাম কী হতো তা ভাবলে সত্যিই শিউরে উঠতে হয়।
ষাটের দশকে মাঝেরহাট ব্রিজ তৈরি করেছিল কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষ। এই ব্রিজ তৈরির সময় দুটি ঘটনা নজর কাড়তে বাধ্য। যা ২০১৮ সালে কোনও পরিকাঠামোগত প্রকল্পে সচরাচর দেখা যায় না। এক, ১৯৬১ সালে এই ব্রিজ তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল এবং অনুমান করা গিয়েছিল যে ১৯৬৫ সালের জুন মাস নাগাদ এই ব্রিজ তৈরির কাজ সম্পন্ন হবে। কিন্তু তার এক বছর আগেই, অর্থ্যাৎ ১৯৬৪ সালের ৩০ অগস্ট এই ব্রিজ সর্বসাধারণের জন্যে চালু করে দেওয়া হয়। দ্বিতীয়, এই ব্রিজ তৈরির জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল ৪৭ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত খরচ হয় ৪২ লক্ষ টাকার সামান্য বেশি।
তিন কোটি টাকা খরচ করে ব্রিজ মেরামত হয়নি [ছবি: পিটিআই]
বর্তমানে এই ব্রিজের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব রাজ্য সরকারের পূর্ত দপ্তরের আধিকারিকদের হাতে। কিন্তু দুর্ঘটনার পর থেকেই রাজ্য সরকার এই দুঘটনার দায়ে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের ঘাড়ে চাপাতে চাইছে। সরকারের বক্তব্য, এই ব্রিজ লাগোয়া জমিতে জোকা-বিবাদিবাগ মেট্রো রেল প্রকল্পের কাজ চলেছে। তার ফলেই মাটির তলায় কম্পন হয়। আর, সেই কম্পনের জেরেই এই দুর্ঘটনা। স্বভাবতই, মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এই দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে কাটাছেঁড়া করতে বসলে কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যার উত্তর একমাত্র পূর্ত দপ্তরের আধিকারিকরাই দিতে পারবেন।
১) ২০১৫ সালের পূর্ত দপ্তরের নিজস্ব অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছিল এই ব্রিজটি অবস্থা বিপজ্জনক। কিন্তু তার পরেও সরকার এই ব্রিজ মেরামতিতে উদ্যোগী হল না।
২) ২০১৬ সালের অডিট রিপোর্টেও পূর্ত দপ্তরের ইঞ্জিনিয়াররা এই ব্রিজকে বিপজ্জনক বলে আখ্যা দিয়েছিল। কিন্তু সে বছরেও ব্রিজ মেরামতির কোনও চেষ্টা করা হয়নি।
৩) এ বছরের জুন মাসে কলকাতা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ পূর্ত দপ্তরকে সতর্ক করে জানিয়েছিল যে ব্রিজের অবস্থা ভালো নয়।
৪) পূর্ত দপ্তরের আধিকারিকরা শুধুমাত্র ব্রিজের উপরের রাস্তাটিকে মেরামত করল। যদিও অনেকেই দাবি করছেন সেই সময় মুখ্যমন্ত্রীর ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে সরকারি অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল। সেই জন্য ডায়মন্ড হারবার রোডের বেশ কিছু অংশের পাশাপাশি মাঝেরহাট ব্রিজের উপরকার রাস্তায় মেরামত করা হয়েছিল। দেখা যাচ্ছে এই কাজটির জন্য এপ্রিল মাসে যে টেন্ডার ফ্লোট করা হয়েছিল পূর্ত দপ্তরের তরফ থেকে তাতে মাত্র ১.২৮১ কিলোমিটার রাস্তা মেরামতের জন্যে সম্ভাব্য খারচ ধরা হয়ে ছিল ১৬,১৮,১৮১ টাকা।
রাস্তা মেরামতে খরচ পড়েছিল ১৬ লক্ষ টাকা
৫) ১৬ লক্ষ টাকা খরচ করে ১.৩ কিলোমিটার মতো রাস্তা মেরামত করা গেল তখন তিন কোটি টাকা খরচ করে সেতু মেরামত করা গেল না কেন? ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিশেজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছিলেন যে অনতিবিলম্বে ব্রিজের একটি অংশের আরসিবি গার্ডারের সংস্কার প্রয়োজন। এর জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। সড়কের নির্ধারিত দর ছিল ২ কোটি ৮১ লক্ষ টাকা আর ঠিকাদার সংস্থাগুলোর থেকে নূন্যতম দরপত্র এসেছিল ৩ কোটির টাকার কিছু বেশি। অর্থাৎ, সরকারি দরের থেকে মাত্র ৩ শতাংশ বেশি। অথচ সেই টাকাও মঞ্জুর হয়নি সরকারের তরফ থেকে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে শহরের অন্যান্য ব্রিজগুলোর জন্যে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপগুলো ঠিক কি হওয়া উচিত।
১) সর্বপ্রথম শহরের প্রতিটি সেতুর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কোন কোন বিভাগের অধীনে রয়েছে সে সম্পর্কে আরও বেশি স্বচ্ছ হতে হবে।
২) দুই প্রতিটি ব্রিজের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ অডিট করে দেখতে হবে ব্রিজের কোথায় কোথায় এবং কোন কোন যন্ত্রপাতিতে সমস্যা রয়েছে।
৩) মেরামতির সময় যদি আর্থিক সমস্যা থাকে, সে েক্ষত্রে অডিট রিপোর্ট এমন ভাবে তৈরি করতে হবে যাতে প্রতিটি কাজের গুরুত্ব আলাদা করে লেখা থাকে। এর ফলে শুধুমাত্র যে কাজটি সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ সেই কাজটি যাতে আগে করিয়ে নেওয়া যায়।
৪) ঠিকাদার সংস্থার ঠিকুজিকোষ্ঠি খতিয়ে দেখে তারপরেই যেন মেরামতি কাজের বরাত দেওয়া হয়। ভালো ঠিকাদার সংস্থাকে বরাত দিতে গেলে বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ যদি বাড়ে তা হলে তা আর্থিক পরিমাণ বাড়াতেই হবে। ভালো ঠিকাদার সংস্থার সঙ্গে আপোশ করে কম খরচে কাজ করানো কখনোই উচিত হবে না।
৫) সারা বছরের নিয়মমাফিক মেরামতির কাজের জন্যে আলাদা করে দল গঠন করতে হবে। দেখতে হবে যাতে এই দলের সদস্যরা খুব বেশি যেন বদল না হয়। একজন যদি অনেকদিন ধরে একটি ব্রিজের উপর মনোনিবেশ করে তাহলে সেই ব্রিজের সমস্যাগুলো সম্পর্কে তিনি বেশি ওয়াকিবহাল থাকবেন।
বিশেষজ্ঞদের এই অভিমতগুলো বেশ যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে। এখন দেখার বিষয় সরকার এর ওর উপর দোষ না চাপিয়ে এই মতামতগুলো কার্যকর করতে কবে থেকে সচেষ্ট হয়।

