ঢাকায় আগামী বছরই চালু হয়ে যাবে স্বপ্নের মেট্রোরেল
পাঁচ মিনিট অন্তর অন্তর ছাড়বে এসি ট্রেন, উত্তরা থেকে মতিঝিল সময় লাগবে ৩৭মিনিট
- Total Shares
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে এবং যানজট নিরসনের লক্ষ্যে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ। নির্ধারিত স্থানে মাটির গভীরে খনন করে চলছে অবিরাম পাইলিংয়ের কাজ। সেই সঙ্গে ডিপো ও স্টেশন নির্মাণের কাজও চলছে বেশ দ্রুত গতিতে। ইতিমধ্যে উত্তরা দিয়াবাড়ি বসানো হয়েছে প্রথম স্প্যান। রাজধানী শেরে বাংলা নগর কৃষিবিদ্যালয়ের দ্বিতীয় গেটের সামনে বসছে দ্বিতীয় স্প্যান। আগামী বছরের ডিসেম্বরের আগেই মেট্রোরেলের উত্তরা-আগারগাঁও অংশ ট্রেন চলাচলের জন্য প্রস্তুত হবে এমন আশা করছেন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্তরা।
রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়ির খিলক্ষেত, বনানী, মিরপুর-১০, ১১, ১২, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, তালতলা ও আগারগাঁওয়ের সড়কজুড়ে অবিরত চলছে মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ। উত্তরা দিয়াবাড়িতে এখন চলছে প্রশাসনিক ভবন, ওয়ার্কশপ, ট্রেন শেড-সহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কাজ। দ্বিতীয় প্যাকেজের আওতায় চলছে চেক বোরিং ও টেস্ট পাইলের কাজ। এদিকে আগারগাঁও এলাকায় প্রকল্পের পাইলিংয়ের জন্য বিশাল আকৃতির ক্রেন, এস্ক্যাভেটর বসানো হয়েছে। খননের সময় যে সব মাটি নীচ থেকে তোলা হচ্ছে সেগুলো বক্সে করে উত্তরায় একটি ডাম্পিং সাইটে নিয়ে ফেলা হচ্ছে। অন্যদিকে দুর্ঘটনা এড়িয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় ব্যবহার করা হচ্ছে ‘হার্ড ব্যারিয়ার’। এর উপরে দেওয়া হয়েছে কাঁটাতারের ব্যারিকেড।
মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজের অগ্রগতির নিয়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ শাহজাহান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে ১৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। প্রতিদিনই কাজের অগ্রগতি বাড়ছে। যে ভাবে কাজ চলছে আশা করি নির্ধারিত সময়ের বহু আগেই কাজ শেষ হবে।
জাতীয় পতাকার সঙ্গে মিল রেখে মেট্টোরেলে থাকবে লাল সবুজের সমাহার
কি উপকার পাবে রাজধানীবাসী?
মেট্রোরেল ব্যবস্থা চালু হলে, যোগাযোগ ব্যবস্থায় সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে চলমান প্রকল্পটি। চোখের পলকে ছুটবে ট্রেন। উত্তরা থেকে মতিঝিল আসতে সময় লাগবে মাত্র ৩৭মিনিট। পাঁচ মিনিট অন্তর অন্তর ছাড়বে এসি ট্রেন। সম্পূর্ণ এলিভেটেড মেট্রোরেলে প্রতি ঘণ্টায় উভয়দিকে ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহণের সক্ষমতা থাকবে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত থাকবে ১৬টি স্টেশন। সাড়ে তিন মিনিট অন্তর অন্তর ট্রেন থামবে। থাকবে আধুনিক রেল স্টেশন। চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে রাস্তা থেকে স্টেশনে প্রবেশ করা যাবে। ‘প্রিপেড কার্ড' দিয়ে ট্রেনের ভাড়া পরিশোধ করতে পারবেন যাত্রীরা। আবার টিকিট কেটে ভ্রমণেরও সুযোগ থাকবে। স্বয়ংক্রিয় ভাবে খুলবে প্ল্যাটফর্মের প্রবেশদ্বার। বিদ্যুতে চলবে দ্রুত গতিসম্পন্ন এই ট্রেন।
যেভাবে এগিয়ে চলছে কাজ
