রং করার কথা বললেও প্রশাসনিক ক্যালেন্ডারে নেই সেতু মেরামতি
প্রশ্ন উঠছে সেতু মেরামতিতে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে
- Total Shares
মাঝেরহাট সেতু কেন ভেঙে পড়ল? কার গাফিলতিতে ঘটল এত বড় দুর্ঘটনা? গত মঙ্গলবার দুর্ঘটনার পরের মুহুর্ত থেকে শুধু কলকাতা নয়, গোটা রাজ্যজুড়ে এই দুটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ মানুষের মুখ থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ মহলে।
ওই দু’টি প্রশ্ন নিয়ে রাজ্য প্রশাসনের অন্দরেও রীতিমতো চাপানউতোর চলছে। মাঝেরহাট সেতু কোন দপ্তর নির্মাণ করেছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে রয়েছে। তবে সেতুর রক্ষণাবেক্ষণের ভার যে রাজ্য পূর্ত দপ্তরের উপরেই ছিল, তা নিয়ে আর কোনও সংশয় নেই। মাঝেরহাট সেতুর দেখভালের দায়িত্বে ছিল পূর্ত দপ্তরের বেহালা সাব-ডিভিশন। এলাকাটি পূর্ত দপ্তরের আলিপুর ডিভিশনের অধীনে পড়ে। ভবানী ভবনের নতুন ভবনের দোতলায় তার অফিস রয়েছে।
ভেঙে পড়েছে মাঝেরহাট সেতু (নিজস্ব চিত্র)
পূর্তদপ্তর রাজ্য সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর। সেই দপ্তরের কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন-মরণ। পূর্তদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ কাজ সেতু রক্ষণাবেক্ষণ এবং মেরামতি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর প্রতিবছর ঘটা করে একটি করে প্রশাসনিক ক্যালেন্ডার প্রকাশ করে থকেন। ওই ক্যালেন্ডারে প্রতিটি দপ্তর সারা বছর কী কী কাজ করবে তা লেখা থাকে। চলতি বছরও সেই ক্যালেন্ডার প্রকাশিত হয়েছে। বলাই বাহুল্য রাজ্যের কোনও দপ্তরেই সেই ক্যালেন্ডার মেনে কাজ হয় না। প্রমাণ পোস্তা, উল্টোডাঙার সেতু ভেঙে পড়ার ঘটনা। প্রশাসনিক ক্যালেন্ডারে পূর্তদপ্তর সারাবছর কী কী কাজ করবে, তারও উল্লেখ থাকে।
প্রশাসনিক ক্যালেন্ডার ২০১৮-তে পূর্তদপ্তরের অনেক কাজের কথা ছাপানো থাকলেও কোথাও মাঝেরহাটের মতো সেতুগুলির রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামতির উল্লেখ নেই। তার মানে এটাই বুঝতে হবে সেতু মেরামত, বা রক্ষণাবেক্ষণ মোটেও গুরুত্বপূর্ণ কাজ নয় ওই দপ্তর এবং দপ্তরের মন্ত্রীর কাছে। তবে এটা ঘটনা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার মেলা-উৎসব ইত্যাদিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখে, দান-খয়রাতিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে কিন্তু সেতু রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত কাজটি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয় মোটেও।
তবে এই সরকার আর তার পূর্তদপ্তর সেতু রক্ষণাবেক্ষণে কিছুই করেনি বললে ভুল হবে। কারণ গত ১০ আগস্ট রাজ্যের পূর্তদপ্তর সেতুগুলির জন্য যে উদ্যোগ নিয়েছে তার প্রমাণ দপ্তরের ওই তারিখের মেমোরান্ডাম; নং-১ম-০৩/১৬/১০২০-আর/পিএল, যাতে লেখা—‘‘এটা দেখা যাচ্ছে যে, রাজ্যের ব্রিজ এবং কালভার্টগুলিকে দেখতে ভালো লাগছে না (অ্যাপিয়ারেন্স অব দ্য ব্রিজ অ্যান্ড কালভার্টস আর নট আপ টু দ্য মার্ক)। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, রাজ্যের পূর্তদপ্তরের অধীন ব্রিজ এবং কালভার্টগুলি পরিষ্কার করে ভালো করে রং করা হবে এবং যদি দরকার পড়ে তা হলে মেরামত করা হবে।’’ অর্থাৎ ব্রিজ এবং কালভার্টগুলির ক্ষেত্রে রাজ্যের পূর্তদপ্তরের উদ্বেগের প্রথম বিষয় — সেগুলিকে দেখতে ভালো লাগছে না। তাই সেগুলিকে রং করতে হবে; নীল সাদা রং। তারপর ব্রিজের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত। তাও সরকারি ভাষায় —‘যদি দরকার পড়ে তাহলে মেরামত করা হবে।’ অথচ সেতুগুলির রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত কেবলমাত্র পূর্তদপ্তরের নয় রাজ্য সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
