প্রকাশ্যে ধূমপান: জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের নির্দেশ কতটা সাড়া ফেলবে পশ্চিমবঙ্গে?
প্রকাশ্যে ধূমপান করলে এখন এএসআই-হেড কনস্টেবলরাও জরিমানা করতে পারেন
- Total Shares
"সকাল দশটা থেকে একমাত্র কলেজ ক্যান্টিন ব্যতীত অন্যত্র ধূমপান নিষিদ্ধ।"
২০০১ সালে পর্যন্ত কলকাতার এক বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ডায়েরির নিয়মাবলির পাতায় এই কথাটি ইংরেজিতে লেখা থাকত। সহজ সরল বাংলায়, কলেজ কর্তৃপক্ষ সরকারি স্বীকৃতি দিচ্ছে যে ছাত্রছাত্রীরা সকাল দশটা থেকে কলেজ ক্যান্টিনে ধূমপান করতে পারবেন।
কিন্তু সেই বছরের নভেম্বর মাসে প্রকাশ্য স্থানে ধূমপান নিষিদ্ধ করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। মহারাষ্ট্রের এক রাজনৈতিক নেতা মুরলি দেওরার রুজু করা রিট পিটিশনের রায় ঘোষণা করতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রকাশ্য স্থানের একটি তালিকার কথাও ঘোষণা করেছিল। শীর্ষ আদালত জানিয়েছিল পাবলিক প্লেস বলতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রেক্ষাগৃহ, সরকারি প্রতিষ্ঠান, আদালত ও জনপরিবহণকে বোঝাবে।
এর পরেই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল কলেজ পড়ুয়াদের। এই রায়ের ফলে ২০০১ সালের নভেম্বরের মাসের এক সকালে ক্যান্টিনে ধূমপান নিষিদ্ধ করে দিল কলেজ কর্তৃপক্ষ। কলেজের পিছনের একটি সিগারেটের দোকানে ভিড় জমাতে শুরু করলেন তাঁরা। ভিড় কমল ক্যান্টিনে, ক্যান্টিনের মালিকের অবস্থাও কাহিল হয়ে উঠল। তাতে অবশ্য টলানো যায়নি কলেজ কর্তৃপক্ষকে। শীর্ষ আদালতের নির্দেশ মেনে ক্যান্টিনে ধূমপান নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হল। সেই ব্যবস্থা আজও চালু রয়েছে।
তবে কলকাতার ওই বিখ্যাত কলেজ ক্যান্টিনে ধূমপান বন্ধ করতে পারলেও শহরের বহু কলেজ সেই নির্দেশ কার্যকর করার কোনও চেষ্টাই করেনি। আজও কলকাতার বহু কলেজের ছাত্র সংগঠনের ঘরে বা ক্যান্টিনে খুলেআম ধূমপান করা হয়।
সুপ্রিম কোর্টের ২০০১ সালের নির্দেশ কার্যকর হয়নি পশ্চিমবঙ্গে
তবে শুধু কলেজ কর্তৃপক্ষ বা কলেজ ছাত্রদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। আদালত চত্ত্বরেও ধূমপান নিষিদ্ধ করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু এ রাজ্যে প্রায় প্রতিটি আদালত চত্ত্বরেই খুলেআম ধূমপান করা হয়। আদালত চত্ত্বরগুলোতে ধূমপানের বহর দেখলে বরঞ্চ উল্টো মনে হবে। মনে হবে, দেশের শীর্ষ আদালত হয়তো ধূমপান-বর্জিত স্থানের তালিকা থেকে আদালতগুলোকে বাদ দিয়েছে। সরকারি দফতরগুলো বা মহানগরী বা রাজ্যের অন্য শহরগুলোর পথেঘাটেও খুলেআম ধূমপান করা হয়। সব মিলিয়ে বলা যেতে পরেই যে শীর্ষ আদালতের ওই নির্দেশের কোনও প্রভাব পশ্চিমবঙ্গে পড়েনি। সিপিএমের আমলেও নয়, বর্তমানের তৃণমূলের আমলেও নয়।
প্রভাব বলতে শুধু বেসরকারি শপিং মলে, প্ৰেক্ষাগৃহে কিংবা বার ও রেস্তোরাঁগুলোতে পড়েছে। এই প্রতিষ্ঠাগুলোর কর্তৃপক্ষ যত্রতত্র ধূমপান বন্ধ করেছেন। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান আবার ক্রেতাদের জন্য আলাদা করে স্মোকিং জোন তৈরি করে রেখেছে। ধূমপায়ীরা যাতে অন্যদের অসুবিধা না করে স্বচ্ছন্দে ধূমপান করতে পারেন। রেলওয়ে স্টেশনগুলোতে না থাকলেও, দেশের বড় বড় বিমানবন্দরগুলোতেও স্মোকিং জোনের বন্দোবস্ত রয়েছে।
অন্যান্য রাজ্যগুলো (যেমন সিকিম) যখন এই আইনকে আরও কড়া ভাবে কার্যকর করার জন্য কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের কাছে আর্জি জানাচ্ছে তখন পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রাথমিক কর্তব্যটুকুও করেনি।
বিভিন্ন রাজ্যের আর্জি মেনে ২৫ অক্টোবর জাতীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা মিশনের যুগ্মসচিব বিকাশশীল দেশের সবকটি রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরে একটি বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছেন। এই নোটিসে বলা হয়েছে যে এবার থেকে প্রকাশ্য স্থানে ধূমপান করলে হেড কনস্টেবল এবং এএসআই পদমর্যাদার আধিকারিকরাও জরমিনা করতে পারবেন। এতদিন শুধুমাত্র সাব-ইন্সপেক্টর ও তার উপরের পদমর্যাদার আধিকারিকদের এই ক্ষমতা ছিল।
শীর্ষ আদালতের সেই নির্দেশের পর স্বাস্থ্য দপ্তর নির্দেশিকা জারি করে জানিয়েছিল যে প্রকাশ্য জায়গায় (সুপ্রিম কোর্টের তালিকা অনুযায়ী) ধূমপান করলে বা তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি করলে ২০০ টাকা জরমিনা ধার্য করা যেতে পারে।
কিন্তু এত কিছুর পরে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ এই মর্মে কত দ্রুত সাড়া দেবে। হাজার হোক, শীর্ষ আদালতের নির্দেশ তো রাজ্য সরকারের কানে প্রথম দিন থেকেই প্রবেশ করেনি।