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থানা পরিচালক এম এ সিদ্দিক জানিয়েছেন, মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে ১৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। প্রথম প্যাকেজের কাজ নির্ধারিত সময়ের ৯ মাস আগেই শেষ হয়েছে। এখন চলছে দ্বিতীয় প্যাকেজের কাজ। কাজের অগ্রগতি নিয়ে কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট। তাঁরা আশাবাদী নির্ধারিত সময়ের বহু আগেই মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।
ফ্লাইওভার নির্মাণের মতো এই প্রকল্পেও ভোগান্তির শিকার হওয়ার আশঙ্কা ছিল নগরবাসীর। কিন্তু কর্তৃপক্ষের নানামুখী জনবান্ধব পদক্ষেপের কারণে নির্মাণকাজে দুর্ভোগ অনেক কমেছে। সম্প্রতি উত্তরা, মিরপুর ও আগারগাঁও ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
প্রকল্প সূত্র জানায়, জনদুর্ভোগ কমাতে রাস্তার দু’দিকে দু’টি করে চারটি লেন খোলা রাখা হয়েছে। মাঝে মিডিয়ান ঘিরে কাজ চলছে। সড়কে যাতে ধুলােবালি না ওড়ে সে জন্য হার্ড ব্যারিয়ার (কংক্রিট ও লোহার বেড়া) স্থাপন করা হয়েছে। নিয়মিত পানিও ছিটানো হচ্ছে। তা ছাড়া মাটি খননের সময় যে সব মাটি ওঠে সেগুলো বক্সে তুলে উত্তরায় একটি ডাম্পিং সাইটে নিয়ে ফেলা হয়। দুর্ঘটনা এড়িয়ে নির্বিঘ্নে কাজ করতে নিরাপত্তার জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় ‘হার্ড ব্যারিয়ার’ ব্যবহার করা হচ্ছে। এর উপরে দেওয়া হয়েছে কাঁটাতারের ব্যারিকেড। ফলে নির্মাণ কাজের ধুলােবালি বা নির্মাণ সামগ্রী নির্ধারিত এলাকার বাইরে যাচ্ছে না। এই পদ্ধতি ব্যবহার করায় সফলতা পাওয়া যাচ্ছে। প্রকল্প এলাকায় ভোগান্তি নেই বললেই চলে।
সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে মেট্রোরেলের কোচ কেনার জন্য জাপানি প্রতিষ্ঠান কাওয়াসাকি মিৎসুবিসি কনসর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সরাসরি বিষয়টির তদারকি করছেন।
গত বছরের ২৬ জুন মেট্রোরেল প্রকল্পের লাইন-৬ এর নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় সরকার। এতে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জিকা) দেবে ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। আর সরকার দেবে পাঁচ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। প্রকল্প হাতে নেওয়ার পর থেকে মাটি পরীক্ষা, ইউটিলিটি সার্ভিস স্থানান্তর-সহ নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে প্রকল্পের কাজ।
প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা (ফোটো: মতিউর রহমান টুকু)
চলন্ত সিঁড়ি বেয়ে প্ল্যাটফর্মে পৌঁছানো যাবে
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রাস্তার মাঝ বরাবর উড়াল পথের (ভায়াডাক্ট) উপর স্থাপিত ডাবল রেললাইন থাকবে। ছয় মিটার চওড়া এই উড়ালপথে উভয়দিক থেকে ট্রেন চলাচল করতে পারবে। রাস্তার উপর ঝুলন্ত স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, দৈর্ঘ্য হবে ১৭০ মিটার। নিচতলায় হবে টিকিট কাউন্টার ও স্বয়ংক্রিয় প্রবেশদ্বার। চলন্ত সিঁড়ির মাধ্যমে যাত্রীরা প্ল্যাটফর্মে পৌঁছবেন। ইলেক্ট্রিক ট্রেন চলবে বিদ্যুতের সাহায্যে। প্রতি সাড়ে তিন মিনিট পর ট্রেন স্টেশনে থামবে। সরকারের ১০টি অগ্রাধিকার প্রকল্পের একটি মেট্রোরেল।