ভেঙে পড়েছে মাঝেরহাট সেতু (নিজস্ব চিত্র)
২০১৬-র ৩১ মার্চ বিবেকানন্দ উড়ালপুলের একাংশ ভেঙে ২৭ জনের মৃত্যুর পর সরকার আইআইটির (খড়্গপুর) বিশেষজ্ঞদের দিয়ে একটি সমীক্ষা কমিটি তৈরি করে। সেই কমিটি উড়ালপুলের ৪৭০ ফুট ভেঙে পড়ার প্রধান কারণ হিসাবে বলেছিলেন নকশার গলদ। সেই সঙ্গে নিম্নমানের ইমারতি জিনিসপত্র দিয়ে তা তৈরি হচ্ছিল বলেও উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ওই রিপোর্ট সরকার মেনে নেয়নি।
২০১৩ সালে ৩ মার্চ ভোররাতে ভেঙে পড়েছিল ভিআইপি রোড থেকে ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস যাওয়ার উড়ালপুল। ভারী লরির বাড়তি কম্পনকে সহ্য করতে না পেরে ভিআইপি রোড থেকে ঘুরে যাওয়া উড়ালপুলের একাংশ ভেঙে গিয়েছিল। ওই ভাঙার অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে জানা যায় বেয়ারিং, যার ওপর সেতুর অংশটি রাখা হয়েছিল, তাতে ত্রুটি থাকায় কার্যত পিলার থেকে পড়ে যায় সেই অংশটি।
ব্রিজ বা উড়ালপুল ভাঙলেই দোষ চাপে পূর্বতন সরকারের উপর। দোষ চাপিয়ে দেওয়ার ওই পালা চলতে থাকায় বহাল তবিয়তে তদারকি করার দায়িত্বটা ঝেড়ে ফেলে পূর্ত দপ্তর। মাঝেরহাট ব্রিজের একাংশ ভেঙে পড়ার ক্ষেত্রেও মেট্রোর কাজকে এবারে দোষারোপ করতে ছাড়েননি খোদ মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু কলকাতার মাটির অবস্থা যে ভালো নেই মোটেও, সেদিকে নজর কোথায়।
কলকাতার ভূগর্ভস্থ মাটির পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয় ভূবিজ্ঞান মন্ত্রকের আর্থিক সহায়তায় ২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ভূমি সমীক্ষা করা হয়েছিল। সমীক্ষা রিপোর্টে বলা হয়েছিল কলকাতার ব্যাপক অংশ কর্দমাক্ত মাটির ওপরে রয়েছে। কলকাতায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে কলকাতার ব্যাপক অংশ মাটির মধ্যে ঢুকে যাবে। আইআইটি (খড়্গপুর)-কে দিয়ে করা কেন্দ্রীয় রিপোর্ট পরিষ্কার জানিয়েছিল সফ্ট অ্যালুবিয়াম মাটির ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই শহর। তার কোন জায়গায় মাটির অবস্থা কীরকম তা জানিয়ে ২০১৭-র নভেম্বর মাসে একটি ডিজিটাল মানচিত্র রাজ্য সরকারকে দেওয়া হয়। কিন্তু তাতে কী হল?
প্রাচীন শহর কলকাতার পুরনো সেতু বা উড়ালপুল গুলির রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামতের দিকে লক্ষ্য না রেখে লাগাতার উড়ালপুল তৈরির পরিকল্পনা, প্রতিযোগিতামূলক উন্নয়ন আর সৌন্দর্যায়ন করে চলেছে সরকার। যেমন মাঝেরহাট ব্রিজ মেরামতে ৩ কোটি টাকা খরচা করতে পারল না সরকার কিন্তু ১২ কোটি টাকার ফুলের টব রেখে বিদ্যাসাগর সেতুর উপর বাড়তি ওজন চাপিয়ে দিল।
ভূবিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতার মাটির নীচের কঠিন গঠনের উপরের অংশের ওপরেই রয়েছে কার্যত ফাঁপা, নুড়ি-কাঁকর-আর বালি মিশ্রিত পলির একটা নরম স্তর। যার মধ্যে দিয়ে প্রচুর পরিমাণে জল বের হতে থাকে প্রতিনিয়ত। জলের পৃষ্ঠটানের জন্যই ফাঁপাস্তরের দুই দিক থেকে জল বেরিয়ে একটা যাচ্ছে গঙ্গার দিকে অন্যটি বঙ্গোপসাগরের দিকে। তার জেরেই সমস্যা বাড়ছে কলকাতায় এবং দু-তিনটি ব্রিজের ক্ষেত্রে সমস্যা হয়ে দেখা দিচ্ছে।
