খেলা হিসাবে এখনও কদর নেই, তাই সোনাজয়ী ক্যারাটে খেলোয়াড় মুরগি বেচেন

বাড়ি বাড়ি কাজ করে মায়ের চামড়া উঠে যাওয়া খসখসে হাতের আদর...

 |  2-minute read |   13-08-2018
  • Total Shares

মুঠোফোনের ঘুম-ভাঙানিয়া যন্ত্রসঙ্গীতের আওয়াজে রাতের স্বপ্ন রয়ে যায় চোখের কোণায় আর ঘামে ভেজা বালিশেই। বাস্তবের কঠিন হাতছানিতে বেরিয়ে পড়ি নিত্যকাজের থোড়-বড়ি-খাড়া বৃত্তে। সকালে তিন চার জায়গায় মুরগি ডেলিভারির কাজ। সকলের রসনা তৃপ্তির বন্দোবস্ত করে ফিরতে হবে প্র্যাকটিসে।

সাইকেলের প্যাডেলে উড়ে যাবার স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে জোরসে চাকা ঘোরাই।

karate3_081318080444.jpgসকালে উঠে দোকানে দোকানে মুরগি সরবরাহ করেন

মুরগি ডেলিভারির সঙ্গে মনে মনে চলতে থাকে মাঝরাতের প্র্যাকটিসের কাতাগুলি (kata)। মনে মনে আওড়াতে থাকি গিয়াকু জুকি, মাওয়াশি গেরি, মাও গেরি নামগুলি। বাবা-মা আত্মীয়-স্বজন পাড়া- প্রতিবেশী আমাকে আদরের একটা নাম দিয়েছে, পাড়ার ব্রুস লি। নামটা যেন অনেক না পাওয়ার ভিড়ে অনেকখানি পাইয়ে দেওয়ার কাজ করে। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের প্রস্তুতি প্রথম সোপান ওই নামের হাতছানি।

অভাবের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর থালায় লাজিজ বিরিয়ানি!২০১৭ সালের একটা সন্ধে মনের কোণে উঁকি মারে সেদিন ন্যাশনাল ক্যারাটে চ্যাম্পিয়নশিপে কাতা প্রদর্শন করে সোনা জিতেছিলাম। বাবার কান্না ভেজা গলা ফোনে শুনে নিজেকে স্থির রাখতে পারিনি। ওই বছর পরপর অনেকগুলো পুরস্কার পেলেও প্রথম জয়ের স্মৃতি বড়ই মধুর।

এবছর সাউথ এশিয়া স্পোর্টস চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জিতে মায়ের গলায় রুদ্ধ আবেগের প্রতিধ্বনি শুনেছি। বাড়ি বাড়ি কাজ করে মায়ের চামড়া উঠে যাওয়া খসখসে হাতের আদর সোনার মেডেলের চেয়ে দামি মনে হয়েছে।

karate1_081318080536.jpgঅর্থ পান না, তবে সম্মান পেয়েছেন

বাড়ি ফিরে ছাতুর দলাটা জলে দিয়ে গলায় ফেলেই প্র্যাকটিস শুরু করি। সময়েরল কোনও ঠিক ঠিকানা থাকে না। সপ্তাহে রবিবারকে ছুটি দিয়েছি বহুদিন। সোম থেকে শনি আমার কাছে সাত দিন-- ছুটি চাইও না। নিজের অনুশীলনের জগতে আমি নিজেই নিয়ন্ত্রক। কাজেই কোনও ছুটি নেই। প্র্যাকটিসের নেশাটা রোজ একটু একটু করে বাড়িয়ে যাচ্ছি। ছোটবেলায় কোনি নামে একটা সিনেমা দেখেছিলাম। সেই সিনেমার অন্য অংশগুলি ভুলে গেছি, শুধু প্রশিক্ষণ ক্ষিতদার একটা কথা কানে বাজে, ‘ফাইট কোনি ফাইট’। নিজেকেও এই মন্ত্রে চালিত করি—ফাইট, লড়াই!

প্রাথমিক স্কুলে যখন প্রশিক্ষণ দিতে যাই, তাখন তাদেরও ওই একটা কথাই শোনাই, তাদের কানেও ওই মন্ত্র ঢেলে দিই—ফাইট! নতুন প্রজন্মের কাছে ক্যারাটেকে ফুটবল ক্রিকেটের জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেব না। স্কুলের বইখাতার আড়ালে হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে ওরা ওদের ক্যারাটে ক্লাসে খুঁজে পায়। আমার একমাত্র পাওনা “স্যার আজকে ক্যারাটে শেখাবে না?”

karate2_081318080610.jpgপ্রশিক্ষকের সঙ্গে

অন্য কোনও খেলার সঙ্গে নিজের নাম জড়ালে সাফল্য বা আর্থিক জোগান হয়তো অনেক পেতাম, ক্লাব বা স্পনসরের ভিড় লেগেই থাকত। খেলা হিসাবে ক্যারাটে যোগ্য সম্মান কবে পাবে তা জানা নেই। ক্লাবগুলো পাড়ার ব্রুস লিকে অর্থ সাহায্য করার উৎসাহ পায় না।

কিছু ব্যক্তিগত সাহায্য আমাকে স্বপ্ন দেখার সাহস জুগিয়েছে। তবুও কখনও কখনও অভিমান হয়। হয়তো খেলা হিসাবে ক্যারাটেকে না বেছে ফুটবল বা ক্রিকেট খেলায় সময় ও শ্রম দিতে পারতাম তাতে সাফল্যর হাত ধরে খ্যাতি হয়তো বা দরজার কড়া নাড়ত।

If you have a story that looks suspicious, please share with us at factcheck@intoday.com or send us a message on the WhatsApp number 73 7000 7000

Writer

SUBHOJIT DAS

Gold Medalist in Karate

Comment