চলবে ২৮ জোড়া ট্রেন
পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হবার পর মোট ২৮ জোড়া মেট্রোরেল চলাচল করবে রাজধানীতে। রাস্তার মাঝ বরাবর উপর দিয়ে উত্তরা থেকে শুরু হয়ে মিরপুর-ফার্মগেট হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত যাবে এই মেট্রোরেল। প্রতি মেট্রোরেলে ৬টি কোচ থাকবে। প্রতি বর্গমিটারে ৮ জনের হিসাবে ব্যস্ততম সময়ে ১ হাজার ৮০০ যাত্রী চলাচল করতে পারবেন। মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা লাগবে; যার ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকাই দেবে জাইকা। বাকি ৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা জোগাবে সরকার। তবে এ সুবিধার যাত্রা শুরু হতে আরও অপেক্ষা করতে হবে দুই বছরের বেশি সময়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের একটি অংশের যাত্রা শুরুর কথা রয়েছে।
প্রথম প্রকল্পের রুট
মেট্রোরেল লাইন-৬-এর রুট এলাইনমেন্ট হল উত্তরা তৃতীয় পর্ব-পল্লবী-রোকেয়া সরণির পশ্চিম পাশ দিয়ে খামারবাড়ি হয়ে ফার্মগেট-হোটেল সোনারগাঁ-শাহবাগ-টিএসসি-দোয়েলচত্বর-প্রেসক্লাব-বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত। ১৬টি স্টেশন হচ্ছে- উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, দক্ষিণ পল্লবী, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কাওরান বাজার, শাহবাগ,টিএসসি, প্রেসক্লাব ও মতিঝিল।
২ মিনিট পর পর মেট্রোরেল
পাইলিংয়ের জন্য বিশাল আকৃতির ক্রেন, এস্কেভেটর বসানো হয়েছে। মিরপুর-১২, ১১, ১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, তালতলা ও আগারগাঁওয়ের সড়কে- এখন দিনরাত চলছে নির্মাণযজ্ঞ। লক্ষ্য একটাই- রাজধানী ঢাকাকে যানজট মুক্ত করতে ২০১৯ সালের মধ্যে মেট্রোরেল চালু করা। আর এ লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে দ্রুত গতিতে। প্রকল্প সূত্র মতে, উত্তরা তৃতীয় প্রকল্প থেকে মিরপুর, আগারগাঁও,ফার্মগেট ও মতিঝিল। ২০ দশমিক ১ কিলোমিটারের এই পথে মেট্রোরেল থামবে ১৬ স্টেশনে। এটি পরিচালনা করছে সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরা থেকে মতিঝিল আসতে সময় লাগবে মাত্র ৩৭ মিনিট। বিদ্যুৎচালিত এই ট্রেনের গতি হবে ঘণ্টায় গড়ে ৩২ কিলোমিটার। এ রুটে ৬টি করে বগির ১৪টি ট্রেন চলাচল করবে। প্রতিটিতে এক হাজার ৬৯৬ জন যাত্রী চলতে পারবে। এরমধ্যে আসনে বসতে পারবে ৯৪২ জন এবং দাঁড়িয়ে থাকবে ৭৫৪ জন। এতে প্রতি ঘণ্টায় উভয় দিক থেকে ৩০ হাজার করে ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহণ করা যাবে।
২০১৯ সালে যখন এটি প্রথম চালু হবে, তখন সাড়ে ৩ মিনিট অন্তর মেট্রোরেল ছেড়ে যাবে। চাহিদা বেশি থাকলে ২ মিনিট পর পরও ট্রেন ছাড়া যাবে। সূত্র মতে, উত্তরা তৃতীয় ফেজ থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত এ প্রকল্পের সম্পূর্ণ কাজ ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এম এ এন সিদ্দিক বলেন, এখানে লাল এবং সবুজ রঙয়ের প্রাধান্য রেখেই মেট্রোরেলের ডিজাইন করা হচ্ছে। প্রথম দিকে আমরা ৬টি বগি দিয়ে ট্রেন চালু করছি। তবে সেখানে একটি ব্যবস্থা রেখে দিয়েছি- যাতে ভবিষ্যতে ৮টি বগি দিয়ে চালানো যায়।