গঙ্গা তীরবর্তী এলাকায় বেশি করে ফাঁপা হতে থাকায় সমস্যা ঘটছে গঙ্গার নিকটবর্তী অঞ্চলে পড়ে বাড়বে দূরবর্তী অংশেও। তার মধ্যেই দায়সারা পরিবেশ সমীক্ষা চালিয়ে যত্রতত্র শুরু হয়েছে মেট্রো রেলের কাজ। যে কোনও বড় ধরনের কনস্ট্রাকশনে একটা বড়সড় কম্পন হয়। তার ওপর ৫০ বছরের পুরানো মাঝেরহাট ব্রিজের পাশেই রয়েছে রেল লাইন। রেল চলাচলে ভূমি কম্পন হয়; সেটা অগ্রাহ্য করার মতো নয়। আর সব থেকে সমস্যা পুরানো ব্রিজের পাশের খাল। সারফেস ফ্লো-র জেরে ওই খাল প্রতিনিয়ত এলাকার জল শুষে নেওয়ায় মাটির ওপর ফাঁপা অংশের শূন্যতা আরও বাড়ছে। ফলে ওই জায়গার মাটির তলাটা হয়ে গিয়েছে একদম ফাঁপা। এর ওপর নিয়মিত মেরামতি না হওয়ায় ক্রমাগত ভঙ্গুর হয়েছে মাঝেরহাট ব্রিজ।
ভেঙে পড়েছে মাঝেরহাট সেতু (নিজস্ব চিত্র)
সেই ব্রিজের ওপর দিয়ে রাত দিন চলেছে ভারী ভারী লরি। কলকাতার অন্য প্রান্তের মাটির গঠনের থেকে এখানকার অবস্থা সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ একসময়ে এই অঞ্চল ছিল সুন্দরবন এলাকা। বর্ষা শুরুর আগে মাটির ফাঁপা অংশের শূন্যস্থান যদি বেশি থাকে, তাহলে জল প্রবাহের মাত্রাটা বেড়ে যায়। আর বর্ষার মধ্যে যদি জল প্রবাহের মাত্রা বাড়ে তাহলে বর্ষা পরবর্তী সময়ে প্রভাবটা পড়ে সেতুতে। ঠিক সেই কারণেই বর্ষা পরবর্তী সময়ে রাস্তায় ধস নামতে দেখা যায়। তাই বর্ষার আগে আর পরে নজরদারিটা খুব দরকার পড়ে। যা কোনওদিন হয়নি।
খড়্গপুরের ভূতত্ত্ববিদদের মতে, কলকাতার মাটির তলায় ৪০মিটার শক্ত স্তরের পরেই রয়েছে এবড়ো খেবড়ো নুড়ির স্তর। কলকাতায় যে বহুতল বা ব্রিজ রয়েছে তার অধিকাংশই ৪০ মিটারের ওপরে। তাই নিচের অংশে যদি কোনও ভাবে বড় শূন্যস্থান তৈরি হয় তাহলে যে কোনও মুহূর্তেই বড় বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে। এই মুহূর্তে নিরাপদে নেই পার্ক সার্কাস সেভেন পয়েন্ট অঞ্চলের মা উড়ালপুল। দেখা গেছে, কলকাতার যে কোনও জায়গার থেকে ওই সেভেন পয়েন্টে সব থেকে বেশি কম্পন হয়। কেবল তাই নয়, ওই উড়ালপুলের মাটির শূন্যস্থান অনেক বেশি। ধীরে ধীরে তা বেড়েই চলেছে। শীতের আগে ওখানে ধস নামতে দেখা যায়। মাঝেরহাট ব্রিজ নিয়ে বহু আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। বিপদসীমার মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঢাকুরিয়া, চেতলা, ব্রেসব্রিজ, টালিগঞ্জ, টালা, চিংড়িহাটা, আম্বেদকার সেতু, অরবিন্দ সেতু, বিজন সেতু-সহ বহু ব্রিজ ও উড়ালপুল।
শুধু বিশেষজ্ঞ কমিটি গড়ে ফাটলে সিমেন্ট লেপে, পিচ ঢেলে গর্ত বুজিয়ে কিম্বা নীল সাদা রং করে, অথবা একেকটি দুর্ঘটনার পর ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে হতাহতদের পরিবারগুলির জন্য অর্থসাহায্যের ঘোষণা করলে হবে না, অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে হটকারি সিদ্ধান্ত নিলেও হবে না। ব্রিজ বা উড়ালপুলের দু-তিনটে ‘বোর হোল’ তৈরি করে সেখানকার তথ্যকে নিয়মিত খতিয়ে দেখা দরকার। যে কোনও উন্নত শহরে এইভাবেই রক্ষণাবেক্ষণ হয়। সামান্য ‘বোর হোল’ থেকেই ইমারতির গুণমান খতিয়ে দেখা যেতে পারে। করা যেতে পারে দীর্ঘমেয়াদী ডাম্পি লেভেল সার্ভে।
তারও আগে বেশি দরকার সদিচ্ছা।

