লোকে শুনতেই চায় না, তাই সায়েন্স সিটিতে ব্রাত্য বাংলা ভাষা
মনোরঞ্জনের পাশাপাশি শিক্ষামূলক শো, কিন্তু প্রাদেশিক ভাষা শোনার লোক নেই
- Total Shares
ভূ-ভারতে এমন কোনও সরকারি প্রতিষ্ঠান পাবেন না, যেখানে সেই রাজ্যে মাতৃভাষাই উপেক্ষিত! ব্যতিক্রম অবশ্য আছে, আমাদের এই রাজ্যেরই সায়েন্স সিটি। এখানে এমন কয়েকটি শো হয়, যা বেশ চিত্তাকর্ষণ ও অনন্য। শুধু শিশুদের মনোরঞ্জন করাই নয়, এই সব শো-গুলি শিক্ষামূলকও বটে। বেশির ভাগ শো তিনটি ভাষায়, বাংলা-ইংরেজি-হিন্দি। কিন্তু লোকে বাংলা শুনতেই চায় না!
সায়েন্স সিটি, শ্যেন দৃষ্টিতে!
এখানে হাতে-কলমে অনেক কিছু করার সুযোগ আছে, সেখানে একটি সমস্যা আছে, পরিসর। তাই এখানে ইংরেজি ভাষাতেই লেখা। কিন্তু ধরা যাক লেজার শো, যেখানে গ্রহ-নক্ষত্রের সঙ্গে পরিচয় ঘটানো হচ্ছে। অনবদ্য সেই স্বল্প দৈর্ঘ্যের উপস্থাপনা। চোখের সামনে একে একে ফুটে ওঠে সূর্য ও তার গ্রহগুলি। কয়েকটি উপগ্রহের কথাও বলেন উপস্থাপক। তাঁর বলার ভঙ্গিমাও সুন্দর। কিন্তু পুরো উপস্থাপনায় একটি মাত্র বাংলা শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন, শুকতারা। কেন এমন? ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ সায়েন্স মিউজিয়ামসের মহানির্দেশক অরিজিৎ দত্তচৌধুরী বললেন, "আগে সায়েন্স সিটিতে বাংলাতেই বলা হত। কিন্তু অনেকেই আপত্তি জানিয়ে বলতেন যাতে হিন্দিতে বলা হয়। আমরা বেশ অবাকই হয়েছিলাম। স্পেশ শোয়ে আগে তো বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজিতে পরপর শো ছিল। বাংলার চাহিদা নেই বলে এখন সাতটি শোয়ের একটিমাত্র বাংলায়।" সকলে বুঝতে পারবেন, এ জন্য ধীরে ধীরে হিন্দিই হয়ে উঠেছে সায়েন্স সিটির প্রথম পছন্দের ভাষা।
হাতে-কলমে অনেক কিছুই পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে, তবে বাংলায় নিয়মাবলি লেখা নেই পরিসরের অভাবে
মানব সভ্যতার বিকাশ যে কক্ষে দেখানো হচ্ছে, তার প্রদর্শনও বেশ সুন্দর। বিভিন্ন মডেল তো আছেই, পর্দায় ফুটে ওঠে মানুষের বিবর্তন, সময় ধরে। সমস্যা একই, বাংলায় শোনার জন্য কেউ আবেদন করেন না, তাই ইংরেজিতেই শো চলে। আলাদা করে বললে অবশ্য বাংলার বন্দোবস্ত আছে।
ছোট ট্রেনে চেপে আপনি জীব জগতের বিবর্তন দেখতে পারেন, সেখানে প্রতিটি কালের সঙ্গে আপনাকে পরিচয় করিয়ে দেবেন চার্লস ডারউইন। ভাবনাটি নিঃসন্দেহে ভালো। এখানেও তিন ভাষায় শোয়ের ব্যবস্থআ করা আছে। বাস্তবে অবশ্য যাঁরা সেখানে কর্মরত তাঁরা কোনও একটি চালিয়ে দেন। ভাষা যে পছন্দ করা যাবে, সেটি কোথাও বলা নেই। তাই দর্শকও জানতে পারেন না যে অন্য ভাষায় শোনার সুবিধা রয়েছে।
সায়েন্স সিটি
আর পাঁচটা জাদুঘরে প্রদর্শিত নিদর্শেনর সঙ্গে তিনটি ভাষায় পরিচয় ঘটানো হয়ে থাকে। কিন্তু সায়েন্স মিউজিয়ামে সেই প্রদর্শিত নিদর্শনের কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করতে হয়। তাই এখানে একটিমাত্র ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি ইংরেজি। জায়গার অভাবেই অন্য কোনও ভাষায় লেখা সম্ভব হয়নি বলে জানালেন মহানির্দেশক। তিনি আগে মুম্বইয়ে কর্মরত ছিলেন। ওখানেও অবশ্য মরাঠীর চেয়ে হিন্দি ভাষার চাহিদাই বেশি। কারণ হিন্দিতে বলা হলে মোটামুটি সব ভাষাভাষী লোকজনই সেটি বোঝেন।
হরপ্পার যুগের একটি নিদর্শনের চিত্র, সঙ্গে প্রযুক্তির কথা। স্থানাভাবে একটিমাত্র ভাষা লেখা হয়েছে
মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ বলে এক সময় হইচই হয়েছিল। প্রাথমিক থেকে ইংরেজি তুলে দেওয়া হয়েছিল। এখন কি স্রোত বিপরীতমুখী হয়েছে? মানে বাঙালিরা যত ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা করছে, তাদের মধ্যে বাংলার প্রতি টান কমছে এবং বাংলার চেয়ে অন্য ভাষায় বেশি স্বচ্ছন্দ হচ্ছে?
সংস্কৃত ভাষাও লেখা হয়েছে রোমান হরফে, স্থানাভাবে
বাংলার চাহিদা কমছে পশ্চিমবঙ্গে, সায়েন্স সিটি কি সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে? নাকি সায়েন্স সিটির দর্শকরা সকলেই ভিনরাজ্য থেকে কলকাতা ঘুরতে আসা? সেই প্রশ্নের অবশ্য এতটা চটজলদি উত্তর পাওয়া যাবে না।