তিনি বলেন, যে কন্ট্রোল সিস্টেম আমি ইনস্টল করছি, সে অনুযায়ী- সাড়ে ৩ মিনিট পর পর ট্রেনগুলো যেতে থাকবে। তবে চাহিদা থাকলে দেড় মিনিট কমিয়ে ২ মিনিট করা যাবে। সে ব্যবস্থাও রেখে দিয়েছি। অর্থাৎ দুই মিনিট পর পর ট্রেন চালাতে পারব। সড়কের ডিভাইডার বরাবর সরু পিলারের ওপর বসানো রেলওয়ে ট্র্যাকের উপর দিয়ে এই মেট্রোরেল চলবে। তবে সড়কের মাঝখান দিয়ে গেলেও এতে নিচের রাস্তার কোনো প্রভাব পড়বে না। প্রকল্প পরিচালক বলেন, বিভিন্ন জায়গায় পিলারের সাইজ বিভিন্ন হবে। অধিকাংশ পিলারই হবে এক মিটারের ভিতরে। এটার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ উভয়ই এক মিটার করে হবে। রাস্তার নিচের জায়গাটা যে ভাবে ছিল তা পরিপূর্ণ ভাবে ব্যবহার করা যাবে।
তিনি বিশ্বাস করেন, মেট্রোরেল চালু হলে এই রুটে যানজট অভাবনীয় পর্যায়ে কমে আসবে। কারণ প্রতি ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী মেট্রোরেলে পার হতে পারবে। এম এ এন সিদ্দিক বলেন, ট্রেনগুলো নির্দিষ্ট সময় মেনেই চলাচল করবে। ট্রেনটি যদি ১০টা ৩ মিনিট ৫ সেকেন্ডে ছাড়ার কথা থাকে, তবে অবশ্যই ১০টা ৩ মিনিট ৫ সেকেন্ডে ছাড়বে।
মেট্রোরেল চালু হলে যানজট অভাবনীয় পর্যায়ে কমে আসবে (ফোটো: মতিউর রহমান টুকু)
পাঁচ মেট্রোরেল রুট
রাজধানীর যানজট নিরসনে কৌশলগত পরিবহণ পরিকল্পনার (এসটিপি) অংশ হিসেবে পাঁচটি রুটে নির্মাণ করা হচ্ছে মেট্রোরেল। এর মধ্যে রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ম্যাস র্যাণপিড ট্রানজিট-এমআরটি-৬ আগামী জুনে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উত্তরা তৃতীয় পর্যায়ের দিয়াবাড়ী বাজার এলাকায় মেট্রোরেল ডিপোর উন্নয়নকাজ পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষে মেট্রোরেল রুট-৬-এর ডিপো উন্নয়নের কাজ শুরু হয়েছে। আগামী মাসেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বপ্নের এ প্রকল্পের নির্মাণকাজের সূচনা করবেন। এ ছাড়া রাজধানীতে পর্যায়ক্রমে আরও চারটি মেট্রোরেল রুট বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে দুটির সমীক্ষাসহ প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। চারটি মেট্রোরেল রুটের মধ্যে গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর দিয়ে কমলাপুর হয়ে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল পর্যন্ত এমআরটি-১ নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি আশুলিয়া-সাভার-গাবতলী-ঢাবি-নগর ভবন-কমলাপুর পর্যন্ত এমআরটি-২, কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত এমআরটি-৪ এবং গাবতলী-মিরপুর-গুলশান-ভাটারা পর্যন্ত এমআরটি-৫ নামে একটি রিং মেট্রোরেল নির্মাণ করা হবে।
সূত্র জানায়, এমআরটি-৬-এর মেট্রোরেলের ডিপো নির্মাণের জন্য ২৭ মার্চ একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। রাজধানীর উত্তরা তৃতীয় পর্বে মেট্রোরেলের ডিপো নির্মাণের কাজ দেওয়া হয়েছে জাপানের টোকিও কনস্ট্রাকশন লিমিটেডকে। গতকাল ডিপো এলাকা পরিদর্শনকালে ওবায়দুল কাদের বলেন, মেট্রোরেলের ডিপো এলাকার ভূমি উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণে ব্যয় হবে ৫৬৭ কোটি টাকা। মন্ত্রী বলেন, অর্থায়নকারী সংস্থা জাইকার সম্মতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নকাল এগিয়ে আনা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, ২০১৯ সালে মেট্রোরেল রুট-৬-এর বাণিজ্যিক পরিচালনা সম্ভব হবে। ওবায়দুল কাদের বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি ভবন, টিএসসি, জাতীয় জাদুঘরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পাশ দিয়ে রুট নির্মাণে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির শব্দ নিরোধক যন্ত্র স্থাপন করা হবে। প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পে জাইকা দিচ্ছে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকা।
জানা গেছে, আগামী ২০ বছরে বাস্তবায়নযোগ্য সংশোধিত কৌশলগত পরিবহণ পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) পাঁচটি মেট্রোরেল নির্মাণে ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আরএসটিপিতে তিনটি মেট্রোরেল রুট দ্রুত নির্মাণের সুপারিশ রয়েছে। মেট্রোরেলের পাঁচটি রুটের মধ্যে বর্তমানে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২১ কিলোমিটার রুটটি জুন থেকেই গতি পাবে। এমআরটি-১ গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর সড়ক দিয়ে বিদ্যমান রেলপথ ধরে কমলাপুর হয়ে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল পর্যন্ত যাবে। এ ক্ষেত্রে প্রথম পর্যায়ে গাজীপুর-বিমানবন্দর অংশ ২০২৫ সালে ও দ্বিতীয় পর্যায়ে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর হয়ে ঝিলমিল পর্যন্ত ২০৩৫ সালে নির্মাণ করা হবে।
প্রথম পর্যায়ের দৈর্ঘ্য হবে ২৬ দশমিক ৬ কিলোমিটার, আর দ্বিতীয় পর্যায়ের দৈর্ঘ্য ৫২ কিলোমিটার। এমআরটি-২-এর সম্ভাব্য রুট ধরা হয়েছে আশুলিয়া থেকে শুরু করে সাভার, গাবতলী হয়ে মিরপুর রোড দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নগর ভবনের সামনে দিয়ে কমলাপুর পর্যন্ত। এ মেট্রোরেলের দৈর্ঘ্য হবে ৪০ কিলোমিটার ও ব্যয় ৩৭৫ কোটি ডলার। এমআরটি-৪ নির্মাণ করা হবে কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত। উড়ালপথে ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেলটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭৪ কোটি ডলার। এমআরটি-৫ হবে অনেকটা রিং মেট্রোরেল। এটি নির্মাণ করা হবে ভুলতা থেকে বাড্ডা, মিরপুর সড়ক, মিরপুর-১০, গাবতলী বাস টার্মিনাল, ধানমন্ডি,বসুন্ধরা সিটি (পান্থপথ) হয়ে হাতিরঝিল লিঙ্ক রোড পর্যন্ত। এটি মূলত এমআরটি-১, ২, ৪ ও ৬-কে সংযুক্ত করবে। ৩৫ কিলোমিটার এ মেট্রোরেলটির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২৮ কোটি ডলার।পাঁচটি মেট্রোরেল প্রকল্পের মধ্যে এমআরটি-৬-এর অংশ উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২১ কিলোমিটার নির্মাণকাজ চলছে। এমআরটি-১-এর বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত অংশেরও অর্থায়ন করবে জাইকা।
ইতিমধ্যে এ অংশের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়েছে। ২৮ অক্টোবর প্রকল্পটির প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন সড়ক পরিবহণ মন্ত্রণালয়ে জমা দেয় জাইকা। এতে বলা হয়েছে, মেট্রোরেল নির্মাণ সম্পন্ন হলে কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত যাতায়াতে লাগবে ২৩ মিনিট। এ রুটের মেট্রোরেলের দৈর্ঘ্য হবে ১২ দশমিক ৬ কিলোমিটার। পুরো পথে স্টপেজ থাকবে ১১টি। ২০২৫ সালের মধ্যে এটি নির্মাণ শেষ করার কথা বলা হয়েছে। পূর্বাচলকে মেট্রোরেল সুবিধার আওতায় আনতে পরবর্তীতে একে বারিধারা থেকে পূর্বাচলে সম্প্রসারণের সুপারিশও করা হয়েছে। এ ছাড়া এমআরটি-৫ গাবতলী-মিরপুর-গুলশান-ভাটারা মেট্রোরেল রুট নির্মাণেও সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে জাইকা। ১৬ সেপ্টেম্বর এমআরটি-৫-এর প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন জমা দেয় জাইকা। এতে বলা হয়,মেট্রোরেলটি আংশিক উড়ালপথে ও আংশিক মাটির নীচে নির্মাণ করতে হবে। ২০৩৫ সালে মেট্রোরেলটি চালুর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এ রুটে স্টেশন থাকবে ১০টি। সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, এমআরটি-৬-এর কাজ সামনের মাসেই শুরু হচ্ছে। অন্য দুটি মেট্রোরেল রুট নির্মাণে প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে জাইকা। সংশোধিত এসটিপি পাস হওয়ার পরই এগুলোর কাজ শুরু করা হবে।
ব্যস্ততম সময়ে ১ হাজার ৮০০ যাত্রী চলাচল করতে পারবেন ঢাকা মেট্রোয় ফটো: মতিউর রহমান টুকু
ঢাকায় মেট্রোরেল কেন প্রয়োজন
মেট্রোরেলের প্রয়োজনীয়তা পৃথিবীর অন্য যে কোনো জনবহুল শহরের চেয়ে ঢাকা শহরের জন্য অধিকতর অত্যাবশ্যকীয়! এ শহরের জনসংখ্যা প্রায় দেড় কোটির কাছাকাছি, যা বিশ্বেও শীর্ষ জনবহুল শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঢাকা শহরের আয়তনের তুলনায় এত জনসংখ্যা পৃথিবীর অন্য কোনও শহরে নেই। যানজটের তীব্র যন্ত্রণায় নগরবাসীর নাভিশ্বাস! এর সমাধান মেট্রোরেলের সংযোজন দ্বারাই সম্ভব। মেট্রোরেল হলে ঢাকার মানুষ যানজটের অভিশাপ থেকে রেহাই পাবে। এ পর্যন্ত সরকারিভাবে যানজট নিরসনে অগণিত ব্যবস্থা নিয়েও অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। সাম্প্রতিককালে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডানে মোড় নিষিদ্ধ করায় কিছু সুফল পাওয়া যাচ্ছে। যানজটের কারণে কত কর্মঘণ্টা আর জ্বালানির অপচয় হচ্ছে হিসাব করলে পিলে চমকে যাবে। উপরন্তু, মুমূর্ষু রোগী আর অতিজরুরি কাজের করুণ পরিণতি ও লোকসানের অন্তর্জ্বালা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই জানে।
যাদের বিদেশ-বিভুঁয়ে মেট্রোরেলে ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে তারা নিশ্চয়ই এই পরিবহনের কার্যকারিতা স্বচক্ষে অবলোকন করেছেন। দ্রুতগতি আর স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পরবর্তী ট্রেন এবং বিপুল সংখ্যক যাত্রী বহনে এ পরিবহনের জুড়ি নেই। পরিবহণ খরচও অত্যন্ত কম।
ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে মেট্রোরেলের গুরুত্ব অপরিসীম। স্বল্প আয়ের জনমানুষ সমৃদ্ধ এ শহরের জন্যই তো যাতায়াতে এ ধরনের স্বল্প ব্যয়সম্পন্ন পরিবহন অধিকতর উপযোগী! মানুষের যে বিশাল কর্মঘণ্টার সলিলসমাধি হচ্ছে প্রতিনিয়ত, সেখানে কত বড় অর্থনীতি নিহিত তার হিসাব অনবরতই বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। সুতরাং এখানে লগ্নিকৃত অর্থ সুদে আসলে সরকারি রাজস্ব খাতকে বিপুলভাবে সমৃদ্ধ করবে। অকল্পনীয় জনবহুলে আক্রান্ত ঢাকা শহরের যানজট শূন্যে নিয়ে আসার জন্য মেট্রোরেল পরিবহণ ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাবে বলে সবার বিশ্বাস।